উত্তম চক্রবর্তীর ধারাবাহিক উপন্যাস অজ্ঞাতবাসের শেষ পর্ব

- চার -
ছেলে বেলা থেকেই একটা আদর্শকে সামনে রেখে বড় হয়েছে দূর্বা, দূর্বা চৌধুরী। বাবা ওপার বাংলার লোক অবিনাশ
চৌধুরী এপারে এসে একসময় বামপন্থি আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। বাড়িতে প্রায়ই গরীব মানুষদের উপর
জমিদারদের আর বুর্জোয়া বড় লোকের অত্যাচারের কথা, সরকারের উদাসীনতার কথা, সাম্যবাদের কথা এসব
আলোচনা করতেন। ভোটের সময় ওর দাদারা সবাই বামপন্থিদেরই ভোট দেয়, কিন্তু আসলে কেউই আর রাজনীতির
ধারে কাছে যায়নি। দূর্বার বড়দি বন্যা চাকরি করে এবং অতি আধুনিকা ধরনের মেয়ে। একমাত্র ব্যতিক্রম হল
দূর্বা। ও যেন ঠিক বর্ষায় ভরা কুলু কুলু করে বয়ে যাওয়া চঞ্চলা নদী।
দূর্বা ওদের কাজের মাসীকে, রাস্তার রিক্সা ওয়ালাদের, ট্রেনে হকারদের ,বাজারে সবজি বিক্রেতাদের, ঠেলা
ওয়ালাদের দেখে আর ভাবে এরাই আসল সর্বহারা, যাদের আর কিছুই হারাবার নেই। শুধু দুবেলা চারটে রুটি, একটা
পড়বার কাপড় আর একটা মাথা গোজার যায়গা পেলেই এই মানুষ গুলি সন্তুষ্ট। এদের মুখে হাসি জোগালে এদের
একটু শিক্ষা দীক্ষার ব্যবস্থা করতে পারলেই বাবার সাম্যবাদের ধারনার বাস্তবায়ন হবে।
দূর্বা স্কুল ছেড়ে কলেজে যায় ,বয়স বাড়ার সাথে সাথে দেখতে পায় আজকাল রাজনৈতিক দলের নেতা গুলি কি ভাবে
স্রেফ ভোটের রাজনীতিতেই, নিজেদের সমাজ কল্যাণের কাজকে জলাঞ্জলি দিয়ে, ক্ষমতা, কালো টাকা আর
সম্পত্তি বাড়াবার নেশায় মেতে উঠেছে। বাবাও আজকাল বাড়িতে রাজনীতির আলোচনা উঠলে বিরক্ত প্রকাশ
করেন আর শুধু বলেন, “ আমাদের সময় আমারা একটা আদর্শকে নিয়ে চলতাম। আর আজকাল এদের দেখে লজ্জা
হয় আর ঘৃণা হয়। কিচ্ছু হবেনা এই দেশটার, কিচ্ছু হবে না।“
দূর্বা এখন আর সাম্যবাদের কথা ভাবে না। দুর্গা শুধু ভাবে আমার চারিদিকে যারা সত্যিকারের গরীব বা বঞ্চিত
মানুষ তাদের সেবা করতে পারলেই সমাজের কিছুটা অন্তত ভাল হবে, কিছু লোক অন্তত হাসি মুখে বেঁচে থাকতে
পারবে। গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে অন লাইনে ইতিহাসে এম এ করার সাথে সাথে দূর্বা বারাসতের বেশ বড় একটা
এন জি ও সংস্থাতে যোগ দেয়। ওদের ওখানে কাজের জন্য টাকা পয়সা খুবই কম দেয় ওরা , কিন্তু দুরে কোথাও
গেলে দূর্বার যাতায়াত বা খাওয়া দাওয়ার খরচা সবই দেয় এন জি ওর চাপা ডালি অফিস।
প্রায় কুড়ি বাইশ জন আছে ওরা , গ্রামে যায়, বস্তিতে যায় এমনকি সরকারি অফিসেও যায় এই মানুষ গুলির দুঃখের
কথা উপর মহলে জানাতে। ইতিমধ্যেই সংস্থা দত্ত পুকুর, বিরা, অশোক নগরের কয়েকটা গ্রামে শিক্ষা ব্যবস্থা
গড়ে তুলেছে । সরকারি স্কুল বিল্ডিঙে বিকাল বেলা গ্রামের বয়স্ক লোকদের জন্য ক্লাস চালু করেছে। অনেকেই
ক্ষেতের কাজ সেরে এখন ঐ ক্লাসে যোগ দেয়। একেকটা স্কুলের দায়িত্বে দূর্বাদের দলের দুজন করে আছে।

তারাই সপ্তাহে চারদিন গিয়ে স্কুলে এই মানুষ গুলিকে লেখা পড়া শেখায়। ওদের এন জি ও বারাসত থেকে দশ
কিলোমিটার দুরে টাকি রোডে গোলা বাড়িতে একটা বৃদ্ধাশ্রমও খুলেছে এক বছর আগে।
দূর্বা চৌধুরী বাবা মার সবচেয়ে কনিষ্ঠা সন্তান। বড়দা অজয় চৌধুরী শিয়ালদা স্টেশনে রেলে বড় অফিসার
র‍্যাঙ্কে চাকরি করেন। বড় বৌদি বড়লোকের মেয়ে , কলকাতা শহরে বাবার তিন তিন খানা বাড়ি গাড়ি আর কলেজ
স্ট্রিটে প্রকাশনা হাউস আর বড় দুখানা বইয়ের দোকান। এক ভাই আর একমাত্র বোন। বাপের বাড়ির অতো বড়
সম্পত্তির একটা বড় অংশের মালিক। দাদার ছেলে যাদবপুরে ইঞ্জিনিয়ারিঙে ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র , আর মেয়ে
শিয়ালদায় লরেটো ডে স্কুলে এবার ক্লাস টেনে।
দূর্বার ছোড়দা অনীশ চৌধুরী এল এল বি পাস করে শিয়ালদা কোর্টে প্র্যাকটিস করেন। ছোট বৌদি মধ্য বিত্ত
পরিবারের মেয়ে। খিদিরপুরে বাপের বাড়ি। ছোড়দার শ্বশুর বাবার পুরানো চেনাশোনা বড় কাপড়ের ব্যবসায়ি,
খিদিরপুরেই দোকান। একটাই দাদা, বাবার সাথে ব্যবসায় যোগ দিয়েছে আর কয়েক বছর আগে বিয়ে করেছে।
ছোড়দার বিয়ে হয়েছে প্রায় দশ বছর হল কিন্তু এখনো ওদের কোন ছেলেপুলে হয়নি। দাদা বৌদি দুজনেই অনেক
ডাক্তার বৈদ্য দেখিয়েও কিছুই লাভ হয়নি। এখন এমন অবস্থা যে অন্ধবিশ্বাসী ছোট বৌদি কখনো এই তান্ত্রিক
আর কখনো বা ঐ মায়ের বাড়ি করে আর তাবিজ কবজের ভরসায় দিন কাটায়।
দূর্বার উপর ছোড়দার পড়ে ওর দিদি বন্যা, দু বছরের বড়। কলকাতায় লেডি ব্রেবরন কলেজ থেকে বি এস শি
কম্পিউটার পাস করে আর কলকাতা বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে এম এস শি করে এখন সল্ট লেকে সেক্টর ফাইভে একটা
সফট অয়্যার কোম্পানিতে চাকরি করছে। ছোড়দার বিয়ের দুইবছর বাদে দূর্বার মা মারা যাবার পর বাড়িতে প্রধানত
দূর্বাই ওর বাবার দেখা শুনা করে, কারণ ওর বাবা অবিনাশ বাবু প্রায় পনেরো বছর আগে বাস এক্সিডেন্টে ওনার
ডান পায়ের অর্ধেক হারিয়েছেন আর তারপর থেকে বাড়িতেই বসা। চাপা ডালি মোড়ে ওদের কাপড়ের দোকানটা
বিক্রি করে টাকাটা ব্যাঙ্কে ফেলে অবিনাশ বাবু মাসে মাসে সুদ পান আর বেশির ভাগ টাকাই দুই মেয়েকে দিয়ে দেন,
ওদের হাত খরচার জন্য।
বারাসতের নব পল্লিতে নিজেদের দোতলা বাড়ি দূর্বাদের। এক তলায় বড়দা আর তার পরিবার তিনটে ঘরে থাকেন।
বসার ঘর আর রান্না ঘর ছাড়া একতলায় একটা ঘরে থাকে দূর্বা। দোতলায় ছোড়দার দুটো ঘর আর বাবার আর
দিদির একটা করে ঘর। বাড়িতে ঠিকা রান্নার লোক ছাড়াও রয়েছে ঘরের কাজের মহিলা আর মাসিক চুক্তিতে রাখা
মালী। অবিনাশ বাবুর বাড়িটা সাত কাঠা জমির উপর। সামনে ফুলের বাগান ছাড়াও বেশ কিছু নারকেল গাছ, সুপারি আম
কাঁঠাল আর জামের গাছ আছে ওদের বাড়িতে।
দূর্বার চেহারাটা মাঝারি ,খুব একটা মন্দ নয়। লম্বায় পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি, গায়ের রঙ চাপা, মাথায় কোঁকড়ানো ঘন
কালো চুল, স্বাস্থ্য খুব ভাল, হরিণ গভীর চোখ দুটো বেশ বড় বড় আর মুখটা ভীষণ মিষ্টি, বেশ একটা অন্য
ধরনের লালিত্য আছে।সবচেয়ে সুন্দর হচ্ছে দূর্বার মন। গরীব দুঃখীর জন্য ওর মন সবসময়েই কাঁদে। জীবনে কোন
চাহিদা বা অভিযোগ নেই, শুধু মানুষের ভাল করতে পারলেই খুশি। জীবনটাকে দূর্বা পুরোপুরি কাজে লাগাতে চায়,
মানুষের দুঃখে তাদের সেবা করতে চায়,পাশে দাঁড়াতে চায়।
এহেন দূর্বার একদম বিপরীত হল বন্যা। বন্যার হাইট সাড়ে পাঁচ ফুটের উপর, গায়ের রঙ ধব ধবে ফর্সা, ফেদার
কাট হেয়ার স্টাইল, মুখটাও ভারি সুন্দর আর স্বাস্থ্য বেশ ভাল। ওর সাজ গোঁজ বা চেহারাতে একটা অন্য
আকর্ষণ আছে। বন্যা জীবনটাকে পুরোপুরি উপভোগ করতে চায়, সমস্ত ভাল জিনিসটা হাতে পেতে চায় আর তার
জন্য সব কিছু করতে প্রস্তুত। এখন চাকরি করে , টাকা কামায়, তাই ওকে আর দেখে কে। ছুটির দিনগুলি হয়
ল্যাপটপে অথবা বন্ধু বান্ধবদের সাথে আড্ডা মেরে সিনেমা দেখে সময় কাটায়।
দূর্বার বড়দাকে ওনার শ্বশুর মৌলালিতে সি আই টি রোডের উপর একটা ফ্ল্যাট লিখে দিলেন আর মাসের শেষে
বাবাকে নমস্কার করে বড়দা তার পরিবারকে নিয়ে চলে গেলেন ঐ বাড়িতে। বড়দা আজ না হোক কাল বারাসত ছেড়ে

কলকাতায় চলে যাবে সবাই জানত। এক শ্বশুর বাড়ির এতো বড় সম্পত্তি থাকতে এখানে ও এতো লোকের মাঝে
থাকবেই বা কেন ? আর দুই হল দাদার অফিস, ছেলের কলেজ বা মেয়ের স্কুল সবই যখন কলকাতায় তখন এতদূরে
থেকে যাতায়াত করার কোন মানেই হয়না। নিচের তলাটা খালি হয়ে যায় আর দূর্বা বাবাকে বলে ছোড়দাকে নিচের
তলায় পাঠিয়ে নিজে উপরের একটা ঘরে শিফট করে।
বড়দা আর তার পরিবার চলে যাবার পর বাড়িটা বেশ খালি হয়ে যায়। ছোড়দা আর বৌদি নিচে, উপরে স্রেফ বাবা আর
দুই বোন। তার মধ্যে বন্যা যতক্ষণ বাড়িতে থাকে ওর ঘরে বসে হয় ল্যাপটপে অফিসের কাজ করছে অথবা সেল
ফোনে বন্ধুদের সাথে বক বক করে চলেছে বা চ্যাট করছে। বাবার পাশের ঘরটাতেই শিফট করেছে দূর্বা। বাবাকে
সময় মত খাইয়ে দেওয়া, ওষুধ বিসুধ খাওয়ানো সব নিজেই দেখা শোনা করে।
দূর্বা ছুটির দিনে প্রায়ই ওদের বারাসত টাউন লাইব্রেরীতে গিয়ে পড়াশুনা করে বা বই নিয়ে আসে বাড়িতে পড়বার
জন্য। লাইব্রেরীটা ছোট হলেও প্রচুর বইয়ের কালেকশন আছে। এম এ কোর্সের সব বই হায়দ্রাবাদের আই সি এফ
আই ইউনিভার্সিটি কুরিয়ারে ওর ঠিকানায় পাঠালেও দূর্বা শুধু ঐ বইয়ের ভরসায় থাকেনা। সন্ধ্যা ছটার পর
প্রায়ই লাইব্রেরীতে যায় দূর্বা। ও ছাড়াও আরও অনেক ছেলে মেয়ে বা বয়স্ক লোকেরাও আসে ওখানে, বই পড়ে
আবার সঙ্গে করে নিয়েও যায়। আর এখানেই দূর্বা প্রায়ই আসতে দেখে সুমনকে।
ছেলেটাকে মানে সুমনকে দূর্বা আগেও দেখেছে ট্রেনে ফেরি করতে। দূর্বা মাঝে মাঝে ওর এন জি ওর কাজে ট্রেনে
করে বিরা বা দত্ত পুকুরের দিকে যাতায়াত করে। আর তখন ফেরার সময় অনেক বারই সুমনকে দেখেছে ট্রেনে
মনিহারী জিনিষ বেচতে। কিন্তু এই ছেলেটা লাইব্রেরীতে এসে কি বই পড়ে আর কেনই বা পড়ে সেটা দূর্বা জানেনা।
ওর প্রথম সন্দেহ হয় একদিন দত্ত পুকুর থেকে ট্রেনে ফেরার সময়।
ট্রেনে এক ভদ্র মহিলা ভিড়ে আর গরমে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল দেখে ভিড়ের মধ্যে থেকে এই হকার ছেলেটা এগিয়ে
আসে আর চেঁচিয়ে বলে ওঠে,” সরুন, আপনারা সরে দাঁড়ান। একটু হাওয়া আসতে দিন আর প্লিস আমাকে একটু
যায়গা করে দিন দেখি। আমি দেখি কিছু করতে পারি কিনা।“
কয়েকজন লোক হকারটাকে চিনত বোঝা গেল আর ওরা তাড়াতাড়ি ওকে যায়গা করে দেয়। এর মধ্যেই একজন
টিপ্পনি কাটে,”এই সরে যা সরে যা, ডাক্তার বাবু এসে গেছে।“ হকার ছেলেটা মুচকি হেসে কোন জবাব না দিয়ে এগিয়ে
গিয়ে ঐ মহিলার পাশের সিটে বসে ওর বা হাতের তালু আর নাক চেপে ধরে এমন কিছু একটা করল যাতে কয়েক
মুহূর্তের মধ্যে ঐ মহিলা সুস্থ হয়ে উঠে বসলেন।
একটা হকারের এই অদ্ভুত চিকিৎসা পদ্ধতি দেখে অনেকেই হাত তালি দিয়ে ওকে অভিনন্দন জানায়। দূর্বা অবাক
হয়ে দেখে ছেলেটা ওর কামরা থেকে বারাসত স্টেশনেই নামে আর স্টেশনের একটা চায়ের দোকানে গিয়ে বসে চায়ের
অর্ডার দিল। দুর্গা লক্ষ্য করে দোকানের লোকটাও ওকে বেশ ভাল ভাবেই অভ্যর্থনা করে বেঞ্চে বসতে বলল।
স্টেশনের উপর চায়ের দোকান অনেক আছে, কিন্তু ঐ লোকটা ছেলেটার সাথে যেভাবে কথা বলল তাতেই বোঝা যায়
একে সবাই চেনে আর যথেষ্ট সন্মান করে।
আর সেই হকার ছেলেটাই লাইব্রেরীতে এসে বই পড়ে বা কোন কোন সময়ে হাতে করে বই নিয়ে যায় দেখে দূর্বার
সন্দেহ বাড়তে থাকে। কিন্তু অহেতুক এই সন্দেহকে ও মনে চেপে রাখতো এতদিন । এই ঘটনার পর একদিন দূর্বা
গিয়ে লাইব্রেরীর যেই তাকে ঐ ছেলেটা এসে রোজ বই খোঁজে বা যেখান থেকে বই বেড় করে নিয়ে গিয়ে পড়তে বসে ,
সেই তাকে গিয়ে দেখতে থাকে কি পড়ে ছেলেটা, কিসের এতো ইন্টারেস্ট ওর।
দূর্বার চোখ ছানা বড়া হয়ে যায় যখন ও দেখে সব মোটা মোটা ইংরাজি চিকিৎসা বিদ্যার বই আর মেডিক্যাল
জার্নাল। অনেক বই দেশী আবার বেশির ভাগ বই বিদেশী বড় বড় ডাক্তারদের লেখা। দূর্বা অবাক হয়ে যায় একটা
ট্রেনের ফেরিওয়ালা এই সব মেডিক্যালের বই নিয়ে কি পড়ে বা কেনই বা পড়ে এসব বই ? তাহলে কি ছেলেটা খুব

