বীরেন্দ্র নাথ মহাপাত্রের ধারাবাহিক উপন্যাস

       শপথ নিলাম (চতুর্থ পর্ব )
         বীরেন্দ্র নাথ মহাপাত্র

তখন গুরুজী দু-হাত তুলে আমাকে আশীর্বাদ করলেন এবং বললেন,' জান নমিতা, কে বলে ভগবান নেই, এই আমাদের দুর্দিনে ভগবান হেমাদ্রিকে ত্রাতা হিসেবে বাঁচার যন্ত্রের রসদ দিয়ে এবং তার নিজের উপার্জিত পয়সা আমাদেরকে স্ব-ইচ্ছায় দান করে, সে আমাদেরকে কোন জন্মের এক ছেলের পুন্য কাজ করে গেল । কামনা করি ভগবান তার জীবন আরও মধুময় করে তুলুন । এসো, মোরা দুজনে মিলে মঙ্গলময়ের কাছে কায়মন বাক্যে প্রার্থনা জানাই ।
                এদিকে অনেক রাত হওয়ার জন্য আর কথা না বাড়িয়ে রাতের খাবার  খেয়ে সবাই ঘুমিয়ে পড়লাম । পরের দিন সকালে গুরুজী এবং গুরুজীর স্ত্রীকে প্রনাম করে এবং মাসে মাসে এসে খবর নিয়ে যাব এই সান্ত্বনা বাক্য দিয়ে ওনাদের বাড়ি ত্যাগ করলাম । বাস ধরে খড়্গপুর স্টেশন, পরে সেই বাসা বাড়িতে ফিরে এলাম । বাসায় ফিরে বাড়িওয়ালা বৌদির কাছ থেকে চাবি ছোড়া দেওয়ার সময় আমাকে যে কথাটি বললেন সেটাকে একজন 
ভাড়াটিয়ার পক্ষে কোন মতে মঙ্গল জনক নয়। 
তিনি বললেন, 'জান হেমাদ্রি, তোমাকে একটা কথা বলব বলে কোন বারেই বলা হয়নি, তাই বাধ্য হয়ে বলতে হচ্ছে ; কারণটা হলো বিগত সাত মাসের বাড়িভাড়া বাকি আছে, এ মাসে না দিলে আমাদের পক্ষে আর কোন মতে সম্ভবপর হচ্ছে না ।'
                  তখন হেমাদ্রি বলতে গিয়েও বলতে পারল না, তার কারণ যত করলেও নিজের পছন্দ করা সহধর্মিনী তো, নিজের দুর্বলতাটা নিজে মানিয়ে নিয়ে, ঠিক আছে, কালকেই সমস্ত টাকা মিটিয়ে দিব, সে তো নিজে জানে সাত মাসের টাকা ঊন পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থাৎ প্রতি মাসে সাত হাজার টাকা শ্রেয়সীকে সে দিয়ে আসছে,সে কেন বাড়িওয়ালাকে প্রতি মাসে টাকা দেয় না, তার সঠিক উত্তর যতক্ষণ পর্যন্ত সে এখানে না আসে ততক্ষণ কিছুই জানা যাবে না । 
                                         পরের দিন হেমাদ্রি অফিসে গিয়ে প্রভিডেন্ট ফান্ডের কিছু টাকা অর্থাৎ ঊন পঞ্চাশ হাজার টাকা জরুরী দরকার বলে একটা দরখাস্ত করে দিল, নিয়মানুসারে ওই গচ্ছিত টাকা জরুরী ভিত্তিক বলে ৪/৫ দিনের মাথায় পাওয়া যাবে বলে দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার হেমাদ্রিকে বললেন । 
                                       তিনি বললেন,'যদি আগামী কাল ওই টাকা খুবই দরকার হয়, তাহলে আমি বিশেষ ভাবে দায়িত্ব নিয়ে দিতে পারব ।'
