শ্যামাপ্রসাদ সরকারের উপন্যাস ভারত মঙ্গল



ভারত মঙ্গল 
⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜

 পর্ব-১
⚜⚜⚜⚜

পল্লীগ্রামের মাঘে মাসের শীতের তীব্রতা সর্বজনবিদিত। চাষের জমিগুলি ক্রমশ ভরে আসছে ফসলের উজ্জ্বলতায়। মনে হচ্ছে রবিশস্যের ফলন এ বছরটায় ভালোরই দিকে। নিজের মনেই একটা লাইন হঠাৎ  গুনগুনিয়ে উঠলো এক সাতাশ বছরের  যুবক - 'বাঘের বিক্রম সম মাঘের হিমানী '..অলঙ্কার শাস্ত্রটি সে ইতিমধ্যে ভালোই রপ্ত করেছে। সংস্কৃত, বাংলা, ব্রজবুলি, মৈথিলী আর ফার্সী শিক্ষায়ও তার কোনও ফাঁকি নেই । শুধু এবার জীবিকায় একটু স্থিতি হলে আপাতত সবটা রক্ষা হয়। ইতিমধ্যেই নিজের এই সদ্যযুবা বয়সে অনেক বিপ্রতীপ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে সে গেছে। এমনকি তার কারাবাসের স্মৃতিটিও প্রায় সাম্প্রতিকই। এত দোলাচলেও সে তার ভিতরের সরসতার কোন হানি হতে দেয়নি। বংশকৌলীন্য তারও নেহাত কম নয়, কিন্তু আজকের এই নিঃসম্বল অর্থহীনের সে অহঙ্কার আর সাজে না। যদিও সে নিজে এই সামন্ততান্ত্রিক নকল রাজাপ্রজা সেজে ঘুরে  বেড়ানো ব্যাপারটায় খুব একটা আগ্রহী নয়। বরং সাধারণ্যের ভীড়টিই তাকে বেশী টানে।  বাংলার আকাশে বাতাসে এখন রাজনৈতিক অস্থিরতা শুধু। তারই মধ্যে শাস্ত্রচর্চা আর মনোজ্ঞ কাব্যরচনা করে আত্মপ্রকাশের একটি সুপ্ত বাসনা তার। রাত্রির কালো তারা ভরা আকাশের তলায় দাঁড়িয়ে থাকল সে কিছুক্ষণ। মনটা আজ একদম বশে নেই। মনে হচ্ছে জীবনের দিনগুলি কেবল অপচয়ই হয়ে যাচ্ছে । রাত্রি ক্রমে গভীরতর হচ্ছে। দীনের কুটিরটি স্বাভাবিক কারণেই এখন  নিষ্প্রদীপ।  রাধা নামের তার বালিকা বধূটি আপাততঃ নিদ্রিতা। শয্যা ত্যাগ করে নির্ঘুম চোখে এই অনন্ত কালরাত্রির অবসানের প্রতীক্ষায় সে গভীর চিন্তায় মগ্ন। এখনো পর্যন্ত এক কাব্যমনস্ক, রসজ্ঞ, রুচিবান, স্বভাববৈরাগী এক ব্রাহ্মণ সন্তান, এই তার একমাত্র  পরিচয়। পিতৃদত্ত নামটি তার  'ভারতচন্দ্র'। 

⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜
এই বার একটু  তখনকার ভারতের ইতিহাসের দিকে চোখ রাখি।  সময়কালটি  বড়ই  অস্থির। সুজা খাঁর পুত্র সরফরাজ খাঁকে গিরিয়ার যুদ্ধে পরাজিত করে 'মহাবৎ জঙ্গ' নাম নিয়ে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার মসনদে নবাব আলীবর্দি খাঁ। দিল্লীর মুঘল অন্দরেও তখন 'তখত এ তাউসে'র দিকে রয়েছে শ্যেন পক্ষীদের ইতিউতি লোভী নজর। বন্দীদশায় বৃদ্ধ শাজাহান আগ্রাদূর্গে দিন গুনছেন মৃত্যুর, প্রিয়তম পুত্র দারাও নিহত, যুদ্ধে পরাজিত সুজা আরাকানে নির্বাসিত। ঔরঙ্গজেবের পথের শেষ কাঁটাটি হল এখন মুরাদ।  কটকের কাছে আলীবর্দির সাথে এই মুরাদের এক ভীষণ লড়াই হল ও মুরাদ যুদ্ধে হেরে দিল্লীর দিকে পিছু হঠলেন। পথের মধ্যেই ঔরঙ্গজেবের চরেদের হাতে ধৃত হলেন ও বন্দী অবস্থায় এলেন গোয়ালিয়রে। কদিন বাদে সেই দূর্গের বন্দীশালায় অকথ্য অত্যাচারের পর তাকেও জাহান্নামের রাস্তাটি সোজা  দেখিয়ে দিলেন  তার ভ্রাতা বাদশা আলমগীর। 

এদিকে  বাংলায় ততোদিনে  শুরু হয়ে গেছে মারাঠা দস্যু রঘুজী ভোঁসলে আর তার অনুগত সেনাপতি ভাস্করপন্থের দ্বারা সংঘটিত বর্গীর হামলা। পল্লীবাংলা তখন জ্বলছে এক নতুন মাৎসান্যায়ের আগুনে। আলীবর্দি এই ভাস্করপন্থকে কৌশলে হত্যা করলেও রঘুজী তাঁর কাছ থেকে কটক সহ উড়িষ্যা দখল করে নেন। বার লক্ষ তঙ্কা নজরানার বিনিময়ে  সেই জায়গীর উদ্ধারে তিনি সম্মত হন নদীয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের ভরসায়। কিন্তু তহশীলদার সুজন সিং এর বিশ্বাসঘাতকতায় নবাব শেষ পর্যন্ত কারারুদ্ধ হন। ঠিক সেই সময় কৃষ্ণনগরাধীশ কৃষ্ণচন্দ্রের কূটকৌশলে কোতোয়ালের দপ্তরে সামান্য উৎকোচের বিনিময়ে তিনি নবাবকে মুক্ত করেন ও মুর্শিদাবাদে অক্ষতদেহে ফেরৎ পাঠান।  আলীবর্দি তাঁকে সেই কৃতজ্ঞতাবশতঃ  'ধর্মচন্দ্র '  উপাধিতে বরণ করেন ও সেবারের মতো নদীয়ার রাজস্বটি মাপ করে দেন। এভাবেই কালের ইতিহাস তার আগম নির্গমের দাবার ছক সাজায় নিজের নিয়মে। সেই বারুদের দিনগুলির উত্তাপের মধ্যেই জন্ম নিল এই আশ্চর্য কবিপ্রতিভাটি। 

⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜

' ডিহি কলিকাতা 'এক আজব জায়গা বটে। রাস্তার দুধারে পূরীষবাহী কাঁচা নর্দমা। এখানকার আবহাওয়া মোটেও সুবিধার নয়। গ্রীষ্মকালে ভয়ঙ্কর গরম আর বর্ষাকালে ভীষণ কাদা হয়। এছাড়া সঙ্গে মশা- মাছিরও ভয়ঙ্কর উৎপাত। এরই মধ্যে শহরটা আস্তে আস্তে বদলাচ্ছে তার পূর্বতন চেহারাটা।  ২৫ নম্বর 'ডুমটোল্লা স্ট্রীটে'র একটি অংশে এক  বিচিত্রবেশী সাহেবের তাঁবু পড়েছে। সাহেবটি ইংরেজ নন, রুশী।  এই হেরাসিম লেবেদফ লোকটি বেশ আমুদে। সে এক এখানে এক অদ্ভূত জিনিসের আমদানী করেছে।  একধরণের যাত্রাপালার মত একটা সঙের আসর বসায় সে ফি রোববারে । নাচ -গান, পান -ভোজন সহ এই বিলিতি সঙের আসরটিতে আজকাল সাহেব সুবোদের ভালই ভীড় হচ্ছে। অপেরাটির শুরুতে সাহেব নিজে বিলিতি অর্গ্যান বাজিয়ে দুলে দুলে নেচে খানিক অঙ্গভঙ্গি করে আমোদ দেয়। তারপর দলেরই কয়েকজন ক্লাউন সেজে কিছুক্ষণ মাতিয়ে রাখে। শেষে হয় আসল নাটকটি।  ইংরেজদের সাথে সাথে দু একজন ইংরেজীজানা এদেশের ভদ্রলোকও আজকাল অবাক হয়ে এই বিলিতি ভাঁড়ামোটি  উপভোগ করতে আসেন। লেবেদফ  তাঁর আসরে নেটিভরা আসলে খুশীই হন। এদের সহজ সরল স্বভাবটি নিজে বেশ উপভোগ করেন। তিনি দেখেছেন নেটিভরা  সমাজে  নিজেদের  মধ্যে ছোঁয়াছুঁয়ি নিয়ে বড্ড বাছবিচার করে। আবার তারাই যে কোন সাহেব দেখলে
স্রেফ সাদা চামড়ার দরুণই  একটু ভয় মিশ্রিত সমীহ করে দূরে পালায়। আসর চলাকালীন ভিখু নামের এক বোবাকালা কিন্তু দৈত্যাকৃতির বিহারদেশীয় পাহারাদার পিতল বাঁধানো লাঠিহাতে পাহারা দেয়।
 কলকাতায় ইংরেজদের সুবিশাল কেল্লাটির কাছেই  গঙ্গাতীরটি কিন্তু বেশ মনোরম। তিনি মাঝেমধ্যেই এখানে বেড়াতে আসেন । নদীটিকে দেখলে তাঁর ভোল্গার কথা মনে পড়ে যায়। মনে পড়ে তাঁর স্বদেশকে। হিন্দুরা এই নদীটিকে খুব পবিত্র চোখে দেখে।  লেবেদফ তার মধ্যেই দেখতে পান সেই পবিত্র নদীর জলেই কখনো কখনো অর্ধদাহ্য মানুষের মৃতদেহ ভেসে যাচ্ছে আর সেই মৃতদেহর ওপর কি বিচিত্ররূপী একপ্রকার স্টর্ক জাতীয় পাখি সেটা থেকে নরমাংস খুঁটে খুঁটে খেতে খেতে নৌবিহারের মত ভেসে চলছে একপাড় থেকে অন্যপাড়ে। নেটিভরা এই পাখিগুলোকে বলে 'হাড়গিলে' পাখি। 

তাঁবুতে ফিরেই গড়গড়া টানতে টানতে বিছানায় আদুরীকে কাছে টানলেন লেবেদফ। দশ সিক্কা দিয়ে জিঞ্জিরাবাজার থেকে তাকে কিনে এনেছেন বেশ কিছুদিন হল। এদেশে ফিরিঙ্গী মেয়ে দূর্লভ।তাই অনেক ইউরোপীয়ই পরিবর্ত হিসাবে দেশী বিবি রাখাটাই সহজ বলে তাতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। এই মেয়েটি সম্ভবতঃ বোধহয় নীচুজাতির। কিন্তু তার দেহবল্লরীটি যথেষ্টই উত্তেজক। এখানকার মেয়েরা গায়ে জামা রাখেনা। শাড়িটিকেই তারা গায়ে পেঁচিয়ে লজ্জ্বা নিবারণ করে। আদুরীও তার ব্যতিক্রম নয়। মেয়েটির বয়েস কম তায় গড়নটিও বাড়ন্ত।  গায়ের রঙটি কালো হলেও তার মুখশ্রীতে একটা অদ্ভূত মাদকতা আছে । চেহারাটি দোহারা ও কমনীয়। এইবয়সেই তার স্তনযুগল বেশ বর্তুলকার ও ভারী। এমনকি কোমরের নীচের অংশের গড়নটিও বেশ চটকদার। তাদের বিপরীত বিহারে রতিরঙ্গের সময় হঠাৎ দেখলে শ্বেতপাথরের মহাদেবের উপর উপবিষ্টা উলঙ্গিনী কালীর উপমাই মনে আসে। অর্থোপার্জনের তাগিদে স্বদেশ থেকে এত দূর বিদেশে এসে প্রবৃত্তি নির্বাপণের স্বার্থে এই স্বাদু রমণীটির আসঙ্গ সাহেবের বড় পছন্দ। আর আদুরীও তার সাহেবের সাথে নিত্যদিনের রসরঙ্গটিকে বেশ লাস্যের সাথেই উপভোগ করে বলে মনে হয়।

বিকেলের দিকে তাঁবুতে গোলকনাথ এল। বেঁটে খাটো চেহারার গম্ভীর মেজাজের এক মানুষ সে। লেবেদফ এঁর কাছেই আজকাল বাংলা, ফার্সী আর  সংস্কৃত শিক্ষা করছেন। কদিন আগেই ম্যঁলিয়েরের একটি নাটক 'লাভ ইজ দ্য বেস্ট ডক্টর' অভিনয় করিয়েছিলেন  কিন্তু সেটা মোটেও জমেনি। লেবেদফের দলে এখন সাকূল্যে আটজন অভিনেতার সবাই ফিরিঙ্গী। ইসাবেলা নামের এক এলিট সোসাইটি- নচ গার্ল যে আদতে কোম্পানির  হোমরাচোমরা সাহেবদের বিনোদনকারিনীই মূলতঃ, তাকেই প্রয়োজন পড়লে ভাড়া করে নামাতে হয় কোনও গুরুত্বপূর্ণ নারীচরিত্র থাকলে। কদিন আগে পোর্শিয়া চরিত্রে অভিনয়ের সময় সে মাঝপথে সংলাপ ভুলে গিয়ে একটা বিশ্রী ব্যাপার ঘটিয়েছিল। ইসাবেলা খুবই উদ্ধত স্বভাবের। রূপের চটকের সাথে সাথে সে গান আর অভিনয় জানে বলে ধরাকে সরা জ্ঞান করে। আসলে নিয়মিত মহলায় না আসলে অভিনয় ঠিক করে  নাটকটা সার্থকভাবে মঞ্চস্থ করা মুশকিল। অথচ বিলিতি নাটকে মেমসাহেবের পার্ট থাকলে তাকেই তোয়াজ করে চলতে হয় । লেবেদফ বোঝেন যে উপযুক্ত দেশীয় কাহিনীর অভাবেই স্থানীয় আমজনতার এই স্টেজের প্রতি আকর্ষণ জাগানো যাচ্ছে না । অথচ ঢপ, খেউড়, যাত্রা এমনকি কবিগানের আসরেও ভালই লোকে ভীড় করে। লেবেদফ ভাবলেন গোলকনাথকে জিজ্ঞাসা করে দেখবেন, যদি কোনও ভাল দিশি মেটেরিয়ালের কথা সে যদি বলতে পারে। একথার দুদিন বাদেই তার তাপ্পিমারা  ঝোলার ভেতর থেকে গোলক একটি বই করে দেখায়। বলে  ' এইটে একবার চেখে দেকতে পারেন সায়েব ! বড় সরেস বইখানা। শ্রীরামপুরের সায়েবরাও আজকাল এসব  বই  ছাপচে! ' কিছুটা বিস্ময় নিয়ে  ভ্রূকুঞ্চিত লেবেদফ বইখানার দিকে হাত বাড়ান ।