শিক্ষিত ছেলে আর মেডিক্যাল সাইন্সের অনেক কিছু জানে ? নাহলে কিভাবে ঐ দিন ট্রেনে ঐ মহিলাটাকে মুহূর্তের
মধ্যেই ঠিক করে ফেলল ও ? দূর্বার মনে গাড় সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে।
সুমন সেদিন লাইব্রেরী যায়নি। বাগড়ি মার্কেট থেকে স্টিলের চেন আর দক্ষিণেশ্বর মন্দির থেকে লোকনাথ বাবার,
রাম ঠাকুরের আর মা কালীর লকেট নিয়ে এসেছে আগের দিন , এগুলি হবে ওর নতুন আইটেম। আজকাল কয়েকজন
হকার এইসব নিয়ে এসেছে মার্কেটে আর বেশ ভাল চাহিদা আছে এগুলির। সুমন ওইদিন বিকালেই লাইন থেকে ঘরে
ফিরে সব লকেট চেনে লাগিয়ে চেনগুলিকে রেডি করে রাখছিল। প্ল্যান আছে পরদিন থেকেই ওর ফেরির লিস্টে এই
আইটেম গুলিও যোগ করা।
পরের দিন ওর প্রায় পঞ্চাশ ভাগ চেন আর লকেট বিক্রি হয়ে গেল। হাতে থাকে মাত্র অর্ধেক মাল। ঠিক করে
পরের দিন গিয়ে এবার আরও বেশি করে ষ্টক তুলবে ঘরে। সেইমত এরপর এক সপ্তাহ এই কেনা বেচায় ব্যস্ত
থাকায় সুমন আর লাইব্রেরীতে যেতেই পারল না। ওদিকে সুমন সম্পর্কে এই অদ্ভুত খবর দূর্বাকে ভিতরে ভিতরে
ওর সম্পর্কে আরও বেশি আগ্রহান্বিত করে তোলে। ছেলেটা কে আর কেনই বা লাইব্রেরীতে গিয়ে মেডিক্যালের বই
পড়ে, এই কথা ওকে ভাবিয়ে তোলে, কিন্তু দূর্বা সুমনের সম্পর্কে আর কোন রকম সুত্রই জানতে পারেনা। লোকটা
যেন ওর শামুকের খোলের ভিতর ঢুকে বসে আছে কোথাও। এখন লাইব্রেরিতেও আসছেনা, মনে মনে সুমনকে দেখবার
জন্য আর ওর কৌতূহল মেটাবার জন্য ছটফট করতে থাকে দূর্বা।
দূর্বার বয়স এখন পঁচিশ, কিন্তু কোন ছেলের সাথে ভালবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। ওদের এন জি ওতে বিমান
নামের একটা ছেলে ওর সাথে খুব কথা বলে আর বন্ধুত্ব পাতাতে চায়, কিন্তু দূর্বা ওকে তেমন পাত্তা দেয় না। ওর
ছ্যাবলা ধরনের ছেলে একদম ভাল লাগে না। ছেলেদের মধ্যে যদি একটা পুরুষালি ভাব বা গাম্ভীর্য না থাকে তাহলে
সেই সব ছেলেরা সাধারণত একটু মেয়েলি স্বভাবের বা স্ত্রৈণ হয় আর সেটা ওর ভাল লাগেনা। আর এই কারনেই
দূর্বার জীবনে আজ পর্যন্ত কোন ছেলে ওর মনে ঠাই করে নিতে পারেনি।
……চলবে।
- পাঁচ -
বন্যা কয়েকদিন যাবত অফিস থেকে অনেক রাত করে বাড়ি ফিরছে। রোজ রাতে বাবা বন্যার জন্য অপেক্ষা করে
থেকে শেষে খেয়ে দেয়ে শুয়ে পরেন। কিন্তু বন্যার জন্য ওনার চিন্তা হয় কারণ বন্যা যে বেশি আধুনিকা এবং একটু
অন্য ধরনের মেয়ে, দূর্বার একদম বিপরীত, সেটা অবিনাশ চৌধুরী বেশ ভাল করেই জানেন। আর আজকাল মেয়েদের
রাস্তা ঘাটে কত রকমের বিপদ হচ্ছে, বন্যা বা দূর্বার এই বয়সটাই তো মারাত্মক।
অবিনাশ বাবু একদিন সকালে বন্যাকে ডেকে বকাবকি করলেন বাড়ি ফিরতে কেন এতো দেরি হয় বলে। বন্যা বাবার
মুখের উপর বেশি জবাব দেয়নি, কিন্তু দুদিন বাদেই সেদিন রাতে অনেক রাত অবধি বাড়ি ফিরল না মেয়েটা।
সাধারণত বন্যা অফিস থেকে রাত সাড়ে সাতটার মধ্যে বাড়ি চলে আসে। কিন্তু আজ ওর সেল ফোন সন্ধ্যার পর
থেকেই সুইচ অফ ছিল, দূর্বাও অনেক বার চেষ্টা করে ওকে ফোনে পায়নি।
দূর্বার ছোড়দা বৌদি বাবা সবাই খুব চিন্তা পড়ে যায়। ওর কলেজের দুই একজন বন্ধুকে ফোন করেও কোন খবর
পাওয়া যায়না। এমন কি বড়দার বাড়িতেও যায়নি বন্যা। রাতে কেউই ভাল করে খাবার খেতে পারল না বন্যার
চিন্তায়। রাত বারোটা নাগাদ সবাই যখন শুয়ে পড়েছে ঠিক তখন দূর্বাদের বাড়ির সামনে একটা রিক্সা থকে নেমে
এলো বন্যা। ওর পড়নের সালোয়ার কামিজ আলুথালু চুল উসকো খুস্ক। জায়গায় জায়গায় খাবারের দাগ লেগে ,একটা
বিধ্বস্ত চেহারা।

অন্ধকারে সুমন ওকে ধরে ধরে বাড়ির গেটে এসে লোহার গেটটা খুলে ভিতরে ঢুকে বারান্দায় উঠে দরজার বেল দেয়।
বারান্দায় সুমন বন্যকে শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে, বন্যার চোখ বন্ধ, মনে হয় অচেতন অবস্থা বা শরীর অত্যন্ত
খারাপ, মাথাটা একপাশে হেলানো, ঠিক করে দাঁড়াতেও পারছেনা মেয়েটা। বারান্দার লাইট জ্বলে ওঠে আর দরজাটা
একটু বাদেই খুলে যায়। সামনে এসে দাঁড়ায় বন্যার ছোট বৌদি। বৌদি বন্যাকে ঐ ভাবে দেখেই ভয় পেয়ে যান আর
চিৎকার করে ডাকেন, “ দূর্বা। শিগগীর নিচে এসো একবার।“
দূর্বা দৌড়ে নেমে আসে বাড়ির দরজায় আর দিদির ওইরকম অবস্থা দেখে চমকে ওঠে,” এ কি, কি হয়েছে দিদির ?”
দূর্বা আরও বেশি অবাক হয় সুমনকে দিদিকে ঐভাবে ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। কি হয়েছে দিদির, এই হকার
ছেলেটা দিদির কাঁধের নিচে হাত ধরে ওকে বাড়ি নিয়ে এলো কোথা থেকে ? দূর্বা আগে তাড়াতাড়ি বন্যাকে ধরে ফেলে
আর সুমন বন্যার হাত ছেড়ে দেয়। বৌদি দরজাটা খুলে দাঁড়ায় যাতে বন্যাকে নিয়ে ভিতরে ঢুকতে পারে দূর্বা।
অনীশেরও ঘুম ভেঙে গেছিল। তাড়াতাড়ি উঠে এসে জিজ্ঞাসা করে,” কি হয়েছে বন্যার, কোথায় ছিল এতক্ষণ ?”
দূর্বা ওর আগের নিচের ঘরের খাটে নিয়ে গিয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে দেয় বন্যাকে। বন্যার চোখ বন্ধ, আর সুমন চুপ করে
তখনো বাইরের দরজায় দাঁড়িয়ে। দূর্বা দিদিকে শুয়ে দিয়ে এসে দরজায় দাঁড়ায়, সোজাসুজি তাকায় সুমনের দিকে আর
জিজ্ঞাসা করে,” কি হয়েছে দিদির, আর আপনি ওকে কোথায় পেলেন ? ওকি অজ্ঞান হয়ে আছে ? ওকে কি ডাক্তার
দেখাতে হবে, কি মনে হয় আপনার ?”
এতক্ষণে জবাব দেয় সুমন। শান্ত গলায় বলে,”দেখুন, উনি উলটো ডাঙ্গা থেকে লাস্ট বারাসত লোকালে উঠেছিলেন
আর প্রথম থেকেই ওনাকে বেশ অসুস্থ মনে হচ্ছিল। ওনার সাথে আরও দুটো ছেলে ছিল কিন্তু তারা দমদমে ওকে
এই অবস্থায় ছেড়ে দিয়েই নেমে চলে যায়।“ দূর্বা ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞাস করে,” তারপর ?” সুমন ওর উৎকণ্ঠা
বুঝতে পেরে আবার বলে,” আমি বারাসতেই থাকি আর ট্রেনে হকারি করি। দেখি বারাসত স্টেশন আসবার পরেও উনি
নামছেন না। তাই আমি ওনাকে স্টেশনে নামিয়ে চায়ের দোকানে বসিয়ে ওনার নাম ঠিকানা জিজ্ঞাসা করি, কিন্তু উনি
কিছু বলার মত অবস্থায় ছিলেন না।“
দূর্বার ছোড়দা হাঁ করে শুনছিল সুমনের বর্ণনা। বৌদি রান্নাঘরে গিয়ে দুধ জাল দিচ্ছে বন্যাকে দেবার জন্য। অনীশ
সুমনকে জিজ্ঞাস করল,” তা আপনি জানলেন কি করে ও এই বাড়ির মেয়ে ?”
সুমন নিরুত্তাপ ভাবে জবাব দেয়,”ঐ যে ওনার হাতের ছোট ব্যাগটা, ওটা খুলে ওর ভিতরে ওনার আধার কার্ড দেখে
নাম আর এড্রেস পেয়ে যাই। আমার মনে হয় ওনার উপর কোন শারীরিক অত্যাচার হয়েছে। ওকে এখুনি কিছু
জিজ্ঞাসা করবেন না। উনি কথা বলতে পারবেন না। আমি আসবার পথে দুটো ট্যাবলেট কিনে একটা খাইয়ে দিয়েছি,
এই আরেকটা কাল সকালে চা বিস্কুট খাবার পর খাইয়ে দেবেন । আজ উনি আর কথা বলতে পারবেন না কারণ ওকে
আমি যেই ট্যাবলেট খাইয়েছি তাতে ওর যন্ত্রণা কমবে আর তার সাথে একটা আচ্ছন্ন ভাব আসবে। আর সে জন্যই
উনি এখন একটা ঘোরের মধ্যে আছেন।“
সুমনের হকারের চেহারা এতদিন ট্রেনে বা লাইব্রেরীতে দেখেছে দূর্বা, কিন্তু আজ ওর সাথে কথা বলে অবাক হয়ে
গেল। কি সুন্দর ভদ্র ভাবে কথা বলে ছেলেটা। দূর্বার আগে থেকেই সন্দেহ ছিল যে এই লোকটা নিশ্চয়ই শিক্ষিত
আর ডাক্তারি বোঝে বা জানে। তবুও সুমনকে জিজ্ঞাসা করে, ” আচ্ছা, আপনি তো বললেন যে আপনি একজন
হকার, তা আপনি এই অবস্থায় কোন ট্যাবলেট খাওয়াতে হবে সেটা জানলেন কি করে ?“
সুমন দূর্বাকে আগে কয়েকবার লাইব্রেরীতে দেখেছে , তাই আর লুকল না। শুধু হেসে জবাব দিল, ”ঐ একটু আধটু বই
পড়ে জেনেছি আর কি। আপনি কাল ওনাকে একটা ভাল ডাক্তার দেখাবেন।“ কথাটা বলে সুমন মুচকি হাসে আর
দূর্বার ছোড়দার দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করে বলে ,”আচ্ছা, আমি তাহলে আসি। অনেক রাত হয়ে গেছে । নমস্কার।“
এরপর সুমন আর দাঁড়ায় না।

সুমনের শেষ কথায় প্রত্যুত্তরে অনীশ শুধু হাতজোড় করে বলে,” আচ্ছা, নমস্কার। অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।“
দূর্বা আর ওর ছোড়দা অবাক হয়ে সুমনের যাবার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। সুমন যে আজ ওদের কত বড় একটা
চিন্তা থেকে বাঁচাল আর দিদিকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যে ওদের কি উপকারটাই না করল তাই ভেবে মনে মনে সুমনের
প্রতি কৃতজ্ঞটায় মনটা ভরে উঠল দূর্বার। ঠাকুরকে ধন্যবাদ জানাল যে দিদি সুমনের মত একটা ভদ্র ছেলের হাতে
পড়ে ঠিকমত বাড়ি ফিরেছে আজ।
বন্যার অফিসের এক কলিগ অচিন্ত সেন অনেকদিন থেকেই বন্যার সাথে ভাব জমিয়েছিল। উলটো ডাঙ্গায় বাড়ি, বড়
লোকের ছেলে, বিবাহিত আর দু’বছরের একটা বাচ্চার বাবা। কিন্তু তবুও অন্য মেয়েদের দিকে ওর ভীষণ আগ্রহ।
বন্যা অফিসে জয়েন করে এক বছর আগে আর এতো সুন্দর আর স্মার্ট মেয়েটাকে বাগে পাবার জন্য অচিন্ত
অনেক দিন যাবতই ওকে ডিনারে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছিল।
বন্যা জানে যে অচিন্ত বিবাহিত, তবুও অচিন্তর হ্যান্ড সাম চেহারা আর স্মার্ট কথা বার্তা ওর ভীষণ ভাল
লাগতো। টিফিনে দুজন প্রায় দিনই একসাথে ক্যান্টিনে বসে টিফিন খায় হাসি ঠাট্টা করে, গল্প করে। ধীরে ধীরে
অচিন্তর কথার জালে জড়িয়ে পড়তে থাকে বন্যা। অফিস ফেরত বেশ কয়েকদিন ওরা দুজন উলটো ডাঙ্গায় ভি আই
পি মোড়ে একটা রেস্টুরেন্টে বসে আর গল্প করে সময় কাটায়। ওইদিন বন্যা রাজি হয়ে যায় ডিনারে যেতে আর
অচিন্ত সেই সুযোগটা পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করে।
মানিকতলায় ভি আই পি রোডের উপর একটা হোটেলে নিয়ে যায় বন্যাকে। ওখানেই অচিন্ত গোপনে ওর কোল্ড
ড্রিংকে বিলিতি মদ মিশিয়ে দেয়। খেতে খেতেই বন্যা অসুস্থ বোধ করতে থাকে, ওর মাথা ঝিম ঝিম করতে থাকে। ঐ
হোটেলেই অচিন্ত আগে থেকেই একটা রুম বুক করে রেখেছিল। এরপর যা হবার তাই হয়, বন্যার নরম সুন্দর
দেহটাকে ঘেঁটে নোংরা করে দেয় অচিন্ত। দৈহিক মিলনের শেষে ওর ঘনিষ্ঠ দুই বন্ধুকে ওকে উলটো ডাঙ্গা স্টেশন
থেকে বারাসত লোকালে তুলে দিয়ে আসতে বলে। আর সেই দুজন বন্ধু বন্যাকে ধরে ধরে নিয়ে একসাথেই ট্রেনে ওঠে।
বন্যা চোখ বুজে নেশায় ঝিম মেরে বসে থাকে জানলার পাশে, দমদম স্টেশনে ট্রেন ছাড়বার ঠিক পরেই ওরা দুজন
বন্যাকে ফেলে রেখে লাফিয়ে ট্রেন থেকে নেমে যায়।
সুমন কোন পার্টি, রাজনীতি বা ইউনিয়ন করবে না আগেই ঠিক করে রেখেছিল। কিন্তু সরকার হকারদের উপর কিছু
নতুন নিয়ম কানুন লাগু করায় ওদের সবকটা ইউনিয়ন মিলে শিয়ালদায় একটা মিটিং ডেকেছিল আর হুমকি দিয়ে
রেখেছিল যে যারা ঐ মিটিঙে যাবেনা তাদের লাইসেন্স ক্যান্সেল করে দেওয়া হবে।
জলে থেকে তো আর কুমিরের সাথে লড়াই করা যায়না। তাই বাধ্য হয়ে সুমন ওর বন্ধু আর ঘণ্টাদার খুব প্রিয় পাত্র
নারুদার সাথে গিয়েছিল মিটিঙে। শিয়ালদা মেইন স্টেশনের সামনের বড় ফাকা জায়গায় মিটিংটা শেষ হয় রাত সাড়ে
নটায়। এরপর দুজনে স্টেশনের বাইরে একটা হোটেলে খেয়ে নিয়ে লাস্ট ট্রেন ধরে। নারুদা মধ্যমগ্রামে নেমে যায়।
সুমন প্রায় ফাঁকা ট্রেনের কামরায় দুরে বসে বন্যাকে লক্ষ্য করতে থাকে।
বারাসতের আগে ওদের কামরায় আর মাত্র চার পাঁচজন যাত্রী আর বন্যা বসে থাকে ট্রেনে। ট্রেনের ফুরফুরে
হাওয়ায় ইতিমধ্যেই বন্যা গভীর ঘুমে প্রায় অচেতন হয়ে বসেছিল। বারাসত স্টেশনে ট্রেন আসতেই বাকি লোকগুলি
নেমে যে যার রাস্তায় চলে যায়, শুধু সুমন বসে বন্যাকে দেখতে থাকে। ওর প্রথম থেকেই সন্দেহ হয়েছিল যে
মেয়েটা নিশ্চয়ই সুস্থ না। বারাসতে এসেও যখন নামেনি ও নিশ্চিত হয়ে যায় যে মেয়েটা অসুস্থ।
দুটো ইয়ং ছেলে এতো সুন্দর দেখতে একটা মেয়েকে নিয়ে এতো রাতে উলটো ডাঙ্গা স্টেশন থেকে উঠল আর দমদমে
ট্রেন থেকে নেমে গেল ? মেয়েটাকে দেখে তো বেশ ভদ্র ঘরের মনে হয় , কিন্তু দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে ওকে
শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। বারাসত স্টেশনে কেলোদার চায়ের দোকানে সুমন প্রায়ই বসে চা খেয়ে বাড়ি ফেরে।
বন্যাকে ধরে ধরে প্ল্যাটফর্মে নামিয়ে কেলোদার চায়ের দোকানে নিয়ে গিয়ে বেঞ্চে বসায়। কেলোদা তখনই দোকান
বন্ধ করে বাড়ি যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

অচেনা অজানা মেয়েটাকে তো বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে। বন্যাকে বেশ কয়েকবার ওর নাম ঠিকানা জিজ্ঞাসা করেছে
সুমন, কিন্তু ও কোন কথা বলতে পারেনি। ব্যাগ ঘেঁটে ওর আধার কার্ডটা হাতে পেয়ে সুমন ঠিক করে মেয়েটাকে
বাড়ি পৌঁছে তবে ও নিজে বাড়িতে ফিরবে। কেলোদাকে বন্যার পাহারায় রেখে সুমন স্টেশনের পাশের ওষুধের দোকানে
গিয়ে আগে দুটো ট্যাবলেট কিনে আনে। বন্যার আলুথালু ভাব দেখে আর পালস চেক করেই ও বুঝে গিয়েছে যে ওর
উপর শারীরিক নির্যাতন হয়েছে।
কেলোদা লোকটা সুমনকে খুব শ্রদ্ধা করে ওর মানুষের প্রতি এই নিঃস্বার্থ ভাবে এগিয়ে এসে তার পাশে দাঁড়ানোর
স্বভাবের জন্য। গিয়ে একটা রিক্সাওয়ালাকে ডেকে আনে। সুমন আর কেলোদা দুজনে ধরে ধরে বন্যাকে রিক্সায়
বসায়। নবপল্লি বারাসত স্টেশন থেকে বেশি দূর নয়। কিন্তু অতো রাতে একা একটা অচেতন মেয়েকে রিক্সায়
উঠিয়ে রিক্সাওয়ালার সাথে ছেড়ে দেওয়াটাও বুদ্ধিমানের কাজ হবেনা, তাই সুমন নিজে রিক্সায় উঠে সারা রাস্তা
বন্যাকে শক্ত করে ধরে বসে থাকে। ওষুধের গুনে ও তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
…… চলবে।
- ছয় -
সুমন বাড়ি ফিরে হাতপা ধুয়ে শুয়ে পরে আর ভাবতে থাকে বন্যার কথা। মেয়েটাকে কি কেউ জোর করে ধর্ষণ করেছে
না ও নিজে থেকেই মদ খেয়ে কোন পুরুষের সাথে মস্তি করে বাড়ি ফিরছিল। ওর সাথে কারো শারীরিক মিলন হয়েছে
সুমন বুঝে ফেলেছে, কিন্তু ইচ্ছায় না অনিচ্ছায় সেটাই বুঝতে পারছিল না। আচ্ছা ঐ দুটো ছেলে দমদমে নেমে গেল
কেন ? সুমন ওকে ট্রেন থেকে ধরে নামাবার সময় আর রিক্সায় পাশে বসিয়ে বাড়ি ফিরবার সময় ওর মুখে মদের
গন্ধ পেয়েছে। সুমন শুধু ভাবে মেয়েরা যে কেন এসব নেশার জিনিষ খেতে যায় ? আর ওদের বাড়ি দেখে মনে হল এরা
বেশ ভদ্র লোক। তাহলে এই মেয়েটা এরকম কেন করল ?
পরের দিন সন্ধ্যায় অনেক দিন বাদে লাইব্রেরী গিয়েছে সুমন আর দেখে এক কোনে একটা টেবিলে বসে কি একটা
বই পড়ছে আগের রাতে দেখা সেই মেয়েটা, মানে দূর্বা। সুমন ওর নিজের দরকারি একটা বই হাতে নিয়ে এগিয়ে গিয়ে
দূর্বার সামনে দাঁড়ায়। ভাবল একবার মেয়েটার খোঁজ নেওয়া যাক। দূর্বা ওকে দেখতে পায়নি। সুমন নিচু গলায়
দূর্বাকে জিজ্ঞাসা করে , ”কি, এখন কেমন আছে আপনার দিদি ?”
দূর্বা মুখ তুলে তাকিয়ে দেখে সুমন দাঁড়িয়ে। মনে মনে খুশি হয় , লোকটাকে অনেক দিন এখানে না দেখে ও বেশ
চিন্তায় পড়ে গেছিল। আবার কোনদিন দেখা হবে তো ? কাল রাতে কোন কথাই হয়নি লোকটার সাথে। দূর্বা হেসে
বলে,” আরে আপনি ? বসুন না। দিদি এখন একটু সুস্থ আছে।“ সুমন দূর্বার পাশের চেয়ারে বসে আবার জিজ্ঞাসা
করে,”ওনাকে ডাক্তার দেখিয়েছেন তো ? ডাক্তার কি বলল ?”
দূর্বা ওর প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার ইতিহাসের বইটা বন্ধ করে রেখে সুমনের দিকে তাকিয়ে বলে,” ডাক্তার
দেখিয়েছি। উনি আপনার দেওয়া ট্যাবলেটের কভার দেখে একটু অবাক হয়েছেন।“
সুমনের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়। অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে,” কেন, কি বলেছেন উনি ?”
দূর্বা বিস্ময়ের সুরে সুমনকে বলে,” আচ্ছা, আপনি কি করে জানলেন বলুন তো ঐ ওষুধের নামটা ? ডাক্তার দেখে
অবাক হয়ে বলেছে যে এই ওষুধ একদম নতুন বেড়িয়েছে মার্কেটে। আর কোন ডাক্তার ছাড়া অন্য কেউ এই ওষুধ
প্রেসক্রাইব করবে সেটা অসম্ভব। তবে উনি বলেছেন যে ঠিক সময়ে একদম ঠিক ওষুধই দেওয়া হয়েছে দিদিকে।
তাই আমি অবাক হয়েছি।“
সুমন হটাত দূর্বার এই প্রশ্নের কোন জবাব দেয়না। ভাবতে থাকে কি ভাবে ওকে ম্যানেজ করা যায়।