   তখন আমি আগামী কাল টাকা নিব বলে দায়িত্ব প্রাপ্ত অফিসারকে 'হ্যাঁ 'বলে দিলাম, কথামত পরের দিন অফিস থেকে ফিরে ঊন পঞ্চাশ হাজার টাকা বৌদিকে দিয়ে বাড়িতে চলে এলাম । একা একা বাড়িতে থাকতে ভাল লাগল না তাই বাধ্য হয়ে শ্রেয়সীকে ফোন করলাম । 
     শ্রেয়সী ফোন ধরে বলল,'সাত দিনের মাথায় চলে আসবে,তবে কখন ফিরবে, সঠিক সময় দিতে পারবে না । তাই চাবি ছড়াটা বৌদির কাছে রেখে যেতে অনুরোধ করল ।' কথামত শ্রেয়সী আমার আসার আগে বাড়ি চলে এসেছে । বারবার টাকাটার কথা বলতে গিয়েও কোন মতে বলতে পারলাম না ।এইভাবে বেশ কিছুদিন যাওয়ার পর হঠাৎ একদিন শ্রেয়সী বলল, 'জান আমি পাঁচদিনের জন্য একটু বাইরে যাব, তুমি এই কয়দিন একটু অসুবিধা হলে মানিয়ে নেবে, এই আমার অনুরোধ ।' কথামত শ্রেয়সী আমি আসার আগে চলে গেছে, এই কথাটা বাড়িওয়ালা বৌদির কাছে জানা গেল । তবে বৌদি বললেন, 'জান হেমাদ্রি তোমার স্ত্রী কি রকম মহিলা, এই কয়দিন হলো এলো, আবার কোথায় গেল, সেটা তোমার মঙ্গলজনক হচ্ছে বলে আমার মনে হয় না, আমি যতদূর জানি তোমরা পছন্দ করে দুজনে বিয়ে করেছ, সে বরাবরই একটি যুবকের সঙ্গে ঘোরাঘুরি করে, আবার তারই সঙ্গে বেরিয়ে গেল ।'এই কথা শোনার পর আমাদের পরস্পরের দাম্পত্য জীবন ক্রমশঃ এক গভীর হতাশার অন্ধকারে তলিয়ে যেতে লাগলো, সেটা আমার পক্ষে বুঝতে আর বাকি রইল না । 
                         ঠিক দুদিনের মাথায় হঠাৎ অফিসের মধ্যে শ্রেয়সীর ফোন এল । ফোনে শ্রেয়সী বলল, 'তুমি আজই অফিস থেকে বাড়ি না ফিরে খড়্গপুরের পুরী গেটের কাছে আমার সঙ্গে দেখা করো, খুবই জরুরী ।'
                               তাই আমি মেদিনীপুর  গামী গ্যালপিং ধরে খড়্গপুর স্টেশনে নেমে বোগদায় এসে অটো ধরে পুরী গেটের সামনে যখন নামলাম তখন অনেক রাত্রি হয়ে গেছে । একটু দূর থেকে দেখতে পেলাম শ্রেয়সীর ধারে পাশে বেশ কিছু যুবক সম্প্রদায়ের লোক জটলা করে আছে,তবে শ্রেয়সীর সঙ্গে এক যুবক সামনের একটা চা দোকানে বসে মজা করে গল্প গুজব করছে, তার সঙ্গে বোতলের মধ্যে মনে হয় বিলটি মদ, শ্রেয়সী ছোট্ট গ্লাসে ভরে দিচ্ছে, সেও খাচ্ছে ওকেও দিচ্ছে । এই দেখে আমার মনে প্রচুর ঘৃণা বোধ জন্মালো ।
                                    আবার পরক্ষণে মনে পড়লো যে লর্ড -এর কাছে আমরা দুজনে প্রতিশ্রুতি বদ্ধ । তাই বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা করা দরকার ভেবে বিনা দ্বিধায় একেবারে শ্রেয়সীর কাছে চলে গেলাম । 'শ্রেয়সী ' বলে ডাক বার পর প্রথমে হুশ না থাকলেও পরে সে বলেছিল, 'এসেছ ডার্লিং,' অবোধ শিশুর মতো সে এসে ধরা দিবে, সেটা আমার দৃঢ় ধারণা ছিল ; কারণ আমাদের অসীম ভালোবাসা যে এখনও মরে যায়নি, সেই ধারণাটাও তোমার  মধ্যে বিদ্যমান ।