" OONOODAH MONGUL
Exhibition the tales of
BIDDAH AND SOONDER.
To which Added 
The Memoirs of Raja Prutupa Ditya
Embelled with six cuts.Calcutta :From the Press of Ferris, 1816"

গোকুলকে সেদিনের মত জলদি বিদায় করে লেবেদফ বইটি সাথে করেই বিছানায় গিয়ে গা এলিয়ে দেন। আজ সারাদিন ধরেই খুব বৃষ্টি। একটা শিরশিরে ঝোড়ো হাওয়ায় কেমন যেন শীত শীত করছে। আদুরী তড়িঘড়ি  এসে তাঁবুর ভিতরে সেজবাতিগুলো  জ্বালিয়ে দিয়ে গেল। সে এখন খাবার বানাতে বসবে। এইসময় সাহেবের কাছে সেও কিছুক্ষণ ভিড়বে না।  পড়াশোনা করার সময় তার সাহেব একেবারে অন্য মানুষ হয়ে যায়। ওদিকে গড়গড়া টানতে টানতে বইটিতে ক্রমশ ডুব দেন লেবেদফ। 

আহা! কি অদ্ভূত কাহিনীর বিস্তার আর নাটকীয় মোচড়। 

" Having heard an account of Beedyaa from the mouth of Bhaat/The inclinations of Soondor boiled vehemently..."

ভাটমুখে শুনিয়া বিদ্যার সমাচার।
উথলিল সুন্দরের সুখ -পারাবার।।

এই নতুন কাব্যটির কবিটির নাম 'ভারতচন্দ্র !' ক্যালকাটায় এরকম একটি অসাধারণ লিরিক্যাল ব্যালাডধর্মী সাহিত্য  অবহেলায় পড়ে আছে তা লেবেদফ বিশ্বাস করতেই পারেন না। স্থির করেন আগামী দু' তিন সপ্তাহের মধ্যে বিদ্যা-সুন্দর ই হবে তাঁর পরের নাটক। নায়িকার ভূমিকায় এবার আর কোনও ফিরিঙ্গি নীলনয়না নয়। 'বিদ্যা' সাজবে তাঁর প্রিয়তমা আদুরী-ই।

⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜

শেষরাত্রিতে ভারত একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল। দিনু বৈরাগীর  বৈতালিকের  খঞ্জনীর টুংটুং শব্দে ঘুম ভাঙতেই সে বিছানা ছেড়ে উঠোনে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। শীতের কুয়াশার চাদরে এখন সবদিক আচ্ছন্ন হয়ে আছে। এত ভোরেও বদনচাঁদ খেজুরের রস ভরা হাঁড়ি গাছ থেকে নামিয়ে ঠিক বাঁকে করে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে। ভারতকে সামনে দেখতে পেয়ে বলল - 'একপো রস দেই দা ঠাউর! জিরেন কাঠি ডুবকি তোলা ! খুব মিঠে'। ভারত ইষ্টনাম জপ করার আগে কোনও কিছুই জিহ্বাগ্রে  স্পর্শ করেনা। তবুও এই কূয়াশাচ্ছন্ন ঊষাকালে সুমিষ্ট 'রস' শব্দটি মনের মধ্যে অনুরণিত হতে লাগল। হাত নেড়ে না'বাচক ইঙ্গিত করে সে মুগ্ধদৃষ্টিতে মৌন হয়েই নবীন ভোরটির কলুষমুক্ত স্নিগ্ধ রূপ অন্তর দিয়ে উপভোগ করতে থাকলো।

রামচন্দ্র মুনশীর কাছে ফার্সী শেখা এখন ভারতের শেষের পথে। দেবানন্দপুরের এই শান্ত পল্লীগ্রামের পরিবেশটি তার বেশ ভালই লাগে। গ্রামটিকে ঘিরে আছে একটি বিশাল দিঘি, নাম কুঞ্জসায়র, দিব্যি গাছগাছালি ঘেরা তার চারপাশ আর কাকচক্ষু নির্মল টলটলে জল। দিঘিটি বঙ্গাধীপ লক্ষ্মণসেনের আমলের। এর দুপাশে সেই আমলের  পোড়ামাটির দ্বাদশ শিবমন্দিরটি এখনো অক্ষত। জ্যৈষ্ঠমাসে এইখানে ধর্মরায়ের  গাজনের মেলা বসে। এছাড়া  আছে আদিগন্ত বিস্তৃত প্রচুর সুফলা ধানীজমি আর  তার ভিতর দিয়ে এঁকে বেঁকে বয়ে যাওয়া  মেটে রঙা  আলপথ । ভারত তার সদ্যোন্মীলিত কাব্যপ্রতিভার সহজিয়া দৃষ্টি মেলে এই শ্যামবঙ্গপ্রকৃতির রূপসুধা পান করতে বড় ভালবাসে। 

⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜
মুসলমান শাসকদের অসহিষ্ণুতাহেতু এখন সংস্কৃত টোলগুলিতে আগের মত ছাত্র
 হয়না বরং অনেক হিন্দু শিক্ষিত মানুষ মোক্তব খুলেছে। অর্থোপার্জনের জন্য আরবী আর ফার্সী জানাটাই এখন দস্তুর। আজকাল দেওয়ানী বা কাছারিতে একজন সামান্য গোমস্তাকেও এই দুটি ভাষায় দখল রাখতে হয়। ভারতের খুব শীঘ্রই  একটি সেরেস্তার কাজ জোগাড় করা আশু প্রয়োজন। যদিও বংশগৌরবের নিরিখে তার রাজা হওয়ারই কথা। ভারতের পূর্বপুরুষ ভরদ্বাজ গোত্রীয় ফুলিয়ার বিখ্যাত নৃসিংহ মুখুটির বংশাবতংশ সদানন্দ রায়। সেই সুপ্রতিষ্ঠিত ভূরসুট রাজবংশের রক্তই তার ধমনীতে বিদ্যমান। বিস্ময়ের ব্যাপার  বাঙালীর ইতিহাসে এই বংশেরই শাখায় আরও দু'টি মানুষের নাম একই সাথে বিখ্যাত ও কূখ্যাতির জন্য স্মরণীয়। বিখ্যাতজনটি হলেন ফুলিয়া নিবাসী  শ্রীরাম পাঁচালির কবি কৃত্তিবাস ও অন্যজন হিন্দুমন্দির ধ্বংসকারী রাজীবলোচন, যিনি অবশ্য কালাপাহাড় নামেই বেশী পরিচিত। 

ভারতের পিতা নরেন্দ্রনারায়ণ বর্ধমানরাজ কীর্তিচন্দ্রের থেকে একশো বিঘা জমি ইজারা নিয়েছিলেন একসময়।  দেওয়ান রাজবল্লভের পরামর্শে  সেই জমি হঠাৎই  খাসভুক্ত করা হয় তাঁকে না জানিয়েই। এ নিয়ে বিবাদ উপস্থিত হলে তিনিও  করদানে অসম্মত হন। কীর্তিচন্দ্র একই সাথে সপুত্রক নরেন্দ্রনারায়ণকে রাজ্যচূত ও কারারুদ্ধ করেন। সেই থেকে ভারতের কপাল থেকে রাজতিলকটি চিরঅন্তর্হিত হয়েছে। কারাবাসের দিনগুলি ভারতের কাছে দুঃস্বপ্নভরা রাত্রি যেন। 

কদিন হল একটি নতুন ছন্দে একটি সত্যপীরের পাঁচালি লেখা সে আরম্ভ করেছে । ছন্দটির নাম চৌপদী। সত্যপীর দেবতাটি আসলে হিন্দুর সত্যনারায়ণ আর মুসলমানের পীরের বর্ণসঙ্কর আরাধ্য দেবতা। একালে দুইধর্মের মানুষই এই দেবতাটিকে পুজো করে থাকে। সেই সত্যপীরকেই উপজীব্য করে কয়েক ছত্র পাঁচালী রচিত হয়েছে তার কলমে। সূচনার ভণিতাটি পড়তে বেশ সুললিত শোনাচ্ছে নিজের কানেই,

" ভরদ্বাজ অবতংস/ভূপতি রায়ের বংশ/
সদাভাবে হতকংস/ভূরসুটে বসতি/নরেন্দ্র রায়ের সুত /ভারত ভারতী যুত/ফুলের মুখটি খ্যাত/দ্বিজপদে সুমতি...."