সুমন চুপ দেখে দূর্বা আবার বলে ওঠে,”যাই হোক আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ দিদিকে বাড়ি পৌঁছে দেবার জন্য। কাল
তো আপনি দাঁড়ালেন না, তাই ধন্যবাদ জানাতে পারিনি।“
সুমন দূর্বা কথা বলার সময় লক্ষ্য করল যে কথা বলতে গেলে দূর্বার গালে একটা সুন্দর টোল পরে। কাল রাতে
ভাল করে দেখা হয়নি কিন্তু আজ দেখল মেয়েটা দেখতে মন্দ নয়। ওর গায়ের রং একটু চাপা হলেও মেয়েটার
স্বাস্থ্য বেশ ভাল, চোখ দুটো খুব বড় বড় আর মায়াবী দৃষ্টি। মুখে একটা মিষ্টি সারল্যের ভাব আছে। হটাত দেখেই
ভীষণ সুন্দরী মনে হবার মত মেয়ে নয়, কিন্তু মুখ দেখেই বোঝা যায় যে ওর মনটা নিশ্চয়ই খুব সুন্দর। সুমনের ভাল
লাগে দূর্বাকে, বলে,” তাহলে ডাক্তার কি শুধু এটুকুই বলেছে না আর কিছু বলেছে আপনাদের ?”
এবার দূর্বা মাথা নিচু করে থাকে কিছুক্ষণ। কি বলবে ও এই লোকটাকে ? উনি কাল যেটা বলেছেন সেটা যে একেবারে
ঠিক ডাক্তার সেটা না বললেও দিদি নিজে আজ সকালে কাঁদতে কাঁদতে দূর্বাকে সব খুলে বলেছে, আজ থেকে ও ঐ
অফিসে আর যাবেনা সেটাও বলে দিয়েছে দিদি। দরকার নেই ওর ঐ চাকরির, ও অন্য চাকরি খুঁজলে পেয়ে যাবে। দূর্বা
মুখ নিচু করে ভাবতে থাকে দিদিকে নেশাগ্রস্ত করে ওকে ধর্ষণ করেছে ওরই অফিসের একজন, এই কথাটা কি
করে বলবে এই লোকটাকে, কথাটা বলতে ওর ভীষণ লজ্জা লাগছিল। হটাত একটা অচেনা পুরুষকে এ ভাবে ধর্ষণের
কথা বলে কি করে ?
সুমন বুঝতে পারে দূর্বার মনের দ্বিধা। স্বাভাবিক, অবিবাহিত দিদির এই অস্বভাবিক দৈহিক মিলনের কথা তার
বোন তো বলতে লজ্জা পাবেই। সুমন এবার নিজেই বলে,”আচ্ছা, আপনি আমাকে শুধু একটা কথা বলুন তো। আপনার
দিদিকে দেখে ডাক্তার কি ঐ ব্যাপারে কিছু বলেছে বা উনি আপনার দিদিকে প্রোটেকশন নেবার জন্য কোন ওষুধ
দিয়েছেন কি ? আশা করি আপনি বুঝতে পারছেন আমি কি বলতে চাইছি ?”
দূর্বা অবাক হয়ে মুখ তোলে আর বলে,” না তো, ডাক্তার কিছু বলেও নি আর এর জন্য কোন ওষুধও দেয়নি। উনি শুধু
বলেছেন দিদির উপরে হয়তো অফিসের কোন কারণে খুব স্ট্রেস পড়েছে আর সেইজন্যই অজ্ঞান হয়ে গেছে। উনি
দিদির প্রেশার চেক করেছেন আর ব্লাড টেস্ট করে তার রিপোর্ট নিয়ে কাল যেতে বলেছেন ওনার চেম্বারে। বলেছেন
দরকার হলে স্ক্যানিং করাতে হতে পারে। ওনার নার্সিং হোমেই সব ব্যবস্থা আছে।“
সুমন রাগে চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। বুঝতে পেড়ে যায় যে একজন বদমাশ মেডিক্যাল ব্যবসায়ীর হাতে পড়েছে ওরা,
যে ট্রিটমেন্টের নামে এখন ওদের কাছ থেকে সমানে টাকা খিচবে আর ক্লাইন্টকে হাতে ধরে রেখে এই টেস্ট ঐ
টেস্ট এই করেই একমাস কাটিয়ে দেবে। অথচ যেটা আগে করা দরকার সেটা করবেনা।
সুমন চুপ করে মাথা নিচু করে আছে দেখে দূর্বার সন্দেহ হয়। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করে,” আচ্ছা, আপনি কি করতে
বলেন এখন ? ডাক্তার কি ওষুধ দেননি যেটা আপনার মনে হচ্ছে ওনার দেওয়া উচিত ছিল ?”
সুমন একবার দূর্বার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে। ভাবে সত্যি মেয়েটা ভীষণ সরল সোজা প্রকৃতির মেয়ে। শান্ত গলায়
দূর্বাকে এবার সোজা সুজি বলে ফেলে,” আপনার দিদিকে তাড়াতাড়ি একটা ট্যাবলেট খাওয়ানো দরকার। আর যদি
সেটা না খাওয়ানো হয় তবে কিন্তু ওনার প্রেগন্যান্ট হবার একশো ভাগ চান্স থেকে যাবে। আপনি যদি আমার কথা
বিশ্বাস করেন তবে আমি আপনাকে এব্যাপারে হেল্প করতে পারি। আর নাহলে আপনারা যা ভাল বুঝবেন করতে
পারেন।“
দূর্বা ভিতরে ভিতরে চমকে ওঠে। কি বলছে লোকটা ? দিদির গর্ভ ধারন হয়ে গেলে তো একটা কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে
! ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে সন্ধ্যা সাতটা বেজে গেছে। মানুষটাকে দুদিন দেখে আর ওর ডাক্তারি জ্ঞান দেখে
দূর্বার ওকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হচ্ছে তখন। কিন্তু ঐ ওদের ডাক্তার এসব ওষুধের কথা শুনে যদি আবার রেগে
যান ? অসহায় ভাবে সুমনের দিকে তাকিয়ে বলে,” আপনি কি এডভাইস করছেন ? আমার তো কিছুই মাথায় ঢুকছে না।
কি যে করি এখন ?”

সুমন মেয়েটার এই বিচলিত ভাব দেখে ওর প্রতি নরম হয়ে দূর্বাকে আস্বস্থ করে ওকে বাড়ি চলে যেতে বলল আর
ছোট একটা কাগজে একটা ট্যাবলেটের নাম লিখে দিয়ে বলল,” এটা পারলে আজই খাইয়ে দিতে হবে দিদিকে আর
তাহলে ওর আর কোন ভয় থাকবেনা। কিন্তু একটা নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে গেলে আর কিছু করার থাকবে না। একটা
চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। আপনি এখুনি বাড়ি চলে যান।“
দূর্বা উঠে পড়ল। কাগজটা হাতে নিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে সুমনকে জিজ্ঞাসা করল,” কিছু মনে করবেন না, আপনার
নামটাও জানা হয়নি। আপনার নাম আর ফোন নম্বরটা যদি লিখে দেন তাহলে আপনাকে একটা ফিডব্যাক দিতে
পারব বা দরকারে ডেকে আনতে পারব।“ মনে মনে আর একবার ধন্যবাদ দিল সুমনকে।
সুমন হাসে আর কাগজটার পিছনে ওর নাম আর সেল নম্বর লিখে দিয়ে বলে,” আপনি আর দেরি করবেন না। এখুনি
ওষুধটা কিনে বাড়ি যান আর গিয়ে দিদিকে ওটা খাইয়ে দিন আগে। পরে ফোন করে জানাবেন। আমি আপনার ফোনের
অপেক্ষায় থাকব।“ দূর্বা আর দেরি করলনা, ওর হাতের বইটা জমা দিয়ে বেড়িয়ে যায় লাইব্রেরী থেকে। সুমন
একদৃষ্টে দূর্বার চলে যাওয়া দেখতে থাকে।
বন্যার যে সত্যিই এত বড় একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে সেটা দূর্বা ছাড়া বাড়ির কেউ জানতে পারেনি। ছোড়দার একটা
সন্দেহ হয়েছিল কিন্তু বোনের উপর বিশ্বাস আছে তাই কিছু জিজ্ঞাসা করেনি। অনীশ আর দূর্বার বাবা ডাক্তার যে
কথা বলে গেছে সেটা আর মেয়েকে বিশ্বাস করেই বসে আছে। শুধু বাবা বলেছেন যদি অফিসের কাজে এতই স্ট্রেস
থাকে তাহলে চাকরিটা ছেড়ে দিতে আর নতুন চাকরি খুঁজে নিতে।
নিজের ঘড়েই শুয়ে ছিল বন্যা আর ফ্ল্যাশ বাকে ভাবছিল অচিন্ত কীভাবে ওকে ডিনারের নাম করে নিয়ে গিয়ে ওর
সর্বনাশ করে ছাড়লো। অচিন্তকে ওর ভাল লাগত আর ওকে বিশ্বাস করত। কিন্তু ও যে শুধু ওর দেহটাকেই চায়
বুঝতে পারেনি। দূর্বা বাড়ি ফিরে দোকান থেকে কিনে আনা ট্যাবলেট খানা দিল বন্যাকে। কিন্তু বন্যার দূর্বার ঐ
হকার ছেলেটার দেওয়া ওষুধ মুখে তূলতেও কোন রুচি হয় না। কে না কে একটা হকার, যেহেতু ওর পেইন কিলার ওষুধে
একটু কাজ হয়েছে তাই বলে এই ওষুধ খেতে হবে তার কোন মানে নেই। ডাক্তারকে না বলে না জিজ্ঞাসা করে কিছু
করতে চায়না বন্যা। অথচ কাউকে বলতেও ভয় করছে এখন।
দূর্বা দিদিকে কিছুতেই বোঝাতে পারল না যে এখন হাতে বেশি সময় নেই। কিন্তু বন্যার সেই এক কথা, ও কিছুতেই
এসব ওষুধ টোষূধ খাবে না। দূর্বা অবশেষে মুখ গোম করে চলে গেল ওর নিজের ঘরে। রাতে সাড়ে দশটায় খাওয়া
দাওয়ার পরে দরজা আটকে ফোন লাগাল সুমনকে। সুমন দূর্বার ফোন না পেয়ে খুব চিন্তায় পরে গেছিল। মেয়েটা ওর
নাম আর ফোন নম্বর নিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো ফোন করছে না কেন ? সর্বনাশ, ও কি ডাক্তারের কাছে ওর দেওয়া
ট্যাবলেটের নাম লেখা কাগজটা দেখাবে না কি ?
দূর্বা ফোন করল যখন তখন সুমনের রাতের খাওয়া হয়ে গেছে। দূর্বা ফোনে প্রথমেই বলে,” আই এম ভেরি সরি,
আপনাকে ফোন করতে অনেক দেরি হয়ে গেল। আসলে দিদিকে কিছুতেই ওষুধটা খাওয়াতে পাড়লাম না জানেন ?
বিশ্বাসই করল না। আমার যে কি খারাপ লাগছে না , কি বলব আপনাকে।“
দূর্বার কথায় সুমন একটু শান্তি পেল যে ও অন্য ডাক্তারটার কাছে আর যায়নি। আবার সাথে সাথে ওর মন বলল যে
মেয়েটার কন্সিভ করবার যথেষ্ট চান্স থেকে গেল। বন্যার জন্য খারাপ লাগোল সুমনের। মেয়েটা ওকে বিশ্বাস করে
ওষুধটা খেলেই হয়ত ভালো করত। দূর্বাকে সুমন আর কি বলবে। শুধু শান্ত ভাবে বলল, ”আপনি যথেষ্ট চেষ্টা
করেছেন। এরপর আমি বা আপনি কি করতে পারি বলুন। সবই নির্ভর করছে আপনার দিদির উপর। দেখুন গিয়ে হয়ত
নিজেই নিশ্চিত যে ওর কোন বিপদ হবেনা।“
দূর্বা বিছানায় পাশ ফিরে শুয়ে শুয়েই সুমনের সাথে ফোনে কথা বলছিল। এবার সোজা হয়ে শুয়ে একটু অবাক হয়ে
বলল,” আমি ঠিক বুঝলাম না। আপনি যে আমাকে বললেন কন্সিভ করার চান্স আছে সেটা তাহলে কি অনুমান থেকে

বলেছিলেন। আপনি এতো সব জানলেন কি ভাবে বলুন তো ?” দূর্বা ভাবতে থাকে লোকটা এতো সব জানে অথচ ট্রেনে
হকারি করে, বিশ্বাস হয়না। মানুষটা নিশ্চয়ই কিছু লুকচ্ছে।
সুমন একটু হেসে বলে,” দেখুন মিস, আপনার নামটা জানিনা, তবে সেটা যাই হোক না কেন, আপনাকে বলি কি অনেক
রাত হয়েছে । এসব মেয়েদের শারীরিক ব্যাপার সেপার নিয়ে আলোচনা করা বা এতো সব প্রশ্নের জবাব এখন
আপনাকে ফোনে ব্যাখ্যা করা সম্ভব না। যান, শুয়ে পড়ুন গিয়ে। পরে একদিন কথা বলা যাবে খন, তখন বোঝাবো
আপনাকে, ও কে ?”
দূর্বা সুমনের এই উত্তরে একটু ক্ষুণ্ণ হয় কিন্তু তবু সুমনের সাথে কথা বলতে ওর খুব ভাল লাগছিল তখন। একটু
রাগত স্বরে বলে,” ঠিক আছে ঠিক আছে। আপনাকে আর বোঝাতে হবেনা। বাই দ্য বাই, আমার নাম দূর্বা, দূর্বা
চৌধুরী। আমি ইতিহাসে এম এ করছি আর তাই ঐ লাইব্রেরীতে যাই। আচ্ছা আপনি ওখানে কি বই পড়তে যান বলুন
তো ? আমি আপনাকে অনেক দিন দেখেছি ওখানে, কি এতো বই পড়েন আপনি ?” আসলে সুমনের সাথে আরও
অনেকক্ষণ কথা বলার ইচ্ছা হচ্ছিল দূর্বার, কিন্তু লোকটা কেমন যেন বেরসিক টাইপের, মেয়েদের ব্যপারে কোন
আগ্রহ নেই নাকি ?
সুমন এবার একটু গম্ভীর হয়। শান্ত গলায় বলে,” আমার ব্যাপারে আপনার এতো ইন্টারেস্ট কেন বলুন তো ? আমি
যেই বইই পড়ি না কেন একজন হকারের বই পড়ার কোন অধিকার নেই, আপনি কি সেরকমই ভাবেন নাকি ? তাহলে
তো এখন থেকে আপনার অনুমতি নিয়েই লাইব্রেরীতে যেতে হবে দেখছি।”
দূর্বা এই কথায় লজ্জা পেয়ে যায় আর বলে,” আপনি কিছু মনে করবেন না। আমি কিন্তু এমনি জিজ্ঞাসা করছিলাম।
ঠিক আছে। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। গুড নাইট মিস্টার সুমন।“
সুমন বুঝতে পারল যে মেয়েটা ওর কথায় আহত হয়েছে, কিন্তু সেটা তো আসলে ও চায়নি। ফোন ছাড়ে না, শান্ত
গলায় বলে,” শুনুন দূর্বা, আমি একটু ডাক্তারি বই টই পড়ি। তবে কেন পড়ি সেটা জিজ্ঞাসা করবেন না। সেটা বলতে
পারব না। এখন শুয়ে পড়ুন, আপনার এই নম্বরটা আমি সেভ করে রাখছি দূর্বা , গুড নাইট।“
সুমন জানে যে এরপর কথা বাড়ালেই কথা বাড়বে আর ওর আসল পরিচয়টা বেড়িয়ে যাবে। ফোনটা কেটে দিলো। আর
ওদিকে দূর্বা শুয়ে শুয়ে শুধু ভাবতে থাকে আর যাই হোক লোকটা সৎ, মিথ্যুক না। ও দূর্বাকে ও যে মেডিক্যালের
বই পড়ে সেটা সত্যি সত্যি বলে দিলো। ও তো মিথ্যা কথাও বলতে পারতো। দূর্বার সুমনের এই সহযোগিতার
মনোভাব আর সততা খুব ভাল লাগে। মনে মনে ভাবতে থাকে সুমনের ব্যাপারে আরও খোঁজ খবর নিতে হবে আর সেটা
করতে হবে গোপনে। লোকটা খুব রহস্য জনক মানুষ। ও কিছুতেই একজন সাধারণ হকার হতেই পারে না , নিশ্চয়ই ও
কিছু গোপন করছে।
……… চলবে।
- সাত - l
দূর্বাদের গোলাবাড়ি বৃদ্ধাশ্রমে প্রতি সপ্তাহে তিন দিন যায় দূর্বা। চারিদিকে সবুজে ঘেরা গ্রামে এই দশ কাঠা
জমির উপর একটা একচালা টিনের ছাত দেওয়া পাকা বাড়ি। দেখতে অনেকটা স্কুল বাড়ির মত। মোট পাঁচ খানা বেশ
বড় বড় ঘর, আর একটা অফিস ঘর, একটা বড় বসবার ঘর, রান্নাঘর আর তিন খানা টয়লেট। বাড়িটার চারিদিকে
রয়েছে ফল ও ফুলের বাগান। মোট পনের জন বৃদ্ধ লোক থাকেন এখানে, যদিও মোট কুড়ি জন থাকার ব্যাবস্থা
আছে ঐ পাঁচখানা ঘরে। বড় বসবার ঘরে একটা কালার টি ভি লাগানো আছে আর রোজ দু খানা বাংলা খবরের কাগজ
রাখা হয়।