ওরে বেয়াকুব যুবক,  তুইএখনো এই মায়াবী নারীর হৃদয়টা বুঝে উঠতে পারলি না, পদে পদে লোকসান, আর ঊন পঞ্চাশ হাজার টাকা আত্মসাৎ,এক যুবকের সঙ্গে সর্বদা ঘোরা ফেরা,এত সবের পরও নির্লজ্জের মতো তোর সাধের প্রিয়াকে এখনো এক স্বপ্নময় স্বর্ণ সিংহাসনে বসিয়ে সুখের সাগরে ভাসার ইচ্ছা ! সে সাধ কি আদৌ মিটবে ? আর মেটার আশাও করিস না ।এই কথাগুলি বলার পর শ্রেয়সী আমাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে বেঞ্চে বসিয়ে গ্লাস ভরা সুরা পান করতে অনুরোধ করল এবং কালজয়ী একটি গানের লাইন, ' এই মায়াবিনী রাত, এসো না আজ দুজনে ভাগ করি 'বলে হাত ধরে নাচতে লাগলো । 
      তখন একজন যুবক আমার সামনে এসে গম্ভীর গলায় বলল, 'আমার নাম অনুত্তম রায় । বাড়ি খড়্গপুরের মালঞ্চায়, শ্রেয়সী আমার পূর্ব প্রেমিকা, বিগত কয়েক বছর আগে ভুলের ফসল সাময়িক তুমি পেলেও পুরোটা কিন্তু এখনো পুরো দমে ওর উন্মত্ত যৌবনের কামনা বাসনা সম্পূর্ণ রূপে ভোগ করে চলেছি, সেটা তুমি জেনেও কিন্তু বুঝতে পারো না ; কারণ তোমার ওর প্রতি অন্ধ ভালবাসা তোমাকে এখনো পর্যন্ত মুগ্ধ করে রেখেছে, যার টানে আজও এত দূর চলে এসেছো, এবার জেনে যাও, ও আর তোমার নয়, তবে এর জন্য তোমাকে চরম হেনস্থা হতে হবে, সেটা জীবনে কোনদিনও কল্পনাও করতে পারো না ।'
                                      অনুত্তমের কথা শেষ হতে না হতেই ইশারা করার আগেই জন ৬/৭ মিলে দমা দম হাত দিয়ে চড়, ঘুসি, কেবলই উপর যুপরি মারতে লাগল,তাতেও যখন আমাকে মাটিতে ফেলতে পারল না,তখন একজন আমার চুলের মুঠি ধরে সজোরে টেনে মাটিতে যেই ফেলে দিল ,তখন সকলে    মিলে কেবল মুখে ও বুকে লাথি মারতে লাগল । তার মধ্য থেকে কে একজন দৌড়ে গিয়ে একটা লোহার রড দিয়ে সজোরে মাথায় আঘাত করল । ঝর ঝর করে মাথা ফেটে রক্ত পড়তে লাগল, সেই রক্ত যেই কপাল বেয়ে ডান হাতে এসে পড়ল, তখন শ্রেয়সী দৌড়ে এসে আমার কাছে বসে তাদেরকে বিশেষ করে অনুত্তমের উদ্দেশ্যে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, 'অনুপম তুমি নিষ্ঠুর নির্দয়, আমি কখনও ভাবতে পারছিলাম না, তোমরা সবাই মিলে এভাবে ওর উপর প্রতিশোধ নিবে, তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি, ও এখনও আমার স্বামী, অতএব এই নিষ্ঠুর কাজ করার জন্য তোমাদেরকে এক্ষুণি আমি পুলিশ ডেকে ধরিয়ে দিতে পারতাম, তা আমি আর কোনোদিনের জন্য করব না ।বিশ্বাস ঘাতিনী হয়ে কখনও সৎ মানুষের কাছে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয় ।'