রাধার বয়স সবে ষোল। এগারো বছর বয়সেই ভারতচন্দ্রকে সে স্বামী হিসাবে পেয়েছে। কিন্তু তার বিয়ের প্রথম ক'টি বছর বেশ কেটেছে দূর্যোগপূর্ণ। বর্ধমান রাজের চক্রান্তের জেরে ভারতের কারাবাস তার পতিসুখ উন্মেষের বাধার কারণ হয়েছিল। । কারাগার থেকে কৌশলে মুক্ত হয়ে ভারত অনেকমাস যাবৎ আত্মগোপন করে শঙ্করাচার্যের শৃঙ্গেরী মঠে কিছুদিন ভ্রামণিক হয়েই কাটিয়েছে। সেখানে আচার্য সর্বানন্দ পুরীর কাছে নিয়মিত সংস্কৃত শিক্ষায় তার পূর্বতন বিদ্যায় 
পড়েছে পরিশীলিত প্রয়োগের ছাপ। মুদ্রারাক্ষস,  রঘুবংশম্,
অমরুশতক,গাথাসপ্তসতী প্রভৃতি প্রাচীন সংস্কৃত কাব্য ও নাটকের  মূলপাঠ্যগুলোর সাথে পরিচিত হবার ফলে তার ভাষাবৈদগ্ধ ও শব্দঝংকার ভারতকে বাগবৈখুরী ও অলংকার শাস্ত্র ব্যবহারে পটু করে তুলেছে। আবার মুনশীর কাছে এই ক'মাসেই  যবনাভাষা দুটিও তার ভালই আয়ত্ত হয়েছে বলা যায়।

রাধাও এদিকে ধীরে ধীরে যুবতী হয়ে উঠছে। বালিকার খোলস বদলে ক্রমশ এক অচেনা নারীতে যেন নিত্যই সে প্রকাশিত হচ্ছে। ভারত তাকে আড়াল থেকে লক্ষ্য করে। হাত উপরে তুলে কাঠের কাঁকই দিয়ে তার চুল আঁচড়ানোর সময় তার কুমারসম্ভবের লাইনগুলো মনে পড়ে যায়। শৃঙ্গার রসটিকে বঙ্গদেশে এখনো ব্রাত্য করে রেখেছে পন্ডিতজনেরা। অথচ এই শ্যামলিমা বিধুর বঙ্গললনাটির মধ্যে মধুররসের পূর্ণ প্রকাশ সে দেখতে পায় সততই। বৈষ্ণবপদাবলীর দেহাতীত প্রেমটি মানতে তার মন চায়না। ভারতের মতে প্রেমের আধার হল দেহই। তাকে অস্বীকার করলে পূর্বরাগের দর্শন, শ্রবণ আর স্পর্শনের শিহরণটিই চলে যায়। যদিও দেবদেবীর বাইরে এই প্রেম জিনিসটিকে মেনে নেবার মত সমাজ আজও পরিণতমনস্ক নয়। খুব গোপনে এমনকি অমর্যাদার সাথেই দেহবিনিময় করেই সবাই বাইরের শুদ্ধাচারণরীতিটিকেই প্রশ্রয় দেয়। এই বিকট দ্বিচারিতাটি ভারত মনে মনে মানতে নারাজ। অথচ একসময় এই দেশেই প্রাচীনকালে মদনোৎসব পালিত হত। সেখানে রতিশাস্ত্র ও রতিকান্ত দুজনেই অগ্রাধিকার পেত সসম্মানে।

 ভারতের খুব ইচ্ছা করে তার মাতৃভাষা বাংলাতে একটি মধুর রসের আখ্যান রচনা করার। সাধারণ নরনারীই হবে তার আধার, দেবকল্প নয়। জাগতিক দোষত্রুটি মুক্ত আদর্শ মানুষের নীতিগাথার  পরিবর্তে প্রেম আর তার সঙ্গে দ্বেষ, লালসা আর বিরহই হবে সেই কাব্যটির উপজীব্য। 
 কিন্তু তার আগে চাই একটি স্থির জীবিকার সংস্থান। 'অন্নচিন্তা চমৎকারা' মাথায় নিয়ে কাব্য রচনা করা বড় কঠিন। সে জানে রাধা'র পরিধেয় শাড়িগুলি বহু ব্যবহারে এখন জীর্ণ। অনেক জায়গায় রাধা গ্রন্থি দিয়ে বেঁধে সেই ছিদ্রগুলি হাসিমুখে আড়াল করে।  ভারত নিজের স্ত্রীকে এটুকু স্বচ্ছলতা এতদিনেও দিতে অপারগ সেই  অক্ষমতাটিকে একটা চাপা অসন্তোষের মতো সর্বদা  বুকে চেপে ঘোরে বা নির্জনে কুঞ্জসায়রের পাশে এসে বসে থাকে। কখনো সেই নিভৃতি ভঙ্গ করে একটি গোসাপ সড়সড় আওয়াজ করে শুকনো পাতার স্তুপ মাড়িয়ে আবার কোনো ঝোপের ভিতর লুকিয়ে যায়। 

পর্ব (২)
⚜⚜⚜⚜

সামান্য নালিশাকভাজা, চুনোমাছের চচ্চড়ি, আর মানকচু বাটা সঙ্গে একটু তেল আর কাঁচা লঙ্কা, এই সামান্য আয়োজনটুকুই পরিপাটী করে রাধা ভাতের সঙ্গে সাজিয়ে স্বামীকে পরিবেশন করে। এতকটি ছোট ছোট পদের সমাহার হলেও তার মোট পরিমাণ অবশ্য বেশী নয়। ভারতের ভুক্তাবশেষ যেটুকু থাকে তাতেই রাধা হাসিমুখে চালিয়ে নেয়। ভারত তা আন্দাজ করে আগে থেকেই খানিকটা খাবার রোজই সরিয়ে রাখে কোন না কোন অছিলায়। পত্নীটির এই নির্ভেজাল সহনীয়তাটুকুই আজ দুর্দিনে ভারতের সম্বল। তার শরীরে বয়ে চলা রাজরক্তের বিলীয়মান অভিধা শুধু তার গ্রামের যদুনাথ ঘটকের মুখেই মানায়, বাস্তবে সে ও রাধা যে প্রায় অর্ধাহারীর জীবন কাটাচ্ছে তার খবর কেই বা রাখে? যদুনাথ অবশ্য ভারতকে আরো একটি বা দুটি বিবাহের জন্য নিয়তই মন্ত্রণা দেয়। কূলীন ব্রাহ্মণের বিবাহই শ্রেষ্ঠ জীবিকা যখন, তখন তাই করলে অর্থোপার্জনের সাথে সাথে  নারীসঙ্গের প্রাচূর্য্যলাভের পথটিও অবারিত হয়ে যাবে। 

কিন্তু রাধার নিশ্চুপ আত্মত্যাগটি মনে পড়লেই ভারত সেই পরিকল্পনাকে মন থেকে সঙ্গে সঙ্গে দূর করে দেয়। রাধাকে সে স্বাচ্ছন্দ্য না দিতে পারলেও সংসারে সে সতীন এনে তার সেই সহিষ্ণুতার অপমান করতে সে অক্ষম। সে খুব আশাবাদী হয়ে রোজই একবার করে ভাবে তাদের জীবনে সুদিনটি এবার  সমাসন্ন। 