দূর্বাদের এন জি ও এখানে থাকবার জন্য থাকা খাওয়া এসবের জন্য কোন চার্জ করেনা। কিন্তু যারা তাদের মানে
এই বৃদ্ধ বা পঙ্গু দাদু, বাবা বা কাকা মামা জ্যাঠাদের এখানে রেখে যেতে চায়, তাদের কাছ থেকে মাথা প্রতি মাসে
চার হাজার টাকা করে ডোনেশন নেয় । এন জি ও দেশী বিদেশী বিভিন্ন সংস্থা আর সরকার থেকে ভরতুকি বাবদ যে
টাকা পায় তাতে ওদের মায়না পত্র ইত্যাদি অন্যন্য জরুরী খরচই শুধু ওঠে।
মাসখানেক বাদের ঘটনা। একদিন বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে দূর্বা দেখে সিজন চেঞ্জের দরুন এখানে থাকা দুজন বৃদ্ধ
লোকের একজনের হাপানির কষ্ট আরেক জনের পেটে গ্যাসের যন্ত্রণা খুব বেড়ে গেছে। এই সময়ে সাধারনত ওরা
বড় রাস্তার চেম্বারে বসেন ডক্টর হাজরা নামের এক ডাক্তারকে ডেকে আনে। লোকটা কাছেই থাকেন, মাসে
একবার করে এসে সবাইকে চেক করে যান। মাস গেলে এন জি ও ওনাকে বারো হাজার টাকা মায়না দেয়। কিন্তু সেদিন
সারা বাংলা ডাক্তারদের ধর্মঘট চলছে। ডক্টর হাজরার ডাক্তারখানা আজ বন্ধ আর বাড়িতে লোক পাঠানো হলে
পর উনি মুখের উপর আসতে পারবেন না বলে দিয়েছেন।
বৃদ্ধাশ্রমের ম্যানেজার মনোজ ঘোষ খুব টেনশনে পরে গেছিল। দূর্বা আসতেই ওকে জানালো সব। তখন বেলা দশটা
বাজে। যেহেতু ডাক্তারদের ধর্মঘট তাই বারাসত হাসপাতালে নিয়ে গিয়েও লাভ হবে না। দূর্বা চিন্তায় পরে যায় আর
ভাবতে থাকে কি ভাবে সামলাবে ব্যাপারটা। দুইজন বৃদ্ধই দূর্বার মুখের দিকে তাকিয়ে বসে আছে বসবার ঘরে। ওরা
জানে ওদের দূর্বা মা এসে গেছে মানে কিছু একটা ব্যাবস্থা হবে। এই মিষ্টি মেয়েটার উপর বৃদ্ধ মানুষগুলির অগাধ
বিশ্বাস আছে।
শেষে দূর্বা একটা রিস্ক নেবে ঠিক করল আর ফোন লাগাল সুমন কে। সুমন তখন বাড়ি থেকে সবে বেড় হয়েছে,
স্টেশনের দিকেই যাচ্ছে। আজ ওর বাগড়ি মার্কেট যাবার কথা। একটু দেরি করেই খালি ব্যাগ হাতে যাচ্ছে ট্রেন
ধরতে। দূর্বার হটাত এখন ফোন করা দেখে সুমনের মনে একটা সেতারের তান বেজে উঠল যেন। কতদিন দূর্বার সাথে
কোন কথা বার্তা হয়নি। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ফোন ধরে বলল,”হ্যালো, কি খবর। কেমন আছেন আপনি ? অনেক
দিন বাদে হটাত, কি দিদির আবার কিছু হল নাকি ?”
দূর্বা ব্যস্ত ভাবে বলে,” না না দিদির ব্যাপারে ফোন করিনি। অন্য একটা ব্যাপারে আপনার সাহায্য চাই , তাই
ফোন করলাম। আপনি এখন ঠিক কোথায় আছেন, বারাসতেই আছেন না লাইনে আছেন ?” দূর্বার গলায় উত্তেজনার
আভাস ফুটে ওঠে। যেন বিরাট একটা বিপদে পড়েছে মেয়েটা।
সুমন একটু অবাক হয়ে যায়। এই সময় দূর্বার ওর কাছে আবার কি সাহায্য দরকার ? হেসে বলে,” কি ব্যাপার বলুন
তো ? আমি এখনো বারাসতেই আছি। বেড়িয়েছি , কলকাতা যাব, মাল আনতে। আপনি কোথায় ?”
দূর্বা এবার একটু দম নিয়ে শান্ত ভাবে বলে,”সুমন বাবু, আপনি বোধ হয় জানেন না যে আমি একটা এন জি ওর সাথে
যুক্ত। আমরা গোলাবাড়িতে একটা বৃদ্ধাশ্রম চালাই। তা এখানে দুজন বৃদ্ধ মানুষ আজ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তাই
আপনাকে ফোন করলাম।“
সুমন মনে মনে একটু চমকে যায়। দূর্বা কি বুঝে ফেলেছে যে ও সত্যিই একজন ডাক্তার ? কিছুটা বিরক্তি আর
কিছুটা অধৈর্য হয়ে সুমন নিরুত্তাপ গলায় বলে ওঠে,” তা আমি কিভাবে সাহায্য করবো মিস দূর্বা ? ডাক্তার দেখান
ওনাদের। আমি তো আর ডাক্তার নই !“
দূর্বা এবার সুমনকে খুলে বলল ,”আরে বাবা, আজ ডাক্তারদের স্ট্রাইক চলছে, কোন ডাক্তার পাওয়া যাচ্ছে না।
তাই তো আপনাকে জানালাম। আপনি ডাক্তার নন জানি, কিন্তু আমাকে একটু সাহায্য তো করতে পারেন নাকি ?
এখন একা আমি কি করি বলুন তো ? এই দুটো অসুস্থ মানুষকে ফেলে বাড়ি যেতেও তো পারব না। মানবিকতায় বাধে।
জানেন আমি এদের শুকনো মুখগুলির দিকে তাকাতে পারছিনা। ”

সুমন এক মুহূর্ত ভাবে। এই পরিস্থিতিতে একবার ওর মনে হয় ওর দূর্বার পাশে দাঁড়ানো উচিত। সত্যিই তো, এই
ডাক্তারদের ধর্মঘটের দিন ও কি করবে বেচারি। দূর্বা হয়ত সুমন একজন ডাক্তার ভেবেই আজ ওর শরণাপন্ন
হয়েছে। সুমন মন ঠিক করে নিয়ে আশ্বাস দেবার সুরে বলে,”আপনি আমাকে আপনার এড্রেসটা এস এম এস করে
দিন।ঘাবড়াবেন না, আমি এক ঘণ্টার মধ্যেই আসছি। শুধু ওদের সমস্যা গুলি বলুন যাতে সঙ্গে কিছু ওষুধ পত্র নিয়ে
যেতে পারি। তাহলে অনেকটা সময় বাঁচবে।“
দূর্বার প্রানে জল এলো যেন। সঙ্গে সঙ্গে ফোনে ঐ দুই অসুস্থ বৃদ্ধের সমস্যাগুলি জানাল সুমনকে আর
ঠিকানাটাও মুখে বলে দিয়ে এস এম এস ও করে দেয়। ঠিক ঘণ্টা দেড়েক বাদেই ওষুধ হাতে নিয়ে সুমন বাস স্ট্যান্ড
থেকে ভ্যান রিক্সায় চেপে চলে আসে দূর্বাদের বৃদ্ধাশ্রমে। আসবার সময় সুমন ওষুধ পত্র দুটো ইনজেকশন
ছাড়াও ডিসপোসেবেল সিরঞ্জ আর কিছু ফল সাথে করে নিয়ে আসে।
বসবার ঘরেই বসেছিল ঐ অসুস্থ মানুষ দুজন। আরও চার পাঁচজন ওদের ঘিরে বসে নিজেরা কথা বার্তা বলছে। দূর্বা
গেটেই অপেক্ষা করছিল।সুমনকে দেখে হাফ ছেড়ে বাঁচল যেন দূর্বা। আজ এই পরিস্থিতিতে একমাত্র সুমনই ওদের
বাঁচাতে পারে। সুমনকে বসবার ঘরে নিয়ে আসে দূর্বা।ওর পড়নে একটা ডিপ নীল রঙের জিন্সের প্যান্ট আর হাল্কা
সবুজ রঙের টি সার্ট, চোখে কালো চশমা। সুমনকে এই ড্রেসে দেখে বারবার ঘুরে দেখতে থাকে দূর্বা। দারুণ হ্যান্ড
সাম লাগছে সুমনকে আজ, মনেই হয়না ও একজন হকার।
হলে ঢুকে প্রথমেই সুমন দূর্বার দেখিয়ে দেওয়া অসুস্থ দুজনকে ভাল করে চেক করে। পালস দেখে, চোখের নিচটা
দেখে, গলা দেখে, পেটে হাত দিয়ে চেপে দেখে। একজন প্রফেসনাল ডাক্তার রুগীর সাথে যা যা করে সুমন সবই করল
আর দুজনের হাতেই নিপুন ভাবে ইনজেকশন দিয়ে দিল। এরপর সুমন ওদের কিছু ট্যাবলেট দিয়ে কখন খেতে হবে
সেটাও বলে দেয়।
মানোজ ঘোষ আর দূর্বা দুজনেই অবাক হয়ে দেখছে সব। মনোজকে দূর্বা বলে রেখেছিল যে ও যেন সুমনকে কিছু
জিজ্ঞাসা না করে। তবে যেহেতু লোকটা আজ শুধু ওর ডাকে এখানে আসছে রুগী দেখতে তাই মিথ্যা কথা বলেছে যে
উনি একজন ভাল ডাক্তার, তবে আজ ধর্মঘটের দিন তাই উনি ওনার নাম টাম কিছু বলবেন না সেই চুক্তিতেই
এসেছেন আর সাথে ব্যাগও আনেন নি। আমাদের ওকে কিছু জিজ্ঞাসা করা ঠিক হবে না।
মনোজ কিছুই জিজ্ঞাসা করেনি আর, কিন্তু সব শেষে সুমনের হাতে হাত মিলিয়ে বলে,” আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ
স্যার। আপনি না এলে আমরা যে কি করতাম আজ তা জানিনা।“
সুমনের চোখে খুশির ঝিলিক। আড় চোখে একবার দূর্বাকে দেখে মুচকি হেসে বলে,” আচ্ছা, আপনারা এদের রেগুলার
চেক আপ করান না ? ওনাদের সবারই বয়স হয়েছে, এখন প্রতি সপ্তাহে অন্তত এক দিন এদের চেক আপ করানো
উচিত।“ আসলে সুমনের এক নজরে লোকগুলির স্বাস্থ্য বা এদের ব্যাবস্থা দেখে খুব একটা ভাল মনে হয়নি।
বোঝাই যাচ্ছে যে ওদের ঠিক মত কেউই দেখছে না।
ম্যানেজারের মুখ কালো হয়ে যায়। একটু চুপ করে থেকে বলে,” হ্যাঁ, মানে আমরা প্রতি মাসে সবাইকে একবার করে
চেক আপ করাই। আসলে কি জানেন ঐ ডাক্তার হাজরা সপ্তাহে একদিন আসতে বললে দুই থেকে তিন গুণ বেশি টাকা
চার্জ করবে। অতো টাকা তো আমদের পক্ষে দেওয়া সম্ভব না তাই আর কি......।“ কথাটা বলে লোকটা অসহায়
ভাবে দূর্বার দিকে তাকায়।
সুমন চুপ করে যায়। একটু পরে আবার বলে,” আজ যখন আমি এসে পড়েছি আমি তাহলে একবার সবাইকে চেক করতে
পারি কি মিস দূর্বা ? আপনার কোন আপত্তি নেই তো ?”

দূর্বা এতটা আশা করেনি। সুমন ওর ডাকে এতদুর এসেছে তাতেই ও নিজেকে ধন্য মনে করছিল। এই ডাক্তার
ধর্মঘটের দিন নাহলে অজ যে ও কি করত কে জানে। সুমনের এই প্রস্তাবে দূর্বা অবাক হয়ে যায় আর সঙ্গে
সঙ্গে মনোজ ঘোষকে বলে,” সে তো খুব ভালো কথা। ঘোষ বাবু আপনি এখুনি সবাইকে এই ঘরে আসতে বলে দিন।
আর যারা এখন আছে তাদের উনি এখনই দেখতে শুরু করে দেবেন।“
একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের মতই স্টেথস্কপ ছাড়াই এক এক করে পনের জনের সবাইকে চেক করে সুমন। মোটামুটি
সবার স্বাস্থ্যই ঠিক আছে কিন্তু দুজনের অবস্থা খুব একটা ভাল না। একজন গ্যাসের রুগী, যাকে ও ইনজেকশন
দিয়েছে, আরেকজন দেখা গেল যার হাই সুগার আর পেচ্ছাপের কষ্ট আছে, সুমনের মনে হল ওনার কিডনি ড্যামেজ
হয়েছে। দূর্বাকে বলল কথাটা।
এরপর ম্যানেজার ঘোষ ঘুরে ঘুরে বৃদ্ধাশ্রমটা দেখাল সুমনকে। সবুজে ঘেরা পরিবেশে এটা বেশ বড় আর খুব ভাল
আশ্রমটা। সুমনের খুব ভাল লাগে এদের এই প্রচেষ্টা। মনোজ ঘোষের ইশারায় একজন মহিলা খাবার ঘরে দুই প্লেট
খাবার নিয়ে এলো ওদের জন্য। ম্যানেজার ও দূর্বার সাথে একসাথে বসে সুমন গরম ভাত, মুগ ডাল, পাপর ভাঁজা,
ফুল কফির ডালনা আর রুই মাছের ঝোল দিয়ে লাঞ্চ সারল।সুমনের বেশ খিদে পেয়েছিল তখন। খেতে খেতে লক্ষ
করল দূর্বা ওক ঘুরে ঘুরে দেখছে বারবার। সুমনের হাসি পায়।
খাওয়া শেষ করে সুমন বেলা তিনাটা নাগাদ দূর্বাকে বলে,” এবার আমি যাই তাহলে ?” দূর্বার তখন অফিসের কিছু
কাজ বাকি ছিল। কিন্তু এতদিনে এই প্রথম সুমনকে এত কাছে পেয়ে দূর্বা ওকে একা ছড়লো না। হেসে বলল,”এক
মিনিট দাঁড়ান, আমিও যাব আপনার সাথে। “মনোজ ঘোষ ওকে অনেক বার ধন্যবাদ দিয়ে বলে যাতে পরে আবার
এরকম দরকারে সুমনকে ডাকলে পর পাওয়া যায়। সুমন একটু হেসে শুধু বলে,” মিস দূর্বা ডাকলে নিশ্চয়ই আসব,
কথা দিলাম।“
বৃদ্ধাশ্রমের একটা স্টাফ গিয়ে একটা ভ্যান রিক্সা ডেকে আনে আর সুমন আর দূর্বা পিছনে দুই পা ঝুলিয়ে উঠে
বসে রওনা দেয় বড় রাস্তার দিকে। দুপুর বেলা, রাস্তা ফাঁকা। ওখান থেকে প্রায় দু কিলোমিটার দুরে বড় রাস্তা মানে
টাকি রোড। ওখান থেকেই ওরা বাসে বা ভাড়ার জিপ গাড়িতে বারাসতে ফিরবে। দূর্বারা যখন রওনা দিয়েছে তখন
দুপুর তিনটা হবে, আর সুমনের হিসাবে বারাসত পৌছবে আরও প্রায় একঘণ্টা পর। ওর আজ আর মার্কেট যাওয়া
হবেনা। দূর্বাকে বলল,” আমি এখান থেকে লাইব্রেরী যাব, আর আপনি ?”
সুমন ঐ বৃদ্ধ লোকগুলিকে কি ভাবে একজন শিক্ষিত ডাক্তারের মত চেক করছিল দূর্বা তাই ভাবছিল তখন। আজ
দূর্বা নিশ্চিত যে সুমন ডাক্তার না হয়ে যায় না। ও ডাক্তারই, কিন্তু কেন তাহলে সুমন একজন হকার সেজে ট্রেনে
ফেরি করে সেটাই ওর মাথায় আসছিল না। সুমনের এই অংকটা ঠিক মিলছিল না যেন। আর ডাক্তার হলে ও
প্র্যাকটিস করছে না কেন ? আজ সুমন ওদের বৃদ্ধাশ্রমকে একটা বড় বিপদ থেকে বাঁচাল। সুমনের প্রতি দূর্বা
কৃতজ্ঞতা বোধ করছিল।
সুমনের কথায় সন্বিত ফিরে আসে দূর্বার আর মুখ ঘুড়িয়ে বলে,” আমিও তাহলে লাইব্রেরীতে যাব, চলুন। আজ আর
এন জি ও অফিসে যাব না। ওখান থেকেই বাড়ি চলে যাব।“ আসলে ওর তখন সুমনের সান্নিধ্য খুব ভাল লাগছে। মনে
মনে চাইছিল যে এই বিকেলটা যেন তাড়াতাড়ি শেষ না হয়ে আরও অনেকক্ষণ থেকে যায়।
দুপুর বেলা, ভ্যান রিক্সাটায় তখন শুধু ওরা দুজনই যাত্রী। রাস্তার দুই ধারে বড়বড় গাছের সাড়ি। ছায়া ঘেরা নির্জন
রাস্তায় বেশি লোকজন দেখা যাচ্ছে না। শুধু মাঝে মাঝে দু একটা সাইকেল বা ভ্যান যাচ্ছে দুই দিকে। দূর্বার পড়নে
আজ ডিপ হলুদ আর কালো রঙের সালোয়ার কামিজ আর হাল্কা হলুদ রঙের ওড়না। হাওয়ায় ওর ওড়না বার বার
সুমনের মুখের উপর উড়ে এসে পড়ছে আর সুমন সরিয়ে দিয়ে শুধু হাসছে।

দূর্বার চোখে মুখে হটাত একটা রোদের সোনালী ঝিলিক দেখা গেল। গায়ের ওড়না ঠিক করে সুমন কে সোজা সুজি
জিজ্ঞাসা করে বসলো, ”আচ্ছা, আপনি তো একজন খুব ভাল ডাক্তার,তাই না ? আজ যেভাবে ঐ বুড়ো মানুষ গুলিকে
দেখছিলেন তাতে এখন আমি নিশ্চিত আপনি একজন ডাক্তার। তা আপনি এইভাবে ট্রেনে ট্রেনে হকারি করছেন
কেন বলুন তো ?”
সুমন বুঝতে পারে যে দূর্বা আজকের ঘটনায় আরও বেশি ওকে চিনতে পেরে গেল, কিন্তু ও সেটা স্বীকার করতে
রাজি নয়। একটু চুপ করে বলে,”ভুলে যাবেন না অনেক কম্পাউণ্ডারও কিন্তু রোগিকে ধরেই বুঝতে পারে কি রোগ
আর সে ইনজেকশনও দিতে জানে। আপনি আমাকে ডাক্তার ভাবলে আমার আনন্দ হবে ঠিকই, কিন্তু আসলে তো তা
না, সুতরাং শুধু শুধু কেন এসব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন বলুন তো ?”
দূর্বা বুঝল যে লোকটা মচকাবে তবু ভাঙবে না। চুপ করে যায়, এই ব্যাপারে আর কোন কথা বাড়ায় না। শুধু মনে মনে
ভাবে আমি ঠিক একদিন আপনার পরিচয় খুঁজে বেড় করবো সুমন বাবু। আপনাকে যেমন দেখায় আসলে আপনি তা নন
আমি জানি। আপনি লোকটা ডাবের মত বাইরে একরকম আর ভিতরে আরেক রকম। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আপনি
কিছুতেই একজন হকার হতে পারেন না। আপনি খুব ইন্টারেস্টিং লোক, আসলে সত্যিই একজন অন্য মানুষ, কোন
কারনে হয়তো পরিচয় লুকচ্ছেন।
লাইব্রেরীতে ঘণ্টা খানেক বসে বই ঘেঁটে দূর্বাকে বিদায় জানিয়ে সুমন বাড়ি চলে যায়। ওর একটাই ভয় হচ্ছে তখন
দূর্বা কেন এতো প্রশ্ন করছে ? ও কি তাহলে বুঝে গেছে সব ? সুমনের কি ঐ বৃদ্ধাশ্রমে যাওয়াটা ঠিক হয়নি ?
কিন্তু দূর্বা ডাকলে কেন ওকে দেখবার জন্য বা ওকে সাহায্য করবার ইচ্ছা হয় ওর মনে ?
আজ ভ্যান রিক্সায় দূর্বার পাশে এতো ঘনিষ্ঠ ভাবে বসে আসবার সময় ওর শরীরের মিষ্টি গন্ধ নাকে আসছিল
আর ভীষণ ভাল লাগছিল তখন। ওর দূর্বাকে কেন এতো ভাল লাগছিল আজ ? ওর মেডিক্যাল কলেজের বন্ধুদের
সাথে কথা বলার সময় সুমনের তো কখনো এরকম মনে হয়নি। তাহলে ও কি দূর্বার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে ? আর আজ
তখন ঐ ম্যানেজারকে সুমন হটাত বললই বা কেন ‘মিস দূর্বা ডাকলে নিশ্চয়ই আসব’?’ ছিঃ, দূর্বা কিছু ভাবেনি তো
? সুমনকে একটা হ্যাংলা লোক ভাবল নাতো মেয়েটা ?
…… চলবে।
- আট -
আজ রাতে বোধ হয় বৃষ্টি আসবে, আকাশে মেঘ জমে আছে। সুমনের মনেও তখন হাজার হাজার মেঘের টুকরা জমতে
শুরু করে দিয়েছে। লালি সিনেমার পাশে রাস্তার মোড়ের দোকান থেকে সিঙ্গারা কিনে বাড়ি ফিরল সুমন , চা দিয়ে
খাবে। বাড়িতে ফিরে হাত পা ধুয়ে সিঙ্গারা নিয়ে বসতেই দূর্বার ফোন এলো। হটাত দূর্বার ফোন দেখে আবার সুমনের
মনের জানালা দিয়ে একটা দমকা বাতাস এসে ওর শরীরটা জুড়িয়ে দিয়ে গেল যেন। একটু অবাক হয়ে যায় সুমন। এই
তো মাত্র লাইব্রেরীতে একসাথে বসে কথা বার্তা হয়েছে। আবার ফোন করছে কেন দূর্বা ? তহলে কি কোন জরুরী
কথা বলতে ভুলে গেছে ?
সুমন সিঙ্গারা প্লেটে নামিয়ে রেখে ফোন তুলতেই দিদিমণিদের মত বকা দেওয়ার সুরে ওপার থেকে দূর্বার গম্ভীর
গলা ভেসে এলো। দিদিমনি দূর্বা এমন ভাবে কথাটা বলে উঠল যেন সুমন ওর ক্লাসে যেন আজ হোম টাস্কের খাতা
না নিয়েই চলে এসেছে। ”আপনি একটা আচ্ছা ভুলো মানুষ তো ?”
সুমন ওর কথা বলার ধরন শুনে হেসে ফেলে। এই কয়দিনেই যেন ওর সুমনের উপর খবরদারি করবার একটা অধিকার
জন্মে গেছে। সুমন হাসে আর জিজ্ঞাসা করে,”আরে, আমি আবার কি ভুল করলাম ? শুধু শুধু আমাকে বকছেন কেন ?
কি করেছি আমি ?” দূর্বার এই বকা খেতেও যেন ওর ভাল লাগছে আজ।