      এই কথা গুলি বলেই শ্রেয়সী আমার বুকের উপর আছড়ে পড়ে অঝোরে কাঁদতে লেগেছিল, তখন বাধ্য হয়ে শ্রেয়সীকে দুহাত দিয়ে মাথাটা তার আমার বুক থেকে তুলতে গেলাম, তখন অজান্তে ডান হাতের আঙুলে লাগা রক্ত ওর সিঁথিতে লাল রঙে রাঙিয়ে গেল । তখন শ্রেয়সী কাঁদা অবস্থায় বলেছিল, প্রকৃত ঘরে ফেরা আর কোনদিনই সম্ভব হবে না, জান আমি একজন বার বণিতা হয়ে গেছি ;  কারণ ভালোবাসার কাঙাল লোকটাকে জীবন ভোর ঠকিয়ে এসেছি, তার কাছে এই পোড়ামুখ আর কোন দিনের জন্য দেখাতে  পারব না বা সম্ভব নয়,তাই এই আমার আঁচল টুকু হাত দিয়ে তুমি ধরে আমার সিঁথিতে তোমার দেওয়া রক্ত চিরজনমের মতো মুছিয়ে দিয়ে যাও, পোড়ার মুখী কলঙ্কিনীকে এই জীবনের মত ক্ষমা করে দাও, আর তোমার অন্তরের অফুরন্ত ভালোবাসার হাত থেকে আমাকে চিরদিনের জন্য মুক্তি দিয়ে যাও । বলে দূর থেকে প্রণাম করলো, এরপর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম, পরে জ্ঞান ফেরার পর চেয়ে দেখি আমি স্টেট হাসপাতালের বেডে শুয়ে ।
হেমাদ্রির কথাগুলি শেষ হতেই ট্রেন রোড চন্দ্র কণা স্টেশনে এসে দাঁড়াল, স্টেশনের ঘড়িতে ১১ -৪৫ মিনিট বেজেছে । কিংকিনী কামরার কাছে দাঁড়ানো হকারের কাছ থেকে গরম গরম কচুরি ছয় খানা করে সঙ্গে তরকারী তিন জনের জন্য আলাদা করে নিয়ে নিল । সঙ্গে সঙ্গে ট্রেনও ছেড়ে দিল । 
               খেতে খেতে তুহিন বলল, 'কিরে কিংকিনী একেবারে চুপ করে গেলি যে রে ? ' তখন কিংকিনী বলল, ' ভাবছি শ্রেয়সী মেয়েটার চরিত্রের বহুরূপতার কথা । আমার মনে হয় বাধ্য হয়ে ঘর ছেড়ে অনুত্তমের সঙ্গে বেরিয়ে এলেও ওনার অন্ধ ভালবাসাকে বারবার সাধুবাদ দিতে সে কোন বারের জন্য ভুলে যায়নি, তার জন্য শ্রেয়সী খারাপ সঙ্গ লাভ করেও যাবার বেলায় মহত্ব দেখতে পেরেছে ।' কিংকিনীর কথা শেষ হতেই হেমাদ্রি বলল, চার পাঁচ দিন পরে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে সোজা মৌড়িগ্রাম বাসায় চলে আসি, সেখানে এসে কোন কথা তাদের সঙ্গে না বলে বকেয়া ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে ২০১৪ সালের ৫ ই মার্চ ফুলেশ্বরের স্টেশনের কাছে একটি ছোট্ট টালি ঘরে এসে বাসা বাঁধলাম, আগেই তো বলেছি যে তিন বছর পাঁচ মাস একা থেকেছি, তারপর হঠাৎ একদিন সন্ধের পর একটি ছেলে বসে বসে কাঁদছে ।তখন তাকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ' এই ছেলে তুমি এই সন্ধ্যায় একা বসে কেন কাঁদছ, তোমার সঙ্গে কেউ কি নেই ?'