কচি বাঁশের কঞ্চি কেটে এনে সে যত্ন করে তিন চারটি কলম কালকেই বানিয়ে রেখেছে। আর তার শিক্ষক রামচন্দ্র মুনশীর কাছ থেকে যোগাড় করেছে কিছু শুকনো তালপাতা আর কেয়া খয়ের। কলাপাতার সাথে কেয়াখয়ের পুড়িয়ে তাতে সামান্য তেল মিশিয়ে এবার তৈরী করতে হবে কালি। তারপরই সে নতুন কাব্যটি লিখতে বসার সুযোগ পাবে। 
তার এই রচনাগুলোর আগামী ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই কাজ করছে না। তবু নিজের সৃষ্টির মধ্যে একটা অনাবিল আনন্দ আছে সেটা তো মানতেই হবে। তাই লেখালিখির কাজটা সে বেলা থাকতে থাকতেই সেরে রাখে। সন্ধের পর প্রদীপ জ্বালতে গেলে আজকাল বুঝেশুনে জ্বালতে হয়। দূর্ভাগ্যের বিষয় এই যে ভারতের নিশ্চুপ স্তব্ধ রাত্রিকালেই লিখতে মন চায়, কিন্তু তখনই তার গৃহটি সাধারণতঃ নিষ্প্রদীপ থাকে বেশীর ভাগ দিন। এবারে ভারত ঠিক করেছে সে শেষবারের মত কৃষ্ণনগর বা নবদ্বীপ কোথাও একবার গিয়ে কাব্যচর্চার অনুকূল জীবিকা ফলপ্রসু করতে চেষ্টা করবে ।তার ফল যদি বা নিতান্তই  ব্যর্থ  হয় তবে আর  সময় অপচয় না করে তৎক্ষণাৎ  নবাবের কোতোয়ালীতে আমিন বা লিপিকারের চাকরির জন্যে মূর্শিদাবাদে গিয়ে হত্যে দেবে। ওখানে অবশ্য নিজামতকে ঘুষ না দিলে তাও জোগাড় করা সম্ভব হবে না! সেটুকু প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা রাধার সামান্য যেকটি গহনা আছে তা আপাতত বিক্রি করেই যেভাবে হোক করতে হবে। অর্থহীন দারিদ্রে জীবনধারণ কঠিন শুধু নয় কাব্যপ্রীতিও অবান্তর।

রাজমহল পাহাড় বাংলা আর বিহারকে ভৌগলিকভাবে আলাদা করলেও তা যৌথভাবে মূলতঃ 'সুবাহ্ বাংলা'র ই অন্তর্গত হয়ে আছে সেই সম্রাট আকবরের যুগ থেকেই। নদীমাতৃক ও কৃষিভিত্তিক এই গাঙ্গেয় সমভূমিটি যেমন উর্বর তেমনই এখানকার মানুষজন প্রকৃতিগতভাবেই কোমলস্বভাবের। নৌবহরে এরা পারদর্শী হলেও স্বভাবগত কারণেই স্হলযুদ্ধে  উদাসীন। এখানকার আকাশে বাতাসে বরং কান পাতলে মাঝিদের গলার সুশ্রাব্য ভাটিয়ালী আর বাউল -ফকির- বোষ্টমদের গলায় মোর্শেদী বা ভক্তিনামরসের লীলায়িত গানের আখরই বেশী ধ্বনিত হয়। সুজলাসুফলা এই বঙ্গের অনেকেই বেশ জনপ্রিয় পদকর্তাও বটে।  মুকুন্দরাম, কৃত্তিবাস, কাশীরাম তো আছেনই আজকাল আবার দাশরথি রায় নামের এক পাঁচালিকারও বেশ জনপ্রিয়। বর্গীদের আক্রমণ কেটে যাওয়ার দু'দশক পড়ে পল্লীজীবন এখন আপাত নিরুপদ্রব বলে দাবা ও পাশা খেলা, বারোমাসের ব্রতকথা আর সম্বৎসরের চাষ আবাদ নিয়েই এখন লোকে মেতে থাকে।

শঙ্করী বলে এক পাটনীর সাথে ভারতের সম্প্রতি বেশ ভাব হয়েছে। নিচুজাতীয়া এই স্ত্রীলোকটির স্বামী একেবারে পুরাণবর্ণিত মহেশ্বরের প্রতিরূপ। গ্রামের শ্মশানঘাটের একদিকে তার চালাঘরটি প্রায় নিশ্চিহ্নমান। আগামী বর্ষা অবধি তা কোনোভাবেই টিকবে না। দিবারাত্রি সে ভাঙ আর গাঁজায় ভোঁ হয়ে থাকে। সংসারের কোন কাজেই সে লাগেনা অথচ তারই মধ্যে সে আবার দুটি শিশু কন্যা ও দুটি শিশুপুত্রের জনকও। সর্বদাই সে আরও দুটি গাঁজাখোর সাথী জুটিয়ে দিবারাত্র নেশা করে আর অর্ধনিমীলিত চোখে চেয়ে শঙ্করীকে সমানে  গালি পাড়ে। শ্মশানসংলগ্ন সামনের ঘাটটিতে শঙ্করী ঠিক দশভূজার মত সংসার সামলে একটি  ডিঙি নৌকায় যাত্রীপারাপার করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে । ভারত এই পৃথিবীতে তার একমাত্র  মনের মানুষ যেন।  কি এক অজানিত কারণে সে তার সুখ দুঃখের কথার সব ঝাঁপি টুকু একমাত্র ভারতের কাছেই সময়সুযোগ পেলে খুলে বসে। এই ভাবুক তরুণ সুদর্শন ব্রাহ্মণটিকে সামনে দেখলে তার মনে সবসময় চিত্তচাঞ্চল্য ঘটে। কোন সামাজিক বাধা বা বর্ণবৈষম্য সেখানে ঠাঁই পায় না। ভারত ও সমানভাবে তার সঙ্গটি উপভোগ করে। পাটনীটি সুন্দরী ও রসিকা। দারিদ্র তার রূপচর্চায় মলিনতা আনলেও তার চোখদুটি বাঙ্ময় ও মুখের হাসিটিও ভারী মধুর। ভারতের সাথে আজকাল ছোট বড় নানা কারণে সে আবার বিচিত্র ভঙ্গীতে মান প্রদর্শন করে। ভারত তার মান ভাঙাতে হাসিমুখে  সুমিষ্ট কন্ঠে তাকে কাছে ডেকে নেয় কখনো বা বুকে জড়িয়ে ধরে ছোট্ট একটি চুম্বন এঁকে দেয় সেই চপলার সরস ওষ্ঠে।  

নীচু জাতের কারণে  সাধারণতঃ ব্রাহ্মণরা তার ডিঙিতে বেশী চড়ে না। ভারত অবশ্য এসব জাতবিচার নিয়ে মাথা ঘামায় না।  মাঝেমাঝেই  সে আদি সপ্তগ্রাম বা গুপ্তিপাড়া অবধি শঙ্করীর ডিঙিতে চেপেই ঘুরে আসে। উদাসী হাওয়ায় তার উত্তরীয়টি হঠাৎ উড়ে গেলে উন্মুক্ত ঈষৎ তাম্রাভ সুতনুটি চোখের সামনে দেখতে পেয়ে সেদিকে অপলক মুগ্ধদৃষ্টিতে শঙ্করী চেয়ে থাকে। তার স্বামীটি বৃদ্ধ ও নেশাগ্রস্ত। চারটি সন্তানের জননী সে, তবুও পঞ্চশর  কখনো কখনো তাকেও বিদ্ধ করে। 

জোয়ারের জল বাড়লে নদীর জলে রোদ্দুর পড়ে কোথাও ঝিকমিক করে কোথাও বা জলের  চিকমিক করা দেখতে দেখতে ভারতের মনেও শব্দতরঙ্গের ঝংকার ওঠে - " লটাপট জটাজুট সঙ্ঘট্ট গঙ্গা/ ছলচ্ছল কলক্কল টলট্টল্  কলক্কল্    তরঙ্গা.."