দূর্বা একই সুরে বলে ওঠে,” বা বা, কি সুন্দর। এখনো মনে পরেনি বাবুর । কি করে আপনি ব্যাবসা করেন শুনি।
এরকম ভুলো মন নিয়ে কি আপনার দ্বারা ব্যাবসা হবে কোনদিন ? কথাটা ভেবে দেখবেন মশাই। “
সুমন বুঝতে পাড়ছে না যে ও কি এমন ভুল করে বসেছে যে দূর্বা ওকে এসব কথা বলছে। হেসে বলে,” আচ্ছা দিদিমণি,
এই কান ধরছি। এবার তো বলুন কি ভুলে গেছি আমি ?“
ফোনের ওপারে দূর্বা এবার হেসে ফেলল। একটু চুপ করে থেকে বলে,”সুমন বাবু, আপনি সত্যিই একজন খুব ভাল
মানুষ। আপনার মনটা যে কত সাদা সিধা আমি আপনার সাথে এই কয়েকদিন কথা বলেই বুঝতে পেড়ে গেছি। সত্যি
কথা বলতে কি আমি নিজেও সৎ আর মহান চিন্তা ধারার মানুষকে পছন্দ করি। আজ আপনি আমাদের বৃদ্ধাশ্রমে
এসে নিঃস্বার্থ ভাবে আমাদের যে উপকার করেছেন তা সত্যি অন্য কেউ হলে করত না। আপনার কাছে আমরা
চিরকাল ঋণী হয়ে থাকব।“
সুমনের দূর্বার কথাগুলি শুনতে খুব ভাল লাগছিল। ইচ্ছা করেই জিজ্ঞাসা করে,” আমরা না আমি ?”
দূর্বা সুমনের ইঙ্গিত বুঝতে পারে আর একটু থেমে বলে,” আমিও আর আমরাও। কি , হল এবার ?”
সুমন হেসে দেয় আর বলে,“ হু বুঝলাম , সে তো ঠিক আছে। কিন্তু একটা কথা বলুন তো , আপনার হটাত আজ আমার
কথাই মনে পড়ল কেন মিস দূর্বা ? আর কোন ডাক্তার কি মনে আসেনি না কি আমাকে পরীক্ষা করে দেখতে
চাইছিলেন যে আমি সত্যি ডাক্তারি জানি কিনা ?“
দূর্বা এরকম প্রশ্ন আশা করেনি। একটু চুপ থেকে বলে,” জানি, আপনি নিশ্চয়ই তখন আমার কথায় খুব রাগ
করেছেন। আসলে আমি আপনার উপর খুব ভরসা করি সুমন বাবু। দেখুন সবাইকে তো আর ততটা বিশ্বাস করা
যায়না। মানুষের মনে কার কি আছে বাইরেটা দেখে সেটা বোঝা যায়না। আজ আপনি আবারও আমাকে অবাক করে
দিয়েছেন, আর তাই আসবার সময় ওই কথা বলেছিলাম। আপনি কিছু ভাববেন না। আমি আপনাকে কোন পরীক্ষা
টরিক্ষা করতে চাইনি, ছিঃ।“
সুমন বুঝতে পারে দূর্বা মিথ্যা কথা বলছে না। আজ অন্য কোন ডাক্তার যেত না তাই বাধ্য হয়েই ওকে ফোন
করেছে। শান্ত গলায় বলে,” না না আমি কিছু ভাবিনি। আচ্ছা এবার বলুন কি হয়েছে, কি ভুলে গেছি আমি ?”
দূর্বা জানালো যে সুমন লাইব্রেরীতে ওর গগলস ফেলে চলে এসেছে। ও সঙ্গে নিয়ে বাড়ি চলে এসেছে আর এখন বাড়ি
থেকেই ফোন করছে। জিজ্ঞাসা করল ওর বাড়িতে এসে দিয়ে যাবে কিনা ? সুমন এই বাড়িতে দূর্বা এলে কোথায়
বসতে দেবে কি ভাবে ওকে যত্ন আত্তি করবে ভেবে সঙ্গে সঙ্গে বলে দিলো ও পরে একদিন লাইব্রেরীতে গিয়ে
ওটা নিয়ে নেবে ওর কাছ থেকে। এখন দূর্বার কাছেই থাক ওটা।
দেখতে দেখতে আরও একমাস চলে যায়। দুজনেই নিজের নিজের কাজে ব্যাস্ত হয়ে পড়ে। একদিকে দূর্বা এম এ
কোর্সের পরিক্ষায় ব্যস্ত থাকে আর ওদিকে সুমন ওর হকারির কাজে। ইতিমধ্যে সুমন ওর ব্যাবসায় নতুন আরও
কিছু আইটেম যোগ করেছে। যেমন ধূপ কাঠি, আমলকী ইত্যাদি। ট্রেনের প্যাসেঞ্জাররা খাবার জিনিষ ছাড়া আর যা
যা জিনিষ কেনে তার সবই মোটা মুটি সুমনের ঝোলায় থাকে। ওর ব্যাবসায় রোজগারও অনেক বেড়েছে। এখন মাসে
প্রায় আট নয় হাজার টাকা প্রফিট হয় সুমনের।
সেদিন শনিবার। সুমন বাড়ি থেকে বেড় হবে বলে রেডি হচ্ছে। তখন সকাল সাড়ে আটটা বাজে সবে। দূর্বা অনেক দিন
পর ফোন করে সুমনকে। ওর গলার স্বর শুনেই মনে হল মারাত্মক কিছু একটা হয়েছে। ফোন তুলতেই দূর্বা ফিস ফিস
করে বলে ওঠে,”সুমন বাবু, আপনার সন্দেহই একদম ঠিক ছিল। দিদি কন্সিভ করেছে। আমি কত করে বলেছিলাম
আপনার দেওয়া ওষুধটা খেতে ,খেল না তো, এখন বোঝো ঠ্যালাটা।“

সুমন চুপ করে থাকে। ও ঠিক সন্দেহ করেছিল যে দূর্বার দিদি গর্ভবতী হয়ে যেতে পারে আর তাই ঐ ট্যাবলেট খানা
দিয়েছিল সেদিন। কিন্তু মেয়েটা ওকে বিশ্বাস করেনি আর আজ তার ফল বুঝতে পারছে। সুমন দূর্বার মনের
অবস্থাটা বেশ বুঝতে পারে। ও যেভাবে কথাটা বলল তাতে বোঝাই যায় যে দূর্বা সুমনকে কতটা বিশ্বাস করে
ফেলেছে। উদাস কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল,” কি করে কনফার্ম হলেন আপনারা ?”
দূর্বা এবার সুমনকে সব খুলে বলল,”কাল দিদিকে বারাসতেরই এক লেডি গাইনি ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছিলাম।
আর উনি চেক আপ করে কনফার্ম করেছেন যে দিদি মা হতে চলেছে। শুধু তাই না, দিদিকে যেই ওষুধটা আপনি
খাওয়াতে বলেছিলেন ওনাকে সেই ওষুধটার নামও বলেছিলাম। সেটা শুনে ডাক্তারবাবু দিদিকে খুব বকাবকি করেছে
যে ও ঐ ওষুধটা কেন খায় নি ? ঐ ওষুধটা খেলে হয়তো ওর এই সমস্যাতে পড়তে হত না। বাড়িতে এসে দিদি কাল
রাতে খুব কান্না কাটি করেছে। বেচারির এখন এবরসন করানো ছাড়া আর কোন উপায় নেই। কি বিশ্রী কাণ্ড বলুন
তো ?”
সুমন আর কি বলবে । শুধু জিজ্ঞাসা করে,”বাড়িতে আর কেউ জানে এসব, মানে বৌদি বা দাদা ?“ দূর্বা ছোট্ট করে
বলে “না”। একটু পরে আবার বলে ,” আপনি এতো ভাল একটা ওষুধ দিলেন আর দিদি সেটা খেল না কেন বলুন তো ?
কোথায়, আমি তো আপনাকে বিশ্বাস করে আমার বৃদ্ধাশ্রমে নিয়ে গেলাম, ও কেন অন্তত আমাকে বিশ্বাস করে
ওষুধটা খেল না ?”
সুমন শুকনো হাসি হেসে বলে,” অথচ দেখুন, যাকে বিশ্বাস করে ওইদিন ডিনারে গেছিল সেই ওকে ধোঁকা দিয়েছে।
আসলে প্রত্যেকটা মানুষের ভিতর আর একটা মানুষ বাস করে। যাকে খুব খারাপ লোক মনে হয় দেখবেন তাঁরও
একটা মন আছে আর তার ভিতরে একটা ভাল মানুষ বাস করে। আবার যাকে বাইরে থেকে খুব ভাল মানুষ মানে হয়
তার ভিতরেও একটা শয়তান বা বদমাশ লোক বাস করে যাকে বাইরে থেকে দেখা যায়না। সত্যিকারের মানুষকে চেনা
খুব শক্ত কাজ দূর্বা।“
দূর্বা চুপ করে শুনছিল সুমনের কথা। সুমন থামল পরে হটাত বলে ওঠে,”আজ না আমার আপনার সাথে দেখা করতে
খুব ইচ্ছা করছে। আপনি কি আজ লাইব্রেরীতে আসতে পারবেন ? অনেক দিন কিন্তু আমাদের দেখা হয়নি। জানিনা
আপনি আমার উপর রাগ করে আছেন কিনা।, ফোনও তো করেন না। তাছাড়া আপনার গগলসটাও তো আমার কাছে
আছে। আজ আপনি এলে নিয়ে আসব। কি আসবেন আজ ?”
সুমনেরও দূর্বাকে দেখবার খুব ইচ্ছা হচ্ছে বেশ কয়েক দিন যাবত। কিন্তু লজ্জায় ওকে ফোন করেনি। কি ভাববে
ওকে, একটা হ্যাংলা ব্যাটা ছেলে। মেয়েদের দেখলে ছুক ছুক করে। কিন্তু সুমন তো ওরকম ছেলে না। অনেকেই ওর
সাথে লাইন মারার চেষ্টা করেছে কিন্তু ও কাউকেই পাত্তা দেয়নি। আর আজ এখানে সবাই জানে ও একজন হকার,
একটা ভাঙ্গা চোরা পুরানো বাড়িতে থাকে। ওর আবার মেয়ে বন্ধু কি করে হবে ? অথচ আশ্চর্য দূর্বা সব কিছু
জেনেও ওকে কতটা সন্মান দেয় ভেবে অবাক লাগে সুমনের। দূর্বাকে কেন জানি ওরও বেশ ভাল লাগে, আর দূর্বাও
যে ওকে বেশ পছন্দ করে সুমন বোঝে সেটা।
সুমন দূর্বার আমন্ত্রন আর ফিরিয়ে দিতে পারল না। সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ আসতে পারবে বলে দিয়ে লাইনে চলে
বেড়িয়ে যায়। মাসের শেষ, খুব একটা ভাল বিক্রি হয়না, তাড়াতাড়ি ফিরে আসে বাড়িতে। সন্ধ্যা সাতটার একটু
আগেই চলে আসে লাইব্রেরীতে। একটা কালো জিন্সের উপর স্কাই কালারের টি সার্টে ওকে খুব মানিয়েছে আজ।
এক কোনের টেবিলে একটা মেডিক্যাল বই নিয়ে বসে পড়তে থাকে। কিছুক্ষণ বাদে হটাত মুখ তুলে দেখে সামনে দূর্বা
দাঁড়ানো। ওর পড়নে একটা আকাশী রঙের সিল্কের সাড়ি আর ম্যাচিং ব্লাউজ। দূর্বাকে আজ শাড়িতে খুব সুন্দর
লাগছে দেখতে।
সুমন একটা চেয়ার এগিয়ে দেয় দূর্বার দিকে আর বলে,” বাঃ, আপনাকে আজ খুব সুন্দর লাগছে দেখতে।“ দূর্বার
মুখে এক চিলতে লজ্জার রোশনি ছড়িয়ে পড়ে,বলে,” আপনাকেও তো দারুণ মানিয়েছে এই ড্রেসটা। এই যে এই নিন

আপনার গগলস। কি ভুলো মনরে বাবা।“ কথাটা বলতে বলতে চেয়ারে বসে ওর সাইড ব্যাগ থেকে সুমনের গগলস বেড়
করে দেয় দূর্বা। ওর ঠোঁটের কোনে ব্যাঙ্গের হাসি ছড়িয়ে যায়।
সুমন হেসে বলে,”ভুলো মন কেন হব ? আমি তো এটা আপনার কাছে গচ্ছিত রেখে গেছিলাম। আর মানুষ যাকে বিশ্বাস
করে তার কাছেই তো সব গচ্ছিত রাখতে ভালোবাসে, এমন কি নিজের মনটাকেও।“ কথাটা বলেই একটু চুপ করে থেকে
সুমন ইঙ্গিত পূর্ণ হাসি হেসে আবার বলে,”এই যে আজ আপনি এটা ফেরত দিয়ে দিলেন। আমার আপনার সাথে
কাটানো সুন্দর সময় গুলি তো আর ফেরত দিতে পারবেন না, পারবেন কি ?“ দূর্বা সুমনের কথার মানে বেশ বুঝতে
পারে আর লজ্জায় লাল হয়ে মুখ নিচু করে থাকে।
সুমন আর দূর্বা দুজনেরই দুজন কে ভাল লাগে, কিন্তু কেউই কিছু বলার সাহস পায়না। এখন ওরা প্রায়ই সন্ধ্যার
পর টাউন লাইব্রেরীতে এসে দেখা করে আর ফিস ফিস করে গল্প করে অনেকটা সময় কাটায়। লাইব্রেরীর অনেকেই
দেখে ওদের কিন্তু কেউই কিছু মনে করে না। দেখেছে অনেক দিন যাবতই ওদের বন্ধুত্ব আছে আর ভাবে হয়তো
একই বিষয়ে পড়া শুনা করছে ওরা। লাইব্রেরীতে যে যার পড়াশুনার কাজে আসে, কেউ কারো খোঁজ খবর নেওয়া
দরকার মনে করে না। দিনে দিনে দূর্বা সুমনের প্রেমে হাবুডুবু খেতে থাকে আর লোকটার আসল পরিচয় জানার জন্য
ছট ফট করতে থাকে। সুমন এখনো ওর আসল পরিচয় লুকিয়ে রেখেছে আর কথায় কথায় ইচ্ছা করেই দূর্বাকে ওর
হকারি করার গল্প শোনায়।
…… চলবে।
- নয় -
হটাত গরমের পড় বৃষ্টির লুকোচুরি খেলায় সিজন চেঞ্জের ফলে অনেকেরই ঠাণ্ডা লাগতে শুরু করে দিয়েছে।
সুমনেরও হটাত খুব ঠাণ্ডা লেগে জ্বর হল সেদিন। ও বাড়ি থেকে আর বেড় হয়নি। একটা ভারি চাদর গায়ে ঘরেই শুয়ে
ছিল। পাশের বাড়ির চোদ্দ পনেরো বছরের বাব্লু সুমনের বেশ ভক্ত। ওকে দিয়ে একটা জ্বরের ওষুধ এনে খেয়েছে।
তাও ওর জ্বর কমছে না। দূর্বা ফোন করে অনেক বার, কিন্তু সুমন সেটা তোলে না। ভাবে মেয়েটাকে শুধু শুধু চিন্তায়
ফেলে লাভ কি।
দূর্বা ওর দিদিকে নিয়ে গিয়ে ওর এবরসন করিয়ে এনেছে সেই খবরটাই দিতে চাইছিল। কিন্তু বিকাল পর্যন্ত সুমন
ওর ফোন ধরল না।দূর্বা খুব চিন্তায় পরে গেল। সুমন একবার কথায় কথায় বলেছিল যে ও লালি সিনেমার পাশের
কোন গলিতে থাকে। কেন ও ফোন ধরছে না সেই চিন্তায় অস্থির হয়ে দূর্বা আর থাকতে না পেরে রিক্সা নিয়ে চলে
যায় লালি সিনেমার পাশে। তখনো সন্ধ্যা হয়নি। দুরের বিকালের আকাশে এক ফালি চাঁদ উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করেছে
সবে। পনের মিনিটের মধ্যেই দূর্বা পৌঁছে যায় ওখানে আর পাশের গলিটায় ট্রেনের হকার ভাইয়ের বাড়ি কোথায়
বলতেই একটু ভিতরে সুমনের বাড়িটা দেখিয়ে দেয় একজন বয়স্ক লোক। এখানে ওকে সবাই ভাই নামে চেনে ,সুমনই
একদিন বলেছিল দূর্বাকে।
একটা চাপা রাস্তার দুই ধারে অনেক ছোট ছোট কাঁচা পাকা বাড়ি। ডান পাশে একটু এগিয়েই একটা ছোট একতলা
টালির ছাত দেওয়া পাকা বাড়ি। সামনে একটা ছোট বারান্দা আর মাঝখানে ঘরের দরজা। রাস্তার সামনে একটা গেট
আর তার দুদিকে কাঁটা ঝোপ গাছের বেড়া দেওয়া। দূর্বার পড়নে একটা গোলাপি তাঁতের শাড়ি আর লাল ব্লাউজ। আসে
পাশের বাড়ির দুই একজন মহিলা দেখল ওকে, কিন্তু ভাবল ভাইয়ের কোন আত্মীয় বোধ হয়। বাঁশের গেট খানা খুলে
দূর্বা বারান্দায় উঠে দেখে দরজাটা ভেজানো।
আস্তে করে দরজাটা ঠেলতেই সেটা খুলে যায়। ঘরে ঢুকে আলো আধারিতে দূর্বা দেখল ভিতরে এক ধারে একটা
চৌকিতে বিছানায় চাদর মুরি দিয়ে ওপাশ ফিরে শুয়ে আছে সুমন। এই সন্ধ্যা বেলা ও এই ভাবে শুয়ে আছে কেন ?
দূর্বার বুকের ভিতরটা দুশ্চিন্তায় কেঁপে উঠল। তাহলে কি ওর শরীর খারাপ ? দূর্বা ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে সুমনের