                           তখন সে কেঁদে কেঁদে বলল,  
'আমি গতকাল রাত থেকে এখনও পর্যন্ত কোন কিছু খাইনি, তাই খিদেয় জ্বালায় কাঁদছি, তখন আমি তাকে স্টেশনের কাছে নিয়ে গিয়ে পেট পুরে খাওয়ালাম । তারপর তাকে প্লাটফর্মের  সেই কোণায় নিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলাম, ' তোমার মা বাবা কোথায় ? '
                                       যখন আমার চার বছর বয়স তখন থেকেই  এ জগতে একজনকেই আমার ধ্যান জ্ঞান আমার ধর্ম বলে জেনে এসেছি, তিনি আমার পালিতা জননী জাহানারা বেগম । তবে তাঁর গর্ভজাত সন্তান নই, শুনেছি আমি তার কুড়িয়ে পাওয়া ছেলে । কারা আমার জন্মদাতা ও জন্মদাত্রী আজও আমি তা জানি না । কামালপুরে আমার পালিতা মা ও বাবার আসল বাড়ি । ছিটমহল গুলিতে দীর্ঘ ৬৮ বছর ধরে হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়েরই সহাবস্থান । সুখে দুঃখে হাসি কান্নায় কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে তারা যৌথভাবে সব করে ।সেই দাসিয়ার চড়া ছিট মৌজায় কামালপুরে হয়েছে টিনের চালা দিয়ে তৈরি দুর্গা মন্দির । সামনে কারুকাজ করা বাঁশের বেড়া । ভিতরে বসানো হয়েছে দুর্গা প্রতিমা । কামালপুরে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ কম । তাই হিন্দু মুসলমানের মিলিমিশি উৎসব । সেই সময় অর্থাৎ মহা অষ্টমীর দিন হিন্দুদের পাড়ায় আমার মা জাহানারা বেগম লোকের  বাড়ি থেকে কাজ করে ফিরে আসার সময় পুকুরের পাড়ে কলাগাছের ভিতর আমাকে আবিষ্কার ও উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে আসেন । আমাকে পেয়ে আমার নিঃসন্তান পালক পিতামাতা সানন্দেই আমাকে গ্রহণ করে নেন এবং কুড়িয়ে পাওয়া সন্তান বলে নামকরণ করেন ' সাহেব ' ।
              কিন্তু এই ঘটনা ওখানে হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে জানাজানি হওয়ায় প্রতিবেশী মুসলমান সম্প্রদায় ভুক্ত লোকেরা হিন্দু বাড়িতে বাচ্চা চুরি করে নেওয়ার অপরাধ দিয়ে ওদেরকে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করে । তখন ওরা আমাকে নিয়ে মায়ের বাপের বাড়ি মুর্শিদাবাদ জেলার সমসেরগঞ্জে চলে আসে ।
         তখন থেকেই আমি তাঁদের সাথে সামসেরগঞ্জেই নানা - নানির সংসারে বড় হতে থাকি । এভাবেই কেটে যায় ১৫/১৬ বছর । ইতিমধ্যে নানার ইন্তেকাল হওয়ায় শোকে দুঃখে নানি কেমন যেন হয়ে যায় । আমাদের তিনজনকে তাদের সংসারে আর থাকতে দিতে চায় না । উঠতে বসতে গঞ্জনা দিতে থাকে । এসব দেখে শুনে আমার অসহায় পালক পিতা মাতা ভাগ্যান্বেষণের জন্য গুজরাট যাওয়ার পরিকল্পনা করে এবং আমাকে একা ফেলে রেখে ওরা বাধ্য হয়েই কাজের সন্ধানে গুজরাটের ভুজে গিয়ে পৌঁছান । ওখানে বাবা রাজমিস্ত্রীর কাজ করতেন, আর মা জরির কাজ করতেন । এইভাবে ছয় বছর কাজ করার পর ২০০১ সালের ২৬ শে জানুয়ারী বিধ্বংসী ভূমিকম্পে ওঁদের দুজনকে বিধাতা পুরুষ আপন কোলে টেনে নেন । তারপরে আমি কার্যত অনাথ হয়ে যাই । তারফলে শুরু হয় নানীর অত্যাচার ও গঞ্জনা, পড়াশোনার জন্য টাকা পয়সা খরচ করতে চাইল না । ফলে আমার পক্ষে অষ্টম শ্রেণীর গন্ডি পেরানো হলো না । তাই বাধ্য হয়ে বহরমপুর টুরিস্ট লজে একজন বাবুর পরিচয়সূত্রে বাসন মাজার কাজে যুক্ত হই । কিন্তু কাজটা বেশি দিন টেকেনি । কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় কাজটা ছেড়ে দিই । তারপর নিজের পায়ে দাঁড়ানোর প্রতিজ্ঞা নিয়ে জমানো সামান্য পুঁজি নিয়ে ট্রেনে হকারি করতে শুরু করি । নানি তাতেও সন্তুষ্ট না হওয়ায় তাঁর সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক চুকিয়ে হকারি সম্বল করেই পথে নেমে পড়ি । এইভাবে বেশ কিছুদিন চলছিল ।