সাতটি দিনের পরিশ্রমে ভারত একখানি মধুর রসের আখ্যান 'রসমঞ্জরী' লিখেই ফেলল। সংস্কৃতে বাৎসায়ন ও কোকশাস্ত্র সে আগেই পাঠ করেছিল বলে সেই ধ্রুপদী শৃঙ্গারভাবটি অতি সহজেই বাংলায় নতুন আঙ্গিকে দ্বিপদী বা  ত্রিপদীতে মিলিয়ে সে লিখে ফেলতে পারলো।  ভারত এযাবৎ দুটি উদ্ভিন্নযৌবনা রমণীর সুখ সান্নিধ্য লাভ করেছে। একজন তার ভার্যা অন্যজন সেই খেয়া পারাপারকারিণী শঙ্করী। স্বকীয়া ও পরকীয়া এই  দুইপ্রকার রসবিচারই তার পদগুলিতে যেন দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল। শঙ্করীর সাথে  নৌযাত্রার নিভৃত অবকাশে খোলা প্রকৃতির বুকে  উদ্দাম মিলনখেলার পরিণতি পেল এক আদিম জলছবিতে; 

"ত্রিবলি ডোরেতে বান্ধি অনঙ্গ/কটিতটে থুয়্যা দেখরে রঙ্গ..."   

আবার তপ্ত শীতলপাটিতে গার্হস্থ্য রতির মূর্ছনাও সিঞ্জিত হয়ে পেল স্বোপার্জিত অভিজ্ঞতায় জারিত পঙক্তিমালায়। 

" নিদ্রার আবেশে/রজনীর শেষে/মনোহর বেশে/বঁধু আসিয়া/প্রেম পারাবার/করিল বিস্তার/নাহি পাই পার/যাই ভাসিয়া/
যে রস হইল /মনেতে রহিল/যেকথা কহিল/ মৃদু হাসিয়া! ধরম করম /সরম ভরম /নরম মরম/গেল নাশিয়া ! "  

⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜

  লেবেদফ সারাটা দুপুর বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছেন। নেটিভ কবিটির লেখায় মজে গেছেন পুরোপুরি। সেন্ট পিটার্সবার্গের আর্চপ্রিস্ট  বন্ধুবর  সামবর্কস্কি কে উচ্ছ্বসিত হয়ে চিঠি লিখতে বসলেন -"  I also translated from books extracts of heroic poetry written by Bharat Chandra Ray, the glorious light of Hinduism,who with an oderly division of the parts wrote so sweetly, pleasingly, clearly and truthfully that many people committed them to memory in order to be able to be just service in language tests."
 
কদিন আগেই নিমতলার দিকে বেড়াতে গিয়ে বছর ষোলো'র একটি ছেলেকে  বটগাছের তলায় বসে গান গেয়ে ভিক্ষা করতে দেখেন। ছেলেটি ভিখারি হলেও তার চেহারাটি কিন্তু সুশ্রী আর গানের গলাটি অতি সুশ্রাব্য।  সাহেব খুব  উৎসাহের সাথে দু'দন্ড দাঁড়িয়ে তার গলায় কালীকীর্তনটি শুনে একেবারে মোহিত। চারটি পয়সা চাপকানের জেব থেকে ঝনাৎ করে  তার থালায় ফেলতে দ্বিধা করেননি ।  আহা, এরকম একটা  ছেলে জোগাড় হলে 'সুন্দরে'র ভূমিকায় অভিনেতা খুঁজতে আর বেগ পেতে হয়না। গান শুনে ফিরে যাচ্ছিলেন, হঠাৎই লেবেদফ তার কাছে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসেন। ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলেন -   " হেই বয়! হামি ড্রুমটুলাটে ঠাকি!  টুমি হামার প্লে টে গান গাইবে? এক্টিং করিবে? হামি খাবার দিবে ! পোষাক দিবে ! টাকাও দিবে ! টুমি যাইবে? "

একটা ঢিলেঢালা চাপকান পড়া সাহেব তার দিকে ফের এগিয়ে আসতে দেখে ছেলেটা প্রথমে ছুটে পালাতে যাচ্ছিল। কিন্তু 'খাবার দিবে' কথাটা শুনে পেটের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। শুধুমাত্র জল খেয়ে সে এই নিয়ে তিনদিন উপোস রয়েছে। তার বাপ মা কেউ নেই। মামার একটা তামাকের গুদামে সে কুলির কাজ করতো। সামান্য খাবারের বিনিময়ে বাড়তি যেটা জুটত তা হল মামীর গঞ্জনা আর মামার বেদম মার। থাকতে না পেরে সে পালিয়েছে বাধ্য হয়ে। গোবিন্দপুরে তাদের নিজেদের ছোট্ট একটা বাড়ি ছিল শীতলা মন্দিরের কাছে। তার লাগোয়া ছিল তার বাপের একটা ফুলের চালা দোকান। সে বাপের কাছেই  মালা গাঁথতে  শিখেছে কোন ছোটবেলায়। গানও তাই। তিনদিনের ভেদবমিতে বাপ, মা আর বোনটা চোখের সামনে ছটফট করে মরে গেল। মামা অবশ্য ঠিকসময়ে না এসে পৌঁছলে সেও হয়তো কদিন বাদে মরতোই।  

সাহেব যে প্রায় মিনতির সুরে তাকে কোথাও একটা  নিয়ে যেতে চাইছে সেটা সে বুঝতে পেরেছে। শুধু গান গাইলে টাকা আর খাবার দুটোই পাওয়া যাবে?এটা বড় আশ্চর্যের! কিন্তু সে তো দু একটা কালীকীর্তন ছাড়া অন্য কিছু গান জানেনা ! 

ছেলেটির নাম রতন। তাঁবুতে ফিরেই গোলকনাথকে ডেকে পাঠালেন লেবেদফ। 
রতনের গলায় একটি গান তৎক্ষণাৎ শুনে সেও হতবাক। 'ছোঁড়ার এলেম আছে বলতে হয় !' তামাক খেতে খেতে সেও সাহেবের জহুরীর চোখকে বাহবা দেয়। আপাতত এই দিন পনের গোলকনাথই রতনকে 'বিদ্যাসুন্দর' পালার 'সুন্দর' হয়ে ওঠার তালিম দেবে। তারপর জন্মাষ্টমীর দিন হবে  সেই নতুন পালার আসর। চিকের আড়াল থেকে আদুরী  সব শোনে। তার কাজলকালো চোখদুটো চিকচিক করে ওঠে জলে। ছোকরাটি দেখতে শুনতে  বেশ ভাল 'লবকাত্তিক' গোছের। আহা রে, বেচারার মা বাপ কেউ নেই শুনে তার মনটাও বেশ দ্রব হয়ে ওঠে। নিজের কথা মনে পড়ে যায়। তার তো সেই জন্ম থেকেই বাপ বেপাত্তা। ওলাউঠোয় মা-ও মরে গেলে দূরসম্পর্কের এক মাসি এসে আড়কাঠির কাছে কলকাতায় এনে ওকে বেচে  দেয়। সাহেবরাও নাকি আজকাল মেম সাহেবের অভাবে দেশী রক্ষিতাই রাখছে। 