কপালে হাত দিয়ে চমকে ওঠে। গায়ে ধুম জ্বর নিয়ে ঘুমচ্ছে লোকটা। পড়নে পাজামা আর একটা নীল টি সার্ট।
বিছানার এক পাশে ফোনটা পড়ে আছে। দূর্বা বুঝতে পারে যে ওটা সাইলেন্সে রেখেই হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে সুমন।
দূর্বা গিয়ে আগে লাইট জ্বালায়। দেখে ঘড়টা বড় আর মোটামুটি গোছানো, নোংরা নয়। একপাশে একটা পুরানো
কাঠের আলমারি একটা টেবিল আর দুটো প্লাস্টিকের চেয়ার আর একধারে মেঝেতে সুমনের ব্যবসার জিনিষ পত্র
ছড়িয়ে রাখা। একা মানুষটা এতো কষ্টে কেন আছে সেটাই ওর মাথায় ঢোকে না। লাইট জ্বালিয়ে একবার সুমনের
দিকে তাকিয়ে দেখে ও গভীর ঘুমে রয়েছে।
দূর্বা কাঠের আলমারির একটা পাল্লা খুলে দেখে ভিতরে সুমনের পড়বার জামাকাপড় আর কয়েকটা মেডিকেলের বই
রাখা। দূর্বার হটাত মনে পরে যায় সুমন ওর দিদির আধার কার্ড দেখে ওদের বাড়ির ঠিকানা যোগাড় করে দিদিকে
নিয়ে এসেছিল। দূর্বা সুমনের মানি ব্যাগ খুঁজতে শুরু করে, নিশ্চয়ই সুমনের আধার কার্ডটা হাতে পেলে ওর সব
বৃত্তান্ত জানা যাবে । একটু ভাল করে খুঁজতেই একটা প্যান্টের পকেটে সুমনের মানি ব্যাগটা নজরে পরে যায়
দূর্বার।
সুমনের বিছানায় ওর পাশে বসে একবার গায়ে হাত দিয়ে দেখে সুমন জাগে কিনা। না, সুমনের ঘুম ভাঙে নি। দূর্বা
মানিব্যাগটা খুলে দেখে ভিতরে শ’তিনেক টাকা আর কিছু কাগজ পত্র। কাগজ গুলি ঘাটতেই ওর নজরে এলো সুমনের
আধার কার্ড। লাইটের সামনে এনে দেখে আধার কার্ডে লেখা ডক্টর সুমন মুখারজি , এম বি বি এস। ভিলেজ
রামকান্ত পুর, জেলা বীরভূম, পশ্চিম বঙ্গ। দূর্বা ঠিকানাটা ভাল করে দেখে মুখস্থ করে রাখল।
সুমনের আসল পরিচয় তাহলে ও সত্যিই একজন ডাক্তার। কিন্তু সুমন কেন এখানে এই ভাবে হকার সেজে একটা
সর্বহারা মানুষের মত আত্ম গোপন করে অজ্ঞাতবাসে আছে ? ও কি কোন অপরাধ করেছে নাকি একজন নকশাল
বা অন্য কোন উগ্রবাদী রাজনৈতিক দলের সদস্য ? পুলিশ কি ওকে খুঁজে বেড়াচ্ছে ? কিন্তু সুমন তো ভীষণ ভাল
ছেলে আর খুব ভাল ডাক্তার। ও বাইরে হকার সেজে থাকলেও আসলে একজন উচ্চ শিক্ষিত ডাক্তার। দূর্বা দেখেছে
ও লাইব্রেরীতে বসে কত মোটা মোটা ডাক্তারি বই পড়ে ।
এই ঘুমিয়ে থাকা মানুষটাকে আজ দূর্বা প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসে। দূর্বা বিশ্বাসই করতে পারেনা যে সুমন কোন
অন্যায় করতে পারে । এতদিন যাবত সুমনকে এতো কাছে থেকে দেখে দূর্বার ওর উপর অগাধ আস্থা জন্মে গেছে।
না, এতো বড় ভুল হবে না দূর্বার । মানুষ চিনতে ওর ভুল হয়না কখনো।
দূর্বার সুমনের জন্য ভীষণ কষ্ট হচ্ছে তখন। এখন সুমনকে ছাড়া নিজেকে ভাবতেও পারেনা কিছুতেই। আর এটাও
বোঝে যে সুমন নিজেও ওকে খুব পছন্দ করে আর দূর্বা ফোন করলে ও খুব খুশি হয়। ওকে দেখলেই সুমনের মুখে
একটা খুশির আলো দেখতে পায় দূর্বা। সুমনের বিছানায় গিয়ে বসে দূর্বা আর আস্তে আস্তে ওর গালে একটা চুমু
দেয়। ফিস ফিস করে কানের কাছে মুখ এনে বলে,” ওঠো সুমন, দেখো আজ তোমার দূর্বা এসেছে। আমি যে তোমাকে
ভালবেসে ফেলেছি গো। দেখো সত্যিই আমি তোমার বাড়িতে এসেছি সুমন।“
হটাত ফিস ফিস করে কেউ কথা বলছে শুনেই সুমনের ঘুম ভেঙে যায়। চোখ খুলে ঘুরে দেখে দূর্বা ওর উপর ঝুঁকে বসে
ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। দূর্বার নরম সুগঠিত স্তনের ছোঁয়া লাগছে ওর হাতে। সুমনকে চোখ খুলতে দেখেই
দূর্বা ওর চোখের উপর হাত রেখে অভিমানির মত বলল,”না, আগে আমাকে আরেকটু দেখতে দাও তোমাকে। তুমি তো
আমাকে কোনদিন তোমাকে দেখতে দেবে না, তাই আমি এখন দেখব তোমাকে, প্রাণ ভরে দেখব আমার মনের
মানুষটাকে।“
সুমনের এই শরীর খারাপের মধ্যেও হাসি পেয়ে গেল। দূর্বার হাতের উপর হাত রেখে বলল,” আচ্ছা, একটা ঘুমন্ত
পুরুষ মানুষকে এই ভাবে কেউ লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে ? তুমি কিন্তু সত্যিই একটা পাগলী। কখন এসেছ তুমি ?” কিন্তু
সুমনের হটাত করে দূর্বার এই আসাটা ভীষণ ভাল লাগছিল তখন।

দূর্বা হাত সরাতেই সুমন উঠে বসে। দূর্বা একটু কপট অভিমান করে বলে,” তোমার এতো শরীর খারাপ, আর তুমি
আমাকে জানাওনি কেন ? কি আমাকে জানালে তোমার জাত চলে যেত ? জানো সকাল থেকে কতবার ফোন করেছি
তোমাকে ? ওঠো, আমি এক্ষুনি তোমাকে নার্সিং হোমে নিয়ে যাব।“ দূর্বার গলায় যত রাজ্যের অভিমান ঝরে পড়ে।
মনের মনুষটাকে এভাবে পড়ে থাকতে দেখার আবেগে আচ্ছন্ন হয়ে থাকে।
ওর এই নির্জন ঘরে দূর্বা ওর সামনে বসে সুমনের বিশ্বাস হচ্ছে না যেন। আর আজ আবার মেয়েটা ওর উপর
খবরদারি করে কথা বলছে। সুমনের দূর্বার এই দিদিমনির মত আচরন খুব ভাল লাগছিল। দূর্বার একটা হাত নিজের
হাতের মধ্যে নিয়ে বলে,”তুমি এতো টেনশন নেবে না। ঠাণ্ডা লেগে জ্বর এসেছে। ওষুধ খেলেই ঠিক হয়ে যাবে। আমি
কয়েকটা ওষুধ লিখে দিচ্ছি, তুমি বরং একটু গিয়ে নিয়ে আস না প্লিস।“
টেবিলের উপর একটা ছোট ডাইরি থেকে একটা কাগজ ছিঁড়ে আর পেন এনে দেয় দূর্বা। সুমন তাতে দুটো ট্যাবলেট
আর একটা সিরাপ লিখে দিলো ওকে। ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে দূর্বা বড় রাস্তার মোড়ের ওষুধের দোকান থেকে নিয়ে
আসে সব ওষুধ আর সুমন দুটো ট্যাবলেট তখনই খেয়ে নেয়। ট্যাবলেট খেয়ে বিছানায় বসে দূর্বাকে দেখতে থাকে
সুমন। ওকে তাঁতের শাড়ি পড়া অবস্থায় আজ প্রথম দেখছে সুমন। কি সুন্দর বৌ বৌ লাগছে দূর্বাকে। মেয়েটা আজ
প্রথম ওকে তুমি করে বলছে আর বেশ ভাল লাগছে শুনতে।
দূর্বা পাশে বসে আদুরে গলায় বলল,” তুমি আমাকে একটুও ভালবাসোনা না ?” সুমন ক্লান্ত স্বরে দূর্বার কাঁধে হাত
রেখে বলে ,”এমন কথা বলছ কেন দূর্বা ? তুমি কি বোঝো না সোনা আমি তোমাকে কতোটা ভালবাসি ? আমি তোমার
ফোন ধরতে পারিনি কারন সকাল থেকেই ধুম জ্বর ছিল। ফোন সাইলেন্ট করে রেখেছিলাম আর পাশের বাড়ির
ছেলেটাকে দিয়ে শুধু একটা ট্যাবলেট এনে খেয়েছি।“
দূর্বা বুঝতে পারছিল যে সুমন সারাদিন কিছু খায় নি। সুমনের হাত সরিয়ে দিয়ে চলে যায় পিছনে রান্না ঘরে। ভাতের
হাড়িতে আধ কাপ চাল আর জল ফেলে ধুয়ে স্টোভ জ্বালিয়ে তার মধ্যে একটা আলু সিদ্ধ বসিয়ে দিয়ে আবার এই
ঘরে আসে। দূর্বার এই গিন্নীপনা বেশ ভাল লাগছিল সুমনের। দূর্বা ঘরে আসতেই বলে,”এ তো গেল আজ একদিন।
তারপর, তারপর তুমি কোথায় ? সেই আমাকেই তো সব করতে হবে। করবে , আমাকে বিয়ে করবে দূর্বা ? দেখো
এতো ভাল হকার বর আর পাবে না কিন্তু।“ মুচকি মুচকি হাসতে থাকে সুমন।
দূর্বা বিছানায় বসে সুমনের হাত ওর হাতের মধ্যে নিয়ে বলে ,”বিয়ে করতে পারি তবে একটা শর্তে। তুমি যদি সেই
শর্ত মানো তবেই আমি তোমাকে বিয়ে করতে রাজি। বল, পারবে সেই শর্ত রাখতে ?” সুমন দূর্বার হাতে একটা চুমু
দিয়ে বলে,"বলো কি তোমার শর্ত ? তোমার জন্য সব শর্ত মানতে আমি রাজি । “
সুমন উৎসুক হয়ে চেয়ে থাকে দূর্বার মুখের দিকে। কথাটা এমনি কথাচ্ছলে বললেও সুমনের দূর্বাকে বিয়ে করতে
একটুকুও আপত্তি নেই। এই কয়দিনেই মেয়েটা ওর জীবনের অনেকটা জায়গা জুড়ে ওর মনের আঙিনায় প্রেমের
আল্পনা আঁকতে শুরু করে দিয়েছে । এখন সুমনের একা একা থাকতে আর ভাল লাগেনা। এক তো ও রান্না বান্না
জানেনা আর দ্বিতীয়ত বয়স বাড়ছে, এখন বিয়ে না করলে আর কবে করবে ? আর সবচেয়ে বড় কথা মুখে না বললেও
সুমন দূর্বাকে ভালোবাসে, ভীষণ ভালোবাসে।
দূর্বা সুমনের দিকে তির্যক ভাবে তাকিয়ে বলল,”তোমাকে এই হকারি ছেড়ে ডাক্তারি শুরু করতে হবে। আমি
ভালমতো জানি তুমি একজন ডাক্তার। আমাকে আর মিথ্যা কথা বোল না প্লিস।“
সুমন একটু চুপ করে রইল। ও জানে দূর্বার কাছে ও পুরোপুরি ধরা পরে গেছে , এখন আর ওকে মিথ্যা কথা বলে লাভ
নেই। আর দূর্বার মত মেয়েকে সুমনের বিশ্বাস করতে মন চায়। ও একটা অন্য ধরনের মেয়ে। পড়াশুনায় ভাল, ভদ্র
শিক্ষিত পরিবার, সমাজ সেবার কাজ করে, আচার ব্যাবহারে লক্ষ্মীশ্রী আছে মেয়েটার মধ্যে। অনেকটা ওর মায়ের
মত। আর সুমন এই ধরনের মেয়েকেই বেশি পছন্দ করে।

দূর্বার মনের ভিতর তখন তোলপাড় চলছে। ও জানে সুমন ওকে ভালোবাসে কিন্তু মুখে প্রকাশ করেনা। সুমনের মুখ
তুলে ধরে ওর গালে একটা চুমু দিয়ে বলে,” কি হল মশাই, শর্তটা কিন্তু পালটাবে না। হয় শর্ত মেনে বিয়ে করো
অথবা ভুলে যাও, আমি তোমার শুধু বন্ধু হয়ে থাকতে রাজি। ওসব বিয়ে টিয়ে হবে না।“
সুমন দূর্বার গালে দুই হাত রেখে ওকে আদর করে বলে,” আমার প্র্যাকটিস করার একটু অসুবিধা আছে দূর্বা। আমি
বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এসেছি। আমার সার্টিফিকেট বাড়িতেই আছে, আনা হয়নি।“
দূর্বা ওকে এবার আরও চেপে ধরল। হেসে বলল,”তা যাও না বাড়িতে গিয়ে নিয়ে এসো। এই ভাবে হকারির কাজ করে
নিজেকে লুকিয়ে রেখেছ কেন তুমি? কি এমন অপরাধ করেছ তুমি ?“
এরপর দূর্বাকে সব খুলে বলল সুমন। ওদের পরিবারের কথা, ওদের ম্যানেজারের জন্য বোনের কন্সিভ করার কথা,
অঞ্জলিকে এবরসন করানোর কথা, ঐ ম্যানেজার আঙ্কল কৌশিককে কুয়োতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে পালিয়ে চলে
আসার কথা আর গত দুই বছর যাবত এইখানে এই ঘণ্টাদার বাড়িতে অজ্ঞাতবাসে থেকে হকারি করে ওর পেট
চালাবার কথা। কলকাতায় কেউ জানেনা ওর আসল পরিচয়, আজই প্রথম দূর্বার কাছে ও স্বীকার করল। ঘণ্টাদা
নেই কিন্তু তার ব্যবসাটা আছে আর সেটা চালাচ্ছে সুমন, ঘণ্টাদার প্রিয় ভাই।
দূর্বা সব শুনে থ হয়ে গেল। এই লোকটার জীবনে এতো কিছু ঘটে গেছে ওকে দেখলে কিছুই বোঝা যায়না। বোনের
জন্য নিজের জীবনটাকেই শেষ করে দিচ্ছে সুমন। দূর্বার নরম মন। সুমনের দুঃখের কাহিনী শুনে কেঁদে ফেলল দূর্বা।
ওর দুচোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়তে থাকে। সুমন দুই হাতে দূর্বার গালের জল মুছে ওকে জড়িয়ে ধরে আর
দূর্বার কমলা লেবুর রোঁয়ার মত সুন্দর দুটো ঠোটের মধ্যে চেপে ধরে ওর ঠোঁট দুটো, গভীর ভাবে চুমু খায় দূর্বাকে
আর বলে,”কেঁদো না সোনা। আমি কান্না একদম সহ্য করতে পারি না।“
সুমনের বুকে মুখ গুঁজে দূর্বা ফিস ফিস করে বলে,” আমাকে ক্ষমা করে দাও সুমন। আমি এতো সব না জেনে তোমাকে
ভুল ভাব ছিলাম। তুমি সাধারণ মানুষ নও, তুমি একটা এক্সট্রা অরডিনারি পার্সন। আই আম প্রাউড অফ ইউ।
আই লাভ ইউ সুমন , আই লাভ ইউ।“ আবেগে সজোরে পেঁচিয়ে ধরে সুমনকে।
সেই রাতে সুমনকে ভাত আলুসিদ্ধ খাইয়ে বাড়ি ফেরে দূর্বা। সারা রাত ভাল করে ঘুমতে পারে না। পর দিন আবার
গিয়ে দেখে আসে সুমনকে আর ওকে টিফিন বানিয়ে খাওয়ায় আর দুপুরের জন্য ডাল আর ডিমের ঝোল রেঁধে রেখে
আসে। সুমন মনে মনে খুব খুশি হয় দূর্বার এই সেবা যত্ন দেখে । বিকালের দিকে শরীর অনেকটা সুস্থ বোধ করায়
ফোন করে দূর্বাকে আর বলে,”এ যাত্রায় তোমার জন্যই বেঁচে গেলাম গো দূর্বা।“
…… চলবে।
-দশ -
সুমন এর মধ্যে দূর্বার সাথে আরও তিন দিন গিয়েছিল দূর্বাদের বৃদ্ধাশ্রমে। আর সুমন যখনই যায় তখনই ঐ বৃদ্ধ
মানুষ গুলি খুব খুশি হয়। সুমনের দেওয়া ওষুধে ওদের খুব ভাল কাজ হচ্ছে আর ওরা বেশ ভালই আছে। ছেলেটা সত্যিই
খুব ভাল ডাক্তার আর কত আন্তরিকতার সাথে ওদের চেক করে, ওষুধ দেয়। ঐ ডক্টর হাজরা সুমনের মত অতো
যত্ন নিয়ে ওদের দেখেও না আর ওনার ওষুধে তেমন কাজও হচ্ছে না।
ডাক্তার হাজরাকে একদিন কথায় কথায় সুমনের ওদেরকে দেখা আর ওষুধ লিখে দেবার কথা বলে দেয় আশ্রমের
একজন বৃদ্ধ লোক। হাজরা শুনে ভীষণ রেগে গেল। সোজা ম্যানেজারের ঘরে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে কেন বাইরের অন্য
ডাক্তারকে ওর রোগীকে দেখানো হচ্ছে ? ম্যানেজার মনোজ ওনাকে অনেক বোঝায় কিন্তু উনি বোঝেন না। বজ্জাত
লোকটা মনে মনে এর প্রতিশোধ নেবার জন্য প্যাঁচ কষতে থাকে।