                                               একদিন দুপুরে লালগোলা  প্যাসেঞ্জারে হকারি করতে করতে হঠাৎ শুনতে পেলাম পাশের কামরাটিতে বহু প্যাসেঞ্জার একসাথে হৈ চৈ শোরগোল করছে । ব্যাপারটা ঠিক কি তা দেখার জন্যই কামরার দিকে দ্রুত পা বাড়ালাম । গাড়িটাও লালগোলা স্টেশনে থেমেও গেল । দ্রুত ভীড় ঠেলে কামরাটিতে ঢোকার চেষ্টাও করলাম, কিন্তু পারলাম না । তাই বাধ্য হয়ে একটু অপেক্ষাই করতে হলো । সবাই নেমে যাওয়ার পর কামরায় উঠে দেখলাম একজন অভিজাত প্রৌঢ়া মহিলা সিটের উপর অজ্ঞান হয়ে পড়ে রয়েছেন । কাছে গিয়ে ডাকা ডাকি করেও তাঁর জ্ঞান ফেরাতে না পেরে সহ হকারদের কয়েকজনকে ডেকে তাদের সাহায্যে তাঁকে কামরার বাইরে আনলাম । তারপর একটি ট্রেকার ডেকে তাতে তাঁকে শুইয়ে নিয়ে স্থানীয় স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে গেলাম । স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডাক্তারবাবুরা তাঁকে প্রাথমিক পরীক্ষার পরে ভর্তি করে দিতে বললেন । তাই ডাক্তারবাবুদের কথা মত ভর্তি করলাম । এবার ডাক্তারবাবুরা তাঁর জ্ঞান ফেরাবার চেষ্টা করলেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যে সফল হলেন,তারপর তাঁর প্রেসার, হার্টের অবস্থা ইত্যাদি খুঁটিনাটি সমস্ত পরীক্ষা করে আমাকে কয়েকটি রিপোর্ট বাইরে করাতে বললেন । তাঁদের নির্দেশ মত আমি নিজের পয়সায় রিপোর্টগুলি করিয়ে এনে জমা দিলাম । এরপর চিকিৎসা শুরু হলো । 
                               পরিশেষে ডাক্তারবাবুরা জানালেন যে হঠাৎ ব্লাড প্রেসার খুব বেড়ে যাওয়াতেই সেই বিপত্তি । তবে আর ভয়ের কোন কিছু নেই । তিন চার দিনের মধ্যেই সব ঠিক হয়ে যাবে । প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ঔষধ কটা কিনে দিতে হবে । স্বাস্থ্য কেন্দ্রের স্টকে ওগুলো নেই । বাধ্য হয়ে কষ্ট হলেও ওগুলো এনে দিলাম । 
        যথার্থ বলতে কি ভদ্রমহিলাকে 'মা 'বলে ডাকার ইচ্ছা ছিল । যাই হোক দিন দুই পরে উনি অনেকটা সুস্থ হওয়ার পর আমাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন আমার পরিচয় এবং ট্রেনে তাঁর কি হয়েছিল ? আগে তাঁর কথাটা জানিয়ে পরে আমার সব কথা তাঁকে বললাম । তিনি সব কথা মনোযোগ সহকারে শুনলেন । আমি কয়দিন হকারি বাদ দিয়ে অনুক্ষণ তাঁর জন্য স্বাস্থ্য কেন্দ্রেই কাটালাম । আরও দুদিন ঠিক চারদিন পরে স্বাস্থ্য কেন্দ্র তাঁকে রিলিজ করে দিল ।
এবার তাঁকে বাড়ি নিয়ে আসার ব্যাপার । তিনি বললেন, বাবা সাহেব তুমি আমাকে একটা টেলিফোন বুথে নিয়ে চলতো । টেলিফোন বুথে পৌঁছে তিনি কাউকে ফোন করলেন এবং লালগোলা স্টেশনেই ফিরে যাবার জন্য বললেন । ট্রেকারে করে লালগোলা স্টেশনে গেলে তিনি দুজনের জন্য বহরমপুর স্টেশনের জন্য দুটি ফাস্ট ক্লাস কামরার টিকিট কাটতে নির্দেশ দিলেন এবং টাকাও দিলেন । আমি টিকিট কেটে এনে তাঁর হাতে দিলাম । 