'ডিহি কলিকাতায়' ঘরের কাজ করার চাকর নফর আর শয্যাসঙ্গী দুটোই খুব সস্তায় পাওয়া যায়।  হিকি বলে এক ইংরেজ সাহেব তার বেঙ্গল গেজেটে লিখেছে যে বিলেত থেকে কোন নতুন  সাহেব ইন্ডিয়াতে এলেই লোকাল এজেন্টরা তাদের জাহাজঘাটা থেকেই ছেঁকে ধরছে। সাহেবপাড়ায় বাসস্থান, আর্দালী আর খানসামার সাথে একটি বা দুটি দেশী করে সোমত্ত মেয়েমানুষও খুব সস্তায় দশ কি বারো সিক্কায় জুটিয়ে দিচ্ছে। 

 আদুরীর এই বয়সেই বাড়ন্ত গড়ন। তাই মাসি  এই সুযোগে আদুরীকে আড়কাঠির কাছে বেচে দিয়ে একজোড়া গরু কিনে এনে ঘরে রেখেছে। ভরন্ত সোমত্থ মেয়ে ঘরে বসিয়ে খাওয়ানোর চেয়ে দুধেলা গাই ঘরে রাখাটাই ভালো। দুধ-ঘি বেচে যা হোক দুটো পয়সা তো আসে ঘরে। যাকগে! ওসব কথা ভাবতে এখন আর তার  ভালো লাগছে না। লেবেদফ সাহেবের কাছে অবশ্য আদুরী আগের চেয়ে ঢের সুখেই আছে।


পর্ব (৩)
বৃদ্ধ নবাব আলিবর্দী মৃত্যুশয্যায় দুটি অদ্ভূত সিদ্ধান্ত নিলেন। আমীর ওমরাহ্ এমনকি পারিবারিক অসন্তোষকে একরকম উপেক্ষা করেই তৃতীয়া কন্যা আমিনা বেগম ও ভ্রাতুষ্পুত্র জৈনুদ্দিন আহমেদের ঔরসজাত সন্তান সদ্যযুবা তাঁর প্রিয়তম দৌহিত্র মির্জাকেই নবাবী মসনদের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে দিলেন আর একই সঙ্গে সেই স্পর্ধিত উন্নাসিক যুবাটিকে তার যৌবনমদে মত্ততার সুস্থিতির জন্য কোরাণ ছুঁয়ে শরাব পান পরিহার করার অঙ্গীকারটিও আদায় করে নিলেন একইসাথে। সেই কটক অভিযানের সময়ই আলীবর্দী তাঁর সদাপ্রিয় মির্জার মধ্যে মসনদে বসার যোগ্য সম্ভাবনাটি দেখেন, কিন্তু তার উদ্ধত বেপরোয়া আর দুর্বিনীত স্বভাবটি যে তাঁর জীবদ্দশায়ও যে শেষমেশ রয়েই গেল এই আক্ষেপটির সঙ্গে অতিরিক্ত অন্ধ প্রশ্রয়দানের অভিযোগের দূর্নামটিও সাথে নিয়েই তাঁকে ভাগীরথীর অপর পাড়ে খোশবাগে চিরশয্যাটি পাততে হল।

এদিকে বাংলাদেশের সম্পদের প্রাচুর্য তখন প্রলুব্ধ করেছে ইওরোপীয় বণিকদের। চুঁচুড়ায় ওলন্দাজরা, শ্রীরামপুরে দিনেমাররা, হুগলি আর করকাতায় ইংরেজরা আর চন্দননগরে ফরাসীরা আস্তে আস্তে কুঠি তৈরী করে ছড়িয়ে পড়ছে।  কিন্তু এদের সবাইকে প্রতিযোগিতায় পিছনে ফেলে দ্রুত এগিয়ে আসছে ইংরেজদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীই। রাজমহল, কাশিমবাজার,কলকাতা আর পাটনা মিলিয়ে  তাদের সোরা,বারুদ, নুন আর কাপড়ের ব্যবসায় তখন বেশ পালে হাওয়া লেগেছে। জোব চার্ণকের গরিমা  যদিও তখন অস্তমিত। জামাতা চার্লস  কোম্পানীর অ্যাডভাইসারি বোর্ডে রয়েছেন নাম কা ওয়াস্তে। নিজে আপাতত সুদের কারবারে মন দিয়েছেন। এই মুহূর্তে কোম্পানীর নতুন মুখপাত্র হল তিন নবীন শ্বেতাঙ্গ মূর্তি। ক্লাইভ, ওয়াটস্ আর উইলসন্। মূর্শিদাবাদের আকাশ বাতাসে আজকাল কান পাতলে ফিসফিসিয়ে দিনবদলের খবর ঘুরপাক খাচ্ছে। তলে তলে রফা নিষ্পত্তি হচ্ছে ভাগ বাঁটোয়ারার। নবাবী মসনদটি এবার যেন টলে উঠবে  !

ভারত প্রাতঃস্নান সেরে গুড় ও চিঁড়ে দিয়ে আজ ফলার করছিল। কাল সন্ধ্যেবেলায় দত্তদের বাড়িতে  পূর্ণিমার স্বস্ত্যয়ন বিহিত পুজোর সিধেটুকু সে ব্রাহ্মণ বলেই সসম্মানে লাভ করেছে। এখনো বেশ কটি মোটা মোটা সবরী কলা আর একটি ছোট ধামায় বিন্নিধানের খইও ঘরে রাখা আছে। ব্রাহ্মণভোজনের এই একটা সুবিধা খাওয়ার পরও খানিকটা ছাঁদা বেঁধেও নিয়ে আসা যায়। ইতিমধ্যে রাধা নদীঘাট থেকে সদ্য স্নান সেরে ফিরেছে। ফলার খেতে খেতেই ভারত তার সিক্তবসনা যুবতী তনুটি মুগ্ধদৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করতে থাকে। রাধার দৈহিক রূপান্তরটি তাকে আজকাল বড়ই আনন্দ দেয়। এই কদিন আগেই সে একটি সাধারণ ছোট্ট বালিকাই ছিল বলা যায়, আজ তার সেই দেহটিকে ঘিরে পুষ্পধনুর পেলব আল্পনা জেগে উঠেছে। স্বামীর স্থির দৃষ্টিপাতে সলজ্জ রাধা চকিতে ঘরে ঢুকে দোর বন্ধ করে। সে ভালই জানে ভারতের প্রেমোদ্দীপনা জাগলে এক্ষুণি তার ক্ষুদ্র সংসারটির দৈনন্দিন  সব কাজ সকাল সকাল শিকেয় উঠবে। ভারত তক্ষুণি নিমেষে উঠে গিয়ে দরজায় মৃদু করাঘাত করে ঠিক দু'বার। ভেতরে রাধা মনে মনে প্রহর গোণে একটি আসন্ন কালবৈশাখী ঝড়ের। নববধূর ব্রীড়ায় দরজাটি খুলে সে একপাশে সরে দাঁড়িয়ে থাকে। সুচারু দন্ততে সে অধরটি দংশন করে আর আনত দৃষ্টিতে মাটির দিকে চেয়ে থাকে। ভারত ভাববিহ্বল হয়ে সেই ক্ষীণকটি সুতনুকাকে সবলে নিজের কোলে তুলে নিয়ে তার কানের লতিতে মৃদু মৃদু দংশন করতে থাকে । ধীরে ধীরে বস্ত্রমোচনের পর এক স্বাদু প্রণয়লীলায় উভয় নিমজ্জ্বিত হয়। মিলন শেষে রাধার কপালের অবিন্যস্ত চুলগুলি যত্নকরে নিজের হাতে সরিয়ে দিতে দিতে ভারত রাধার কানের কাছে মুখ এনে মৃদুস্বরে উচ্চারণ করে, 

" বিনাইয়া বিনোদিয়া বেণীর শোভায়/সাপিনী তাপিনী তাপে বিবরে লুকায় 
কে বলে শারদশশী সে মুখের তুলা/
পদনখে পড়ি তার আছে কতগুলা/
কি ছার মিছার কামধেনু রাগে ফুলে/
ভুরুর সমান কোথা ভুরু-ভঙ্গে ভুলে !"