ইদানীং কালে কলকাতা এবং তার আশেপাশে অনেক ভুয়ো ডাক্তার ধরা পড়েছে। পুলিশ এইরকম অনেক
কম্পাউন্ডারকে আর বেশ কিছু ভুয়ো ডাক্তারকে জেলে ভরেছে। হাজরা এই সুযোগটা নেয় আর সোজা পুলিশে
কমপ্লেন করে দেয়। পুলিশ আসে বৃদ্ধাশ্রমে আর সুমনের হাতে লেখা কয়েকটা প্রেসক্রিপশন সাথে নিয়ে চলে যায়।
বৃদ্ধাশ্রমের অফিসটা চাপা ডালির মোড়ে, বিকাল বেলা পুলিশ গিয়ে হাজির হয় সেখানে।
সুমনকে দিয়ে বৃদ্ধ মানুষগুলির চিকিৎসার কথা এন জি ও অফিসে দূর্বা কিছুই জানায় নি। কিন্তু বেলার দিকে
মনোজ ঘোষ আশ্রমে পুলিশ আসার খবরটা জানিয়ে দেয় দূর্বাকে। দূর্বা যখন দত্ত পুকুরে ওদের একটা বয়স্ক
মানুষদের শিক্ষা দান কেন্দ্রে তখন ওর কাছে ফোন আসে। দূর্বা ভাবে বারাসতে ফিরে কাল সকালেই গিয়ে ওদের
এন জি ওকে সব জানাবে আর হাজরার বিরুদ্ধে কাজে গাফিলতির কথা বলে অভিযোগ করবে।
এদিকে পুলিশ এসে ভুয়ো ডাক্তারবাবুর খোঁজ করতেই এন জি ওর লোকেরা দূর্বাকে ফোন লাগায় আর ওকে
জিজ্ঞাসা করে সুমনের ব্যাপারে, আর ওর কাছ থেকে সুমনের নাম ঠিকানা লিখে নেয়। কিন্তু ওরা বলেনা যে অফিসে
পুলিশ বসে আছে। পুলিশ অফিসার সুমনের ঠিকানা পেয়েই সোজা চলে আসে ওর বাড়ি। তখন সবে সন্ধ্যা। দুদিন যাবত
জ্বরে ভুগে সুমন আজও বাড়িতেই ছিল। ভেবেছে কাল থেকে কাজে বেড় হবে। কিন্তু সেই সুযোগ আর পায়না সুমন।
পুলিশ তুলে নিয়ে চলে যায় সুমনকে, ওকে কোন কিছু বলার সুযোগই দেয় না আর। সুমন শুধু প্যান্ট সার্ট পড়ে দরজায়
তালা লাগিয়ে চাবিটা বাব্লুর হাতে দিয়ে চলে যায় ওদের সাথে।
দূর্বা যখন রাতে বাড়ি ফিরে সুমনকে ফোন করে ও কেমন আছে জানার জন্য সুমনের ফোন বেজেই চলে, কিন্তু সুমন
ফোন তোলে না। দূর্বার মনে দুশ্চিন্তা ছেয়ে যায়। নিশ্চয়ই আবার ওর শরীর খারাপ হয়েছে আর সুমন আবার জ্বরে
পরে ফোন সাইলেন্টে রেখে ঘুমচ্ছে। রাত তখন প্রায় সাড়ে নয়টা। দূর্বা সুমনকে আর ডিস্টার্ব করা ঠিক হবেনা
ভেবে ফোন রেখে দেয়। সুমনের জন্য খুব চিন্তা হতে থাকে ঠিকই, কিন্তু ভাবে কাল শনিবার সকালে গিয়েই চেক
করবে আর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
বেলা নটা নাগাদ সুমনের বাড়ি এল দূর্বা। এসে দেখে তালা মারা,ঘরের ভিতরে ফোন বাজছে শুনতে পায়। অদ্ভুত লোক,
ওটা ঘরে রেখেই বেড়িয়ে গেছে লোকটা ? বারান্দার এক কোনে দাঁড়িয়ে ভাবতে থাকে কি করবে, অপেক্ষা করবে না
চলে যাবে ? ভাবে ফোন যখন ঘরে তাহলে আসে পাশেই কোথাও গেছে, এখুনি চলে আসবে হয়তো। নাকি আবার গেছে
ওষুধ আনতে, শরীর আরও খারাপ হয়নি তো ?
কিন্তু প্রায় কুড়ি মিনিট হয়ে গেল তাও সুমন আসেনা। আর তখনই পাশের বাড়ির সেই ছেলেটা বাব্লু দূর্বাকে
বারান্দায় দাঁড়ানো দেখে সামনে এসে ওকে সব জানাল আর উত্তেজিত ভাবে বলল,”দিদি, আপনি জানেন কি হয়েছে ?
কাল সন্ধ্যায় ভাইকে পুলিশ তুলে নিয়ে চলে গেছে। ভাই যাবার সময় আপনি এলে আমাকে এই চাবিটা দিয়ে খবরটা
আপনাকে দিতে বলে গেছে।“ বাব্লু ঘরের চাবি তুলে দেয় দূর্বার হাতে।
দূর্বা চমকে উঠল কথাটা শুনে। ভয়ার্ত গলায় জিজ্ঞাসা করল,” মানে,পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে মানে ?’
বাব্লু যতটুকু শুনেছে সেটাই বলল। “ভাই নাকি একজন ভুয়ো ডাক্তার আর তাই ভাইকে এরেস্ট করেছে।“
মাথায় আকাশ ভেঙে পরে দূর্বার। পরিষ্কার বুঝতে পারে সুমনের ব্যাপারে ওর এন জি ও অফিস কাল বিকালে ওকে
কেন ফোন করেছে । মনোজ জানিয়েছিল ওদের বৃদ্ধাশ্রমে পুলিশ এসেছিল আজ , ডক্টর হাজরা নাকি কমপ্লেন
করেছে। এন জি ও অফিস ওর কাছ থেকে সুমনের নাম ঠিকানা নিয়েছে, আর কালই সন্ধ্যাবেলায় ওরা এসে সুমনকে
তুলে নিয়ে চলে গেছে। বেচারা সুমন দূর্বাকে ফোন করার সুযোগটাও পায়নি।
বাব্লু কথা গুলি বলেই স্কুলে চলে যায়। সুমনের দুর্দশার কথা ভেবে দূর্বার বুকটা কষ্টে ফেটে পড়ছিল। দরজার
পাশে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকে দূর্বা। আজ সুমনের এই দুর্দশার জন্য ও নিজেকেই দায়ী মনে করতে থাকে। ও

যদি সুমনকে ওদের বৃদ্ধাশ্রমে না নিয়ে যেত তাহলে কি আজ পুলিশের হাতে ধরা পড়ত সুমন ? সুমনের জীবনে এই
বিপর্যয়ের জন্য দূর্বাই দায়ী, ও কিছুতেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না।
আজ শনিবার। কোর্ট বন্ধ। পুলিশ তার মানে সোমবার ওকে তুলবে কোর্টে। দূর্বা নিশ্চিন্ত হয় যে ওর হাতে দুদিন
সময় আছে সুমনকে বাঁচাবার জন্য কিছু করার। এন জি ও অফিসে আর গেল না দূর্বা। বাড়ি ফিরে আসে আর ঘরের
দরজা বন্ধ করে গভীর চিন্তায় ডুবে যায় দূর্বা। চোখের সামনে সুমনের অসুস্থ শরীর আর ওকে সেদিন অবাক হয়ে
দেখবার মুহূর্তটা বার বার ভেসে আসে। না, ওকে যে ভাবেই হোক ওর ভালোবাসা সুমনকে বাঁচাতেই হবে। কিছুতেই
এতো ভাল একটা সত্যিকারের ডাক্তারকে , একটা মানুষের মত মানুষকে ও হারিয়ে যেতে দেবে না। দূর্বা সুমনকে
ভালোবাসে। ওকে দূর্বা যে ভাবেই হোক পুলিশের হাত থেকে বাঁচাবে।
দূর্বা অনেক ভেবে শেষে ছোড়দার ঘরে গিয়ে ছোড়দাকে সব খুলে বলল যে ওর এক বন্ধু সুমন আসলে একজন
ডাক্তার কিন্তু ওকে ভুয়ো ডাক্তার ভেবে তুলে নিয়ে গেছে পুলিশ। ওদের বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে সুমনের চিকিৎসা করবার
কথা আর ডক্টর হাজরার কমপ্লেন করা সব খুলে বলল। সুমনকে ওর ছোড়দা আগে সেই রাতে এই বাড়িতে বন্যাকে
বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যেতে দেখেছে । অনীশ চিনতে পারল ওকে । এদিকে দূর্বার এখন ওর উকিল দাদাই একমাত্র ভরসা
যে কিনা সুমনকে উদ্ধার করতে পারবে।
অনীশ সব শুনল মন দিয়ে। দূর্বাকে বলে, ”ও যে একজন ডাক্তার সেটা তো বুঝলাম , কিন্তু ওকে সেটা প্রমাণ করতে
হবে আর তার জন্য দরকার ওর ডাক্তারি সার্টিফিকেট , রেজিস্ট্রেশন নাম্বার। সেটা না হলে আমি কিছু করতে
পারব না। তুই দেখ সেটা কোন ভাবে পরশু সকালের আগে আমাকে এনে দিতে পারিস কিনা।“
দূর্বা তখন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এক মুহূর্ত চিন্তা করে মন স্থির করে নেয় আর বলে, “আমি কাল রাতের মধ্যে
তোর হাতে তুলে দেব ওর সার্টিফিকেট। কিন্তু ছোড়দা ওর কেসটা যেন কোর্ট পর্যন্ত না যায় সেটা কিন্তু তোকেই
দেখতে হবে।“ অনীশ বোনের মনের বাকি না বলা কথাটা আঁচ করতে পেরে ওর মাথায় হাত রেখে বলে,” কি ব্যাপার,
হ্যাঁ ? সুমনকে খুব ভালবাসিস বুঝি ?” দূর্বা লজ্জায় লাল হয়ে যায় আর বলে,” ধ্যাত। তুই না একটা যা তা ছোড়দা।“
বলেই ঘর ছেড়ে পালিয়ে গেল দূর্বা।
পরের দিন বেলা সাড়ে নটায় বোলপুর শান্তিনিকেতন স্টেশনে এসে নামলো দূর্বা। আগের দিনই নেটে চেক করে
দেখেছে ভোর সাড়ে ছটায় শিয়ালদা থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসে সিটিং রিসারভেশন পাওয়া যাচ্ছে। ও সঙ্গে
সঙ্গে অন লাইনে বুকিং করে নেয়। ভোর সাড়ে চারটের সময় উঠে চান করে বেড়িয়ে সোজা চলে আসে বারাসত স্টেশন
আর সেখান থেকে ট্রেনে শিয়ালদা। সেইদিন ভাগ্যিস দূর্বা ঠিকানাটা মনে রেখেছিল।
শরত কালের পরিষ্কার আকাশ। ঝলমলে রোঁদ মাথায় স্টেশনের বাইরে এসে বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে রামকান্ত পুরে
যাবার বাস পেয়ে গেল দূর্বা। বোলপুর পালিত পুরের বাসটা ছাড়ে ঠিক দশটার সময়। দূর্বা রামকান্ত পুরের টিকিট
কেটে একটা জানালার পাশে গিয়ে বসে পরে। দূর্বার পড়নে লাল আর সবুজ রঙের ম্যাচ করা সালোয়ার কামিজ আর
হাল্কা সবুজ রঙের ওড়না, চোখে গগলস। দেখেই শহুরে মেয়ে মনে হয়। গ্রামের রাস্তার বাস, অনেকেই ঘুরে ঘুরে
দেখছিল ওকে।
রামকান্ত পুর গ্রামটা বড় রাস্তা থেকে একটু ভিতরে। আধ ঘণ্টা বাদেই দূর্বা আর দুজন মাঝ বয়সী গ্রামের মানুষ
নামলো বাস স্ট্যান্ডে আর বাসটা বেড়িয়ে গেল। ফাঁকা রাস্তার দু ধারে কয়েকটা চায়ের দোকান দেখা যাচ্ছে। দূর্বা
বড় রাস্তায় বাস থেকে নেমেই ঐ দুইজন লোককে জিজ্ঞাসা করল, “ আচ্ছা, সুমন মুখারজির বাড়িটা কোন দিকে
বলতে পারবেন ?” একজন লোক শুধু মাথা নেড়ে কিছু জানেনা বলে চলে গেল। কিন্তু আরেকজন ধুতি কুর্তা পড়া মাঝ
বয়সি লোক দাঁড়িয়ে পড়ে দূর্বার দিকে তাকিয়ে ওকে ভাল করে দেখে বলে ওঠে, ”সুমন মুখারজি মানে সুবোধ
মুখারজির ছেলে, যে ডাক্তারি পড়তে গেছিল ?”

দূর্বা একটা আশার আলো দেখতে পায়, সুমনের বাবার নাম জানেনা,আন্দাজেই সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়িয়ে বলে,” হ্যাঁ
হ্যাঁ , ঐ সুবোধ মুখারজির বাড়িটা কিভাবে যাব যদি একটু বলে দেন।“ লোকটা একটা হাঁক দেয় আর একটা সাইকেল
রিক্সা এগিয়ে এসে দাঁড়ায় দূর্বার সামনে। লোকটা বলে,” আপনি উঠে পরুন দিদিমণি। এ আপনাকে বড় বাড়ি নিয়ে
যাবে।“ কথাটা বলেই লোকটা আবার হাকে,”এই হতভাগা, দিদিমণিকে বড় বাড়ি নিয়ে যা শিগগীর, টাকা পয়সা নিবি না
কিন্তু, বুঝলি ?”
…… চলবে।
- এগার -
বোলপুর পালিত পুর রোডে রামকান্ত পুর বাস স্টপ থেকে সুমনদের গ্রামের পথটা বাঁ দিকে ভিতরে ঢুকে গেছে।
চারিদিকে গাছে ঢাকা একটা গা ছম ছমে ভাব। দূর্বার একটু ভয় করতে থাকে। ছেলেটাকে জিজ্ঞাসা করে,” আচ্ছা , ঐ
সুবোধ মুখারজির বাড়িকে বড় বাড়ি বলেন কেন আপনারা ?” ছেলেটার বয়স কুড়ি একুশ হবে। দাঁত বেড় করে হেসে
বলে,” বলবো না ! ওরা তো এখান কার জমিদার গো দিদিমণি। খুব বড় বাগান ওদের। বিরাট বড় ফলের ব্যবসা।“
দূর্বা অবাক হয়ে শুনতে থাকে। রিক্সা চালাতে চালাতেই ছেলেটা আবার বলে ,” জানেন, গ্রামের অনেক মানুষ কাজ
করে ওদের বাগানে। এই আসে পাশের বাড়িগুলিতে থাকে ওরা। এটাও ওদের জমিদারী। আর ঐ যে লোকটাকে দেখলেন
উনি ওদের ফলের পাইকারি ব্যবসার সাথে জড়িত। আমি আপনার থেকে পয়সা নিলে আমাকে মেরে ফেলবেন উনি।“
ছেলেটা বোকার মত হে হে করে হাসতে থাকে।
এক কিলোমিটার দুরেই সুমনদের বাড়ি। রাস্তাটা সুমনদের বাড়ি গিয়েই শেষ হয়ে গেছে। এতো বড় বাড়ি আর পিছনে
বিরাট বড় বড় গাছের বন দেখেই দূর্বা বুঝতে পারে সুমনরা সত্যিই এখানকার জমিদার আর এরা সবাই ওদের খুব
সন্মান করে। অথচ সুমন কেমন অদ্ভুত একটা জীবন কাটাচ্ছে ! ছেলেটা কোন পয়সাকড়ি না নিয়েই চলে গেল। দূর্বা
দেখতে পেল অনেকদিনের পুরানো বড় লোহার গেটের ভিতর এক টুকরো বাগান পেড়িয়ে বাড়িটার সামনে উঠানে একটা
মোপেড দাড় করানো আর পিছন দিক থেকে একটা তিরিশ বত্রিশ বছরের লোক এসে ওটার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল।
লোকটা ঘুরে গেটে দাঁড়ানো দূর্বার দিকে তাকায়।
দূর্বা রিক্সা চলে যাবার পর অবাক হয়ে ওখানেই দাঁড়িয়ে তখনো। লোকটা দূর্বার দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা
করে,” আপনি কি কাউকে খুঁজছেন ?” দুর্বাও এগিয়ে গিয়ে গেটের ভিতরে ঢুকে দাঁড়িয়ে পড়ে।
বেলা তখন প্রায় সোয়া এগারোটা। রোঁদের তেজ বেড়েছে। দূর্বা সাহস করে বলে,” না, মানে আমি মিস্টার সুবোধ
মুখারজির সাথে দেখা করতে এসেছি , কলকাতা থেকে। উনি নিশ্চয়ই এখানেই থাকেন ?” দূর্বা তখন ভাবছে সুমন
বলেছে ওদের একটা ম্যানেজার আছে। এই লোকটাই কি ওদের ম্যানেজার ? ওর ভয় যে সুমনের নাম বললে অনেক
প্রশ্ন উঠবে তাই ভাবে সুমনের বাবার সাথে দেখা করতে এসেছি বলাটাই ঠিক। সুমনদের ম্যানেজার বিনোদ দূর্বাকে
একবার ভাল করে দেখে নিয়ে হাসি মুখে বলল,’ আপনি ঐ সিঁড়ি দিয়ে উপরে চলে যান। বড়বাবু ওপরে থাকেন।“
ওপরে তখনই বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে ছিল অঞ্জলি, পড়নে গোলাপি সালোয়ার কামিজ। হটাত দূর্বাকে বিনোদের সাথে
কথা বলতে দেখে অঞ্জলি। ও উপর থেকেই চেঁচিয়ে ওঠে, ”কে এসেছে গো বিনোদ দা ?”
বিনোদকে অঞ্জলি দাদা বলেই ডাকে। বিনোদও অঞ্জলিকে বোনের মতই স্নেহ করে। উপর দিকে তাকিয়ে বলে,”
অঞ্জলি, তোমার বাবার সাথে দেখা করতে কলকাতা থেকে এসেছেন উনি।“ কথাটা বলে দূর্বার দিকে তাকিয়ে বিনোদ
আবার বলে,” ও সুবোধ বাবুর মেয়ে। যান আপনি ঐ দিক দিয়ে উপরে চলে যান।“

কলকাতা থেকে এসেছে শুনেই অঞ্জলির মনটা ছাঁৎ করে ওঠে। সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নিচে এসে সামনে দাঁড়ায় আর
হাফাতে হাফাতে জিজ্ঞাসা করে,” আপনি কলকাতা থেকে এসেছেন, কি দাদার কোন খবর পেয়েছেন কি ? কোথায়
আমার দাদা, কোথায় আছে, কেমন আছে ?” বলতে বলতে কেঁদে দেয় অঞ্জলি।
কুড়ি একুশ বছরের তরতাজা যুবতী অঞ্জলিকে দেখে দূর্বার খুব কষ্ট হয়, ওকে ধরে ফেলে আর বলে,” কাঁদবে না।
তোমার দাদা কলকাতায় আছেন। আমি তোমার দাদার ব্যাপারেই এসেছি। আগে আমাকে তোমার বাবার কাছে নিয়ে
চল। অনেক কথা জানার আছে আর বলার আছে।“ অঞ্জলি একটু শান্ত হয়ে দূর্বার হাত ধরে ওকে সিঁড়ির দিকে
নিয়ে যায় আর বিনোদ দূর্বার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ।
ছেলের কথা ভেবে ভেবে এই দুবছরেই সুবোধ মুখারজির অতো সুন্দর চেহারাটা ভেঙে অর্ধেক হয়ে গেছে। বয়সটাও
বাড়ছে, প্রায় ষাট এখন। সেই যে ছেলেটা উধাও হয়ে গেল কোথায় গেল কি করছে কেমন আছে , সারাদিন শুধু সুমনের
কথাই ভাবেন উনি। উপরে ওনার ঘরেই আরাম কেদারায় বসে ছিলেন তখন।
ভগবানের দয়ায় দূর্বা ওদের মড়া গাঙে আজ জোয়ার নিয়ে এলো যেন। উপরে গিয়ে প্রথমেই দূর্বা সুবোধ মুখারজির
পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে নিজের পরিচয় দিয়ে বলে,” আমার নাম দূর্বা চৌধুরী। আমি কলকাতা বারাসতে থাকি।
একটা এন জি ওর সাথে কাজ করি আর ডিসটেন্স কোর্সে এম এ করছি। আপনার সাথে সুমন চৌধুরীর ব্যাপারে কথা
বলতে চাই। আমি ওনাকে চিনি আর সেই জন্যই আপনাদের বাড়িতে আসা।“
মেয়েটা দাদার খবর এনেছে শুনে ওর মাকেও রান্না ঘর থেকে ডেকে এনেছে অঞ্জলি। সুবোধ মুখারজি নড়ে চড়ে
বসলেন। দূর্বাকে আপাদ মস্তক দেখলেন ভাল করে। মেয়টা যে শিক্ষিত আর ভদ্র ঘরের মেয়ে সেটা দেখলেই বোঝা
যায়। দূর্বাকে একটা চেয়ার এগিয়ে দেয় অঞ্জলি, ও তখনো কেঁদে চলছে। ওর জন্য দাদা বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে এই
কষ্টটা কিছুতেই ভুলতে পারে না অঞ্জলি। কিন্তু কাউকে কিছু বলতেও পারে না বেচারি।
দূর্বা এবার সব খুলে বলল সুমনের বাবা মাকে। শুধু অঞ্জলির ব্যপারটা চেপে যায় আর বলে কোন একটা কারণে ওর
সাথে কৌশিকের ঝগড়া হয়েছিল আর ও কৌশিককে কুয়োতে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে মেরে ফেলে বাড়ি থেকে পালিয়ে
গিয়েছিল আর এখন বারাসতে থাকে, ট্রেনে হকারি করে কোন মতে দিন চালায়। আর ও যেহেতু দুর্বারই অনুরোধে
ওদের এন জি ওর কিছু রোগীকে দেখেছে এবং ওষুধপত্র দিয়েছে তাই পুলিশ ওকে ভুয়ো ডাক্তার ভেবে তুলে নিয়ে
গেছে।
দূর্বার কাছে সুমনের বাড়ি ছেড়ে পালানোর কারণ শুনে চমকে ওঠেন ওর মা। অবাক হয়ে বলে ওঠেন,”কিন্তু কৌশিক
তো মরেনি। ও তো বেঁচে আছে।“ সুবোধ চৌধুরীও অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন।
দূর্বা যেন আকাশ থেকে পড়ে। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। সুমনের মা একটু থেমে একবার স্বামীর দিকে দেখে নিয়ে
দূর্বার দিকে তাকিয়ে আবার বলেন,” কৌশিককে পরের দিনই উপরে তুলে আনা হয় আর ও বেঁচে যায়। কিন্তু আমরা
তখনই ওর এই মদ খাওয়ার নেশার জন্য ওকে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম আর ঐ সময়েই বিনোদকে ম্যানেজারের কাজে
রেখেছি , তাও প্রায় দুবছর হবে। তার মানে সুমন এসব কিছুই জানে না ? “
কৌশিক মরেনি বেঁচে আছে শুনে ভীষণ অবাক হয়ে যায় দূর্বা। আর এই কৌশিক ওর হাতে খুন হয়েছে ভেবে সুমন বাড়ি
থেকে পালিয়ে গিয়ে লুকিয়ে আছে বারাসতে ? সুমনের একবার অন্তত ফোন করে হলেও বাড়ির অবস্থাটা জানা উচিত
ছিল। তাহলে হয়ত ওর ডাক্তারি জীবনের এই মূল্যবান দুবছর নষ্ট হত না আর ওকে এতো কষ্ট করে হকার সেজে
সাজা পেতে হতোনা।
সুবোধ মুখারজি সুমনকে পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে শুনে প্রচণ্ড রেগে গেলেন। অঞ্জলিকে বললেন,” বিনোদকে উপরে
ডাকতো অঞ্জলি।“ বলেই স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন,” আমি আজই কলকাতা যাচ্ছি। তুমি আমাদের খাওয়া