                                       পরবর্তী ভাগীরথী (লালগোলা ) এক্সপ্রেস ট্রেন এলে আমরা দুজনে ফাস্ট ক্লাস কম্পার্টমেন্টে উঠলাম । প্রায় একঘন্টার মধ্যে বহরমপুর স্টেশনে পৌঁছে গেলাম । নেমেই গেটের কাছে পৌঁছাতেই দেখি তিন চার জন গেট থেকেই তাঁকে ধরে ধরে একটি ঝাঁ চক চকে ইস্পাটেড গাড়িতে তাঁকে তুলে নিল । তিনি তখন তাঁদের নির্দেশ দিলেন আমাকেও ঐ গাড়িতে তুলে নেবার । অগত্যা আমাকেও উঠতে হলো । কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমরা বিশাল এক প্রাসা দোপম অট্টা লিকার গেট পেরিয়ে প্রা সাদোপম অট্টালিকার গেট পেরিয়ে প্রাসাদের লনে প্রবেশ করলাম । যা দেখলাম তাতে তো আমার চক্ষু চড়ক গাছ । লোক -লস্কর, ঝি- চাকর একদম রমরমে ব্যাপার । সবাই ছুটে এসে ওঁকে ধরে ধরে তাঁর বসবার ঘরে নিয়ে গেল । তিনি আমাকে ও তাঁর সঙ্গে আসবার নির্দেশ দিলেন । আমিও তাঁকে অনুসরণ করলাম । উনি একটি সোফায় হেলান দিয়ে বসে অন্য একটি সোফায় আমাকে বসার জন্য ইঙ্গিত করলেন ।কয়েক মুহূর্ত পরে দুজন পরিচারিকা দু -গ্লাস ফলের রস নিয়ে এল ।ফলের রস খাওয়ার পর তিনি উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে তাঁর সঙ্গে আসতে বলে চলতে শুরু করলেন ।পরে একটি সুসজ্জিত কক্ষে পৌঁছে আমাকে কয়েকটি বড় বড় বাঁধানো ফটোগ্রাফ দেখতে বললেন । তারপর একটি মহিলার ছবির প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানতে চাইলেন ওই ছবিটি কার আমি আন্দাজ করতে পারছি কিনা,উত্তরে আমি জানালাম এটি সম্ভবতঃ তাঁরই ছবি ।
                        হাসতে হাসতে তিনি বললেন , 'হ্যাঁ,ঠিকই চিনেছো, এটি আমারই ছবি ।' অন্য একটি ছবি দেখিয়ে তিনি বললেন, এই যে ছবিটি দেখছো এটি আমার স্বামী অর্থাৎ এই বাড়ির ভুতপূর্ব গৃহস্বামীর,আর এই যে ছবিটা দেখছো তিন জনের ,একজন হচ্ছে আমার ছেলে, আমার বৌমা, আর আমার নাতি, এরা এখন চাকুরী সূত্রে জাপানে থাকে, আর এই যে ছবিটা দেখছো এরা দুজন হলো আমার মেয়ে ও জামাই, চাকুরী সূত্রে এরা এখন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে থাকে । '
                            এবার তোমাকে একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবো । সে জন্যই তোমাকে এখানে ডেকে এনেছি । তোমার জীবনের সব কথা জানার পর এবং তোমার কর্তব্যপরায়নতা এবং আর্থিক অবস্থা জানার পর তোমার জীবনকে গুছিয়ে প্রতিষ্ঠিত করার ইচ্ছা আমার মধ্যে চাড়া দিয়ে উঠছে ।তাই তোমাকে আমি আপন করে নিতে চাই ।আর তোমাকে হকারি করে জীবন নির্বাহ করতে হবে না । তোমার যদি অনিচ্ছা না থাকে তবে তোমাকে আমি আইন -সম্মতভাবে পুত্র হিসাবে দত্তক নিতে চাই । আমি জানি আমার ছেলে,বৌমা কিংবা মেয়ে,জামাই কেউই আমার ইচ্ছার বিরোধিতা করবে না ।'

                       তুমি কি বলছো বলো ?
আমার মাথা ঘুরতে লাগলো প্রস্তাবটি শুনে ।       হ্যাঁ বলবো ,না - না বলবো,তাই নিয়ে দোলাচলে পড়লাম, আমার যে পিতৃ পরিচয়টাই নেই । কেমন করে এমন একজন মমতাময়ীকে ঠকাবো ? সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা গ্রস্ত হয়ে পড়লাম । 
         তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, 'কি সিদ্ধান্ত নিলে ?'
এবার তাঁর ব্যক্তিত্বের কাছে কুঁকড়ে গিয়ে বললাম- ' কিন্তু আমি অজ্ঞাত কুলশীল পিতৃ - পরিচয়হীন, পুত্ররূপে আপনার চরণে আশ্রয় পেলে আমার নীতিবোধ যে ছারখার হয়ে যাবে । কি পরিচয়ে আপনার সম্মান বাঁচাবো । আমার মত হাজারটা সাহেব আসবে যাবে ; ₹কিন্তু আপনার সম্মানে আঘাত লাগবে এমন কোন সিদ্ধান্ত নেব কি করে ? '
তিনি বললেন, ' আমার ও আমার স্বর্গগত স্বামীর পরিচয়েই তুমি সমাজে পরিচিত হবে ।
তুমি অমত করো না । এই মুহূর্ত থেকে আমি তোমার 'মা ', উনি তোমার 'বাবা ', আমার ছেলে তোমার 'দাদা ' আমার বৌমা তোমার 'বৌদি ',আমার মেয়ে তোমার 'দিদি', আমার স্বর্গীয় পরমেশ্বর দাসের 'দ্বিতীয় পুত্র' । নাও মুখ হাত ধুয়ে নাওয়া খাওয়া করে আমার কর্মচারীরা তোমাকে যে কক্ষটি দেখিয়ে দেবে সেখানে শুয়ে ঘুমিয়ে পড় । আমি এক্ষুণি আমাদের উকিলবাবুকে ডাকছি ।'
                               এভাবেই এক পিতৃ পরিচয় হীন, মুসলমান লালিত অজ্ঞাত কুলশীল সমাজ সংসারে ব্রাত্য এক মমতাময়ী মহিয়সীর দত্তকপুত্র রূপে প্রতিষ্ঠিত হলো, মাতার আদেশে ' সাহেব '-এর স্থলে জন্ম নিল  'দেবব্রত '- দেবব্রত দাস ।
                সেই থেকেই তিনি 'মা 'আমি 'পুত্র ' ।
তারপর শুরু হলো আমার মানুষ হয়ে গড়ে ওঠার পর্ব । মা অতঃপর আমাকে বহরমপুরের জে .এন .আকাদেমী উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি করে দিলেন । সেখান থেকে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে ভর্তি হলাম বহরম কলেজে ।সাম্মানিক স্নাতক কোর্সে রসায়ন নিয়ে পাসও করলাম,ফাস্ট ক্লাশ নিয়ে । পরে উত্তর বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন নিয়ে স্নাতকোত্তর হয়েছি ।
               ফলাফল ঘোষণার কিছুদিন পরে হঠাৎ মা একদিন বললেন, 'জানিস দেবু (দেবব্রত ),আজকে আমরা দুজনে বিকেলে নদীয়ার মায়াপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দিব, সেখানে বৈষ্ণব ধর্মের মহাপ্রভুর ২৯ চূড়ার চৈতন্যমঠ শ্যাম কুন্ডু,পূর্ণি পুকুর,রাধা কুন্ডু, মাসি ও মেসোর মন্দির রয়েছে, এসব দেখলে তুই খুবই আনন্দ পাবি, 'এই কথা বলে বিকালে ভাগীরথী লালগোলা এক্সপ্রেসে চেপে রানাঘাটে নামলাম । ওখান থেকে বাসে চেপে মায়াপুর পৌঁছলাম । মায়াপুরে পৌঁছে শুধু চারিদিকে বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী লোকজনকে দেখে আমার মনে হয় এসে গেল, কারণ আমি তো বিধর্মী,যদি কোন কারণে কেউ জানতে পারে বা জিজ্ঞাসাবাদ করে বসে, তাহলে মহিয়সী মায়ের অসম্মান হবে ভেবে, মায়ের চোখের আড়ালে ওখান থেকে সোজা শিয়ালদহে পৌঁছলাম, ওখান থেকে হাওড়া তারপরে কোন পয়সা না থাকার জন্য ভয়ে এই স্টেশনে বাধ্য হয়ে নেমে পড়লাম ।
     ক্রমশঃ প্রকাশ্য-------পরের পর্বে


Attachments area

Comments

Popular posts from this blog

পিয়ালি দাসের লেখা

পারমিতা রাহা হালদারের লেখা