এরপর দুই যৌবনউৎসুক নরনারী  সকালের আকস্মিক প্রীতি ও স্মরোদ্দীপনার  প্রাবল্যে একে অপরেতে আরো একবার জোরালো রতিবাসরে নিবিষ্ট হয়ে ওঠে।

⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜

আদিগঙ্গা (অন্যান্য নাম গোবিন্দপুর খাঁড়ি বা সারম্যানের নালা বা টালির নালা) হল বঙ্গদেশের প্রাণস্বরূপা।  কলকাতা ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত একটি ছোটো নদী। খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ থেকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত এই নদীটিই ছিল হুগলি নদীর প্রধান ধারা। পরে এই ধারাটি ক্ষীণ হয়ে আসে। ভাগীরথী খাতে প্রবাহিত গঙ্গা নদীর নিম্ন প্রবাহটি একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে যেমন ছিল, তেমনটি আগে ছিল না। বহু প্রাচীনকালে গঙ্গা-ভাগীরথী আরও পশ্চিম দিকে রাজমহল, সাঁওতালভূমি, ছোটনাগপুর, মানভূম, ধলভূমের তলদেশ দিয়ে সোজা দক্ষিণবাহিনী হয়ে সমুদ্রে পড়ত এবং এই প্রবাহই ছিল অজয়, দামোদর ও রূপনারায়ণের সঙ্গম। এই নদী তিনটিই তখন নাতিদীর্ঘ।ভাগীরথী প্রবাহের দক্ষিণতম সীমায় অধুনা তমলুকে ছিল একদা তাম্রলিপ্ত বন্দর। এর পরবর্তীকালে গঙ্গার ক্রমশ পূর্বদিকে যাত্রা শুরু হলে তাম্রলিপ্ত বন্দর পরিত্যক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে ফরাক্কা থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত গঙ্গা-ভাগীরথী ব্যান্ডেলের কাছে ত্রিবেণীতে তিনটি শাখায় ভাগ হয়ে যেত। দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে সপ্তগ্রামের পাশ দিয়ে বজবজ, ফলতা, ডায়মন্ডহারবার হয়ে সমুদ্রে পতিত হত সরস্বতী নদী। তাম্রলিপ্ত বন্দর পরিত্যক্ত হওয়ায় এই নদীর তীরে গড়ে ওঠে সপ্তগ্রাম বন্দর। দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বয়ে যেত যমুনা নদী (উল্লেখ্য, এই নদীটির সঙ্গে উত্তর ভারতের যমুনা নদী বা বাংলাদেশের যমুনা নদীর কোনো সম্পর্ক নেই), মাঝখান দিয়ে বইত হুগলি নদী। এখন যেখানে কলকাতা শহর সেখানে হুগলি নদী বাঁক নিত (নির্দিষ্ট ভাবে বলতে গেলে হুগলি নদী বেতড়ের কাছে বাঁক নিত যেটি বর্তমানে গার্ডেনরিচের ঠিক উল্টোদিকে শিবপুর থেকে আর কালীঘাট, বারুইপুর, মগরা, গোচরণ, জয়নগর, দক্ষিণ বিষ্ণুপুর, ছত্রভোগ, বড়াশী, খাড়ি, কাশীনগর ও কাকদ্বীপের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম সাগরদ্বীপে (সম্ভবত এই সাগরদ্বীপে প্রাচীন বীর বাঙালি জাতি গঙ্গারিডিদের রাজধানী 'গঙ্গে ' বন্দরের অবস্থান ছিল) প্রবেশ করে ধবলাট ও মনসা দ্বীপের মধ্য দিয়ে সমুদ্রে গিয়ে মিশত। এই আদি খাতটিকেই বলা হয় আদিগঙ্গা। ইতিহাসের ধারার মত এই নদীটিও বারবার বদলেছে গতিপথ আর সাথে সাথে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী তথা ইংরেজদের বিজয়যাত্রায় এই নদীটির গুরুত্ব অপরিসীম। এরই একটি অংশে জলঙ্গীর বুকে দক্ষিণমুখে  অদূরে একটি বজরা দেখা গেল। ওটির ভিতর  অক্ষম রাগ ও অপমানে মুখটি লাল করে বসে আছেন কৃষ্ণনগরের রাজা মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র। সঙ্গে আছে তাঁর একমাত্র বিশ্বস্ত অনুচর হুকুমচাঁদ। আজ  বিজয়া দশমী। মতিঝিলে নবাবের বন্দীশালা থেকে ছাড়া পেয়ে আজ ভোরেই কৃষ্ণনগরের পথে যাত্রা করেছেন। জলঙ্গির দুধারের গ্রাম গুলোয় দু একটা প্রতিমার নিরঞ্জন শুরু হয়ে গেছে । রাগে, আক্ষেপে তাঁর নিজের দুএকগাছা মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে। আলীবর্দীর দৌহিত্রটি নবাবী মসনদে বসে হাতে মাথা কাটছে যেন সবার। আমীরচন্দ্ এর মত মানী ওমরাহ্ কেও যে অপমান করে সর্বসমক্ষে তার যে নবাবীর মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে তা বলা বাহুল্য। খোদ নবাবী কোষাগার আর কোম্পানির হুন্ডি দুটোতেই জগৎশেঠ আর আমীরচন্দ্ দের টাকা সুদে খাটে। আহাম্মকটা তাকেও চটিয়েছে। এবছর নিজের মহলের খাজনার পরিমাণে একলক্ষ টাকা কম পড়ায় সেই মহালয়ার দিন থেকে কৃষ্ণচন্দ্রকে মূর্শিদাবাদে ডেকে এনে  যাচ্ছেতাই অপমান করে একরকম নজরবন্দী করেই রেখেছিল হারামজাদাটা।এই সাতদিনের বন্দীদশায় অসহায়ের মত পেরিয়ে যেতে দেখলেন শারদীয়া পূজার তিথিটি। এই প্রথমবার কৃষ্ণনগরে তাঁর ভদ্রাসন 'শিব নিবাসে' জগন্মাতা রাজরাজেশ্বরীর পূজাটি সম্ভবপর হল না। কৃষ্ণনগরে ফিরেই একবার মহারাজা নন্দকুমার, আমীরচন্দ্, জগৎশেঠ, রাজবল্লভ, জানকীরাম এইসব ক্ষমতাবান পয়সাওলা মানুষজনদের সাথে  বসে একটা শলাপরামর্শ করে এই মির্জা বজ্জাতটাকে শায়েস্তা করতেই হবে।

এতক্ষণে বজরাটা জলঙ্গীর সীমানা পার করে চূর্ণীর বাঁকে এসে বাঁদিকে ঘুরল। আর আধবেলার মধ্যেই কৃষ্ণনগর পৌঁছনোর কথা। মাঝিদের সর্দার লতিফ মিঞা বিনীত কন্ঠে আর্জি জানায়
 " হুজুর! এখানে ঘন্টাটাক নোঙর ফেলতি হয় যে! দুটো ভাতে ভাত তবে ফুটায়ে নি কত্তা!" 

কৃষ্ণচন্দ্র সম্মতি দিয়ে ঘাড় নাড়লেন।অনেক ভোরে বেড়িয়েছেন বলে তাঁরও বেশ ক্ষুধাবোধ হচ্ছে। অথচ এখানকার বাজারের