দাওয়ার ব্যবস্থা করো। দূর্বা আমি আর অঞ্জলি আর এক দেড় ঘণ্টার মধ্যেই রওনা দেব।“ দূর্বার দিকে
তাকিয়ে কৃতজ্ঞ বাপ সুবোধ বাবু বললেন, ”তুমি এখানে আমাদের কাছে এসে খুব ভাল করেছ দূর্বা। তুমি না এলে
হয়তো আমাদের সুমনের এই এতো বড় বিপদের খবরটা আর আমরা কোনদিন পেতামই না।“
সুমনের মার দূর্বাকে দেখে আর ওর কথা বার্তা শুনে খুব ভাল লেগে যায়। বুঝতেই পারলেন যে মেয়েটার সাথে সুমনের
নিশ্চয়ই একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। সামনে এসে দূর্বার মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে বললেন, ”ওমা কি
সুন্দর নাম তোমার, দূর্বা। সুমনকে তুমি কতদিন যাবত চেন ? তা সুমন তোমার বন্ধু হয় বুঝি ? তুমি কি সুমনকে
ভালোবাসো মা ?”
দূর্বা আর নিজেকে সামলাতে পারল না, তখনই ওর ভিতরের অন্তঃসলিলা ফুলে ফেপে কান্না হয়ে দুগাল বেয়ে ঝরে
পড়ল। সুমনের গায়ে জ্বর নিয়ে পুলিশ ওকে তুলে নিয়ে গেছে। এখন পুলিশ হাজতে কেমন আছে কে জানে। দূর্বা যে ওর
বাড়িতে বোলপুরে এসেছে সেটাও তো জানেনা সুমন। তবে দূর্বা ওকে কিছুতেই জেলে যেতে দেবেনা। কাঁদতে কাঁদতে
দূর্বা সুমনের মার কাঁধে মাথা রাখে আর সুমনের মা ওকে মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিতে থাকেন। বুঝতে পারেন
সুমন আর দূর্বা দুজন দুজনকে ভালোবাসে। দূর্বার থুতনি তুলে ধরে চুমু খান। মনে মনে ধন্যবাদ যানান মেয়েটা ওদের
একমাত্র ছেলের খবর এনে দিয়েছে বলে।
…… চলবে।
- বারো -
বিনোদ উপরে আসবার পর সুবোধ মুখারজি ওকে কলকাতা যাবার জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করতে বলে দিলেন। দূর্বাকে
দাদা ভালোবাসে জেনে অঞ্জলি লাফিয়ে উঠে এবং দূর্বাকে নিজের ঘরে নিয়ে যায়। দাদা ওর জীবন সঙ্গিনি খুঁজে
পেয়েছে দেখে ওর ভীষণ আনন্দ হল। দূর্বা অঞ্জলিকে বলল যে সুমনের কাছে ও বোনের ব্যাপারে সব শুনেছে।
অঞ্জলি কাঁদতে কাঁদতে বলে,” জানো দূর্বাদি, আমার দাদা না থাকলে আমার জীবনটাই নষ্ট হয়ে যেত। আমি
দাদাকে ভীষণ মিস করি। তুমি আমাদের নিয়ে চল দাদার কাছে। দাদাকে আমরা বাড়িতে নিয়ে আসব। তোমরা বিয়ের
পর এখানেই থাকবে, কোথাও যাবে না।“
দূর্বা একটু লজা পেয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু ওর কথাটা শুনতে ভাল লাগে। অঞ্জলির ছেলে মানুষী দেখে মুচকি হেসে
বলে,”ঠিক আছে , সেটা পরে দেখা যাবে। আগে তো তোমার দাদাকে পুলিশের হাত থেকে বেড় করে আনি। তুমি এক
কাজ করো দাদার আলমারি থেকে ওর ডাক্তারির রেজাল্ট সার্টিফিকেট সব বেড় করো আর সঙ্গে নিয়ে নাও।
ওগুলি এখন সবচেয়ে আগে দরকার।“
সুমনের মা দূর্বাকে জোর করে বেশি করে ভাত ডাল ফুল কফির ডালনা আর ইলিশ মাছের ঝোল খাইয়ে দিলেন। আবার
পাতে মিষ্ট দই আর রসগোল্লা দিতেও ভুললেন না। শত হলেও বাড়ির একমাত্র ছেলের ভাবি বৌ। মেয়েটার গায়ের
রঙ একটু চাপা হলেও কি মিষ্টি মুখ আর কি সুন্দর চেহারা। কথা বার্তা শুনেই বোঝা যায় যে মেয়েটা খুব ভাল বাড়ির
মেয়ে আর সুমনকে খুব ভালবাসে। নাহলে একা একা এতদূরে চলে আসত না সুমনের বাড়িতে ওর খোঁজ খবর দিতে। ও
না এলে সুমনের খোঁজও তো আমরা পেতাম না।
দূর্বার সুমনের বাবা মা আর বোনকে খুব ভাল লাগল। কি সুন্দর বাড়িটা আর কত ভাল পরিবার। ওকে ভাবি বৌ ধরেই
নিয়েছে এরা আর তাই ভেবে এখনই যা খাতির করছে তাতে ওর খুব লজ্জা লাগছে। এখানকার পরিবেশটা কলকাতা
থেকে একদম আলাদা। চারিদিকে শুধু সবুজ, গাছ গাছ আর গাছ। ঘন বনের নিবিড় ছায়ার মাঝে এই বাড়িটা যেন একটা
স্বপ্নের রাজ প্রাসাদ। অঞ্জলির ঘরের জানালা থেকে নিচে কুয়োটা দেখতে পায় দূর্বা। আর ওকে ওদিকে তাকিয়ে
থাকতে দেখে অঞ্জলি বলে,” জান দিদি, ঐ ঘটনার পর কুয়োটা বুজিয়ে ফেলা হয়েছে। শুধু ঐ বাইরেটাই একই রকম
আছে।“

দূর্বার কৌশিকের ব্যাপারে খুব জানতে ইচ্ছা হচ্ছিল। শান্ত ভাবে অঞ্জলিকে জিজ্ঞাসা করে,” আচ্ছা ঐ কৌশিক
বাবু এখন কোথায় ?” অঞ্জলির মুখে একটা কালো ছায়া নেমে এলো। মুখ নিচু করে বলে, ”জানিনা। শুনেছি এই গ্রাম
ছেড়ে কোথাও চলে গেছে দু বছর আগেই। আমরা ওর কোন খোঁজ রাখি না।“
খাওয়া দাওয়া সেরে বেলা দুটোর পরেই বেড়িয়ে পরল ওরা। বিনোদ একটা জাইলো গাড়ির ব্যবস্থা করেছে। ওদের
বাড়ি থেকে মোট একশ আশি কিলোমিটার রাস্তা। সামনে ড্রাইভারের সিটের পাশে সুবোধ মুখারজি বসা। পিছনের
সিটে বসে সারা রাস্তা অঞ্জলি দূর্বার কাছে খালি দাদার ব্যাপারেই কথা বলে গেল। অঞ্জলি বোলপুরে কলেজে
পড়ে। বি এ থার্ড ইয়ার এবার। মেয়েটা শুধু সুন্দরই না, কথায় একেবারে ওস্তাদ। দূর্বা শুধু ওর কথা শোনে আর
মুচকি মুচকি হাসে।
সন্ধ্যা সাতটার একটু আগে দূর্বা ওদের নিয়ে সোজা এসে দাঁড়াল বাড়ির সামনে। ছোড়দাকে ফোনে সব বলা আছে।
অনীশ বাবাকেও সব জানিয়ে রেখেছে। দূর্বা এরকম একটা মহান কাজ করছে শুনে অবিনাশ চৌধুরী খুব খুশি। সুমনের
মত একজন সত্যিকারের ভাল ডাক্তারকে বাঁচানোর জন্য মেয়েটা একা চলে গেছে সেই বোলপুরে ওর বাবাকে আনতে,
সত্যি ওনার শিক্ষার মর্যাদা রেখেছে দূর্বা। শুধু এন জি ও না, ও আজ একটা ভাল ছেলের জীবন বাঁচাবে আর
সমাজকে উপহার দেবে একটা ভাল ও সৎ চরিত্রের ডাক্তার।
অঞ্জলি দূর্বাদের বাড়ি ঘর পরিবার দেখে অবাক হয়ে যায়। বৌদি ওকে নিয়ে নিচে গিয়ে রান্না ঘরে রান্না করতে
করতে ওদের বাড়ির কথা, বাগানের কথা ব্যবসার কথা আর সুমনের ব্যাপারে সব জিজ্ঞাসা করে। দূর্বা ছোড়দাকে
তখন দেখাচ্ছে সুমনের সব সার্টিফিকেট। অনীশ ইতিমধ্যে থানার পুলিশ অফিসারের সাথে সুমনের ব্যাপারে কথা
বলে রেখেছে। বন্যা একবার এসে বোনের হবু শ্বশুর আর ননদের সাথে দুটো কথা বলে আবার ওর ঘরে চলে যায়।
আসলে ঐ ঘটনার পর থেকেই বন্যা একদম আপসেট হয়ে পরেছিল আর এখন সারাদিন ঘরে বসে অন লাইনে অন্য
চাকরির চেষ্টা করছে। তখন উপরের ঘরে সুমনের বাবা আর দূর্বার বাবা দুজন বাংলাদেশের গল্পে ব্যস্ত। দুজনেই
খাস বাঙ্গাল আর ইস্ট বেঙ্গল ক্লাব তথা ইলিশ মাছের ভক্ত।
রাতে সুমনের বাবাকে আর বোনকে খুব আদর যত্ন করে রেঁধে খাওয়াল বৌদি। দূর্বা অঞ্জলিকে নিজের সাথে নিয়ে
শুয়েছে। রাত বারোটা অবধি ওকে ঘুমতে দেয়নি অঞ্জলি। কেবল বলে দূর্বার চেহারা খুব সুন্দর, ওর চুলটা দারুণ
সুন্দর আর হেভি স্টাইল আছে এই কোঁকড়ানো চুলে। আজকাল সব মেয়েরাই হয় ফেদার কাট আর না হয় কারলিং
হেয়ার রাখছে। অবশেষে ক্লান্ত হয়ে একসময় নিজেই ঘুমিয়ে পরে। দূর্বা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। এখন সবচেয়ে
বড় চিন্তা সুমনকে বেড় করে আনা আর ওকে বাড়িতে এনে সারপ্রাইস দেওয়া।
বাবাকে দূর্বা আর ওর দাদার সাথে থানায় দেখে সুমন সত্যিই সারপ্রাইসড হয়ে যায়।বেলা তখন সাড়ে ন’টা। ছোড়দা
অফিসারকে সুমনের সার্টিফিকেট দেখাচ্ছে আর তার জেরক্স কপি জমা করছে। দূর্বা সুমনের দিকে তাকিয়ে মুচকি
মুচকি হাসছে। সুমনের বাবা গরাদের কাছে গিয়ে সুমনের মাথায় হাত রেখে বললেন,” কিরে, একবারও বাবা মার কথা
ভাবলি না সুমন ? তোকে ছাড়া থাকতে এই দুবছর আমাদের কত কষ্ট হয়েছে তুই জানিস ? তুই যেই লোকটাকে মেরে
ফেলেছিস ভেবে বাড়ি ছেড়ে পালালি সেই লোকটা আদৌ মরেনি রে। সে বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে। মাঝখান থেকে তুই
বোকার মত পালিয়ে বেড়াচ্ছিস।”
বাবার কথা শুনে আকাশ থেকে পরে সুমন। পিছনে দাঁড়ানো দূর্বার দিকে তাকায়। দূর্বা চোখ বুজে মাথা নাড়িয়ে বাবার
কথায় সন্মতি জানাল। সুমনের নিজের উপর রাগ হল যে এই একটা খবর না জেনে ও আজ দু দুটো বছর বাড়ি ঘর
ছেড়ে কি কষ্টটাই না করল। দূর্বার দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতায় ওর মন ভরে যায়, চোখ ছল ছল করে ওঠে। মনে মনে
ভাবে দূর্বা নিশ্চয়ই সেদিন ওর আলমারিতে রাখা মানিব্যাগে রাখা আধার কার্ড থেকে বাড়ির এড্রেস নিয়ে
বোলপুরে গেছে। আজ দূর্বা ওদের বাড়িতে না গেলে বাবা মার আর বোনের সাথে হয়তো কোনদিন আর দেখাই হত না।
কি জানি, হয়ত একেই বলে সত্যিকারের ভালোবাসা।

পুলিশ অফিসার একটা ফরমে কয়েকটা সই সাবুদ নিয়ে ছেড়ে দিলেন সুমন কে। জাইলো গাড়িটা থানার বাইরেই দাঁড়িয়ে
ছিল। সুমনের হাত ধরে সুবোধ মুখারজি সদর্পে বেড়িয়ে এলেন থানা থেকে। পিছনে দূর্বা আর ওর ছোড়দা অনীশ।
থানা থেকে বেড়িয়ে দূর্বা ওদের সবাইকে নিয়ে আসে সুমনের বাড়ি। ওরকম একটা গলির ভিতর টালির ছাত দেওয়া
একখানা স্যাঁতস্যাঁতে ঘরের মধ্যে গত দু বছর কাটিয়েছে সুমন, ভাবতেই সুবোধ মুখারজির চোখে জল চলে আসে।
দূর্বা রান্না ঘরে গিয়ে চা করে আনে সবার জন্য। সুমন জামাকাপড় পালটে নেয়। মনে মনে ভাবে এবার এই
বাড়িটাতেই ঘণ্টাদার নামে একটা দাতব্য চিকিৎসালয় খুলতে হবে।
এদিকে দূর্বাদের বাড়িতে তখন সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। ছোট মেয়ের হবু বর আসছে বলে কথা। অনীশের পরামর্শে
ওর স্ত্রী আর বন্যা বসে একটা বরন ডালা সাজিয়ে রেখেছে। দূর্বাদের জাইলো এসে থামল যখন তখন বেলা সাড়ে
দশটা বেজে গেছে। গাড়ি থেকে নামতে গিয়েই সুমন শুনতে পায় ভিতরে কারা যেন শাঁখ বাজিয়ে উলু দিচ্ছে। তখনো
অঞ্জলিকে দেখেনি সুমন, তবে দূর্বা বলেছে যে অঞ্জলি এসেছে ওদের সাথে।
গেটের ভিতরে ঢোকে প্রথমে অনীশ তার পিছনে সুমনের বাবা আর বাবার পিছনে সুমন আর সব শেষে দূর্বা।
অনীশের স্ত্রী বরন ডালা নিয়ে দরজা থেকে এগিয়ে এলেন। পিছনে দাঁড়িয়ে শাঁখ বাজাচ্ছে অঞ্জলি আর উলু দিচ্ছে
বন্যা। দূর্বা এসব দেখে অবাক হয়ে যায়। সবার শেষে ভিতর থেকে বড়দাও বেড়িয়ে এলো দেখে দূর্বা আরও অবাক
হল। অনীশই কাল দাদাকে সব জানিয়ে বলে দিয়েছিল সকালে চলে আসতে। দূর্বা ওর ছোড়দার দিকে তাকায় আর
ছোড়দা ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসে। সুমন এদিকে লজ্জায় পড়ে যায়। সুবোধ মুখারজি দরজার ধারে ক্রাচে
ভর দিয়ে দাঁড়ানো বেয়াইয়ের দিকে তাকিয়ে হাসছেন।
বারান্দায় দাড় করিয়ে রাখা হয় সুমনকে। দূর্বাকে ডাকা হয় সুমনের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। দূর্বা লজ্জায় লাল হয়ে
বউদির দিকে কটমট করে তাকায় পরেই ছোড়দা ওকে ধমক দিয়ে বলে,” এই দূর্বা, দাড়া এখানে বলছি। ইয়ার্কি
হচ্ছে না ? দাড়া দাড়া।“
বৌদি সুমনকে আর দূর্বাকে দুজনকেই বরন ডালা দিয়ে স্বাগত জানাল। অঞ্জলি ওর সেল ফোনে ফটো তুলে রাখল
মাকে দেখাবার জন্য। সুমন আর দূর্বা মাথা নিচু করে প্রণাম করে সবাইকে। বন্যা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে
সুমনের দিকে। এতো সুন্দর চেহারার একটা ভাল সৎ ডাক্তারকে বোন ভালোবাসে এটা দেখে ওর খুব ভাল লাগল।
সুমনকে এতদিন ও শুধু একটা সাধারন হকার ভাবত ? কিন্তু ও কৃতজ্ঞ, এই লোকটাই তো ওকে সেই রাতে বাড়ি
পৌঁছে দিয়েছিল। বন্যার খুব আফসোস হচ্ছিল যে সুমনের কথা কেন ও শুনল না সেদিন ?
খাওয়া দাওয়া হয়ে গেল পর সুবোধ মুখারজি ছেলে ছেলের হবু বৌ আর মেয়েকে নিয়ে রওনা দিলেন বোলপুরের
উদ্দেশ্যে। সবাইকে নিমন্ত্রণ করে গেলেন বোলপুরে আর বলে গেলেন ওখানেই দিন দেখে ওদের দুই হাত এক করে
দেবেন উনি। তখন ওদের সবাইকে বোলপুরে আসতে হবে। আর ততদিন দূর্বা ওনার স্ত্রীর জিম্মায় থাকবে। শুধু
বেয়াই মশাইকে বলে গেলেন,” জানেন বেয়াই, আমার বাগানে অনেক বড় বড় গাছ গাছরা আছে । কিন্তু এতো পবিত্র
দূর্বা আমার বাগানে নেই। তাই এই কলকাতা থেকে আপনাদের দূর্বাকে সাথে করে নিয়ে গেলাম। একে আমি আর
কাছ ছাড়া করতে চাইনা মশাই।“
সুমন গাড়িতে দূর্বার পাশাপাশি বসে কানে কানে বলল,”এবার তোমার প্রথম শর্ত মানতে পারব সোনা। আমাকে বিয়ে
করতে আর কোন শর্ত নেই তো ?“ দূর্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আর শান্তির হাসি হাসে। সুমনের গাল টিপে দিয়ে
চাপা গলায় বলে,” যাও, তোমাকে আমি আর কোন শর্ত দেবো না। তুমি পাশ করে গেছ।“
দূর্বার পাশে বসে অঞ্জলি লজ্জায় মুখ ঘুড়িয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকে।

------------শেষ----------



Comments

Popular posts from this blog

পিয়ালি দাসের লেখা

পারমিতা রাহা হালদারের লেখা

বীরেন্দ্র নাথ মহাপাত্রের ধারাবাহিক উপন্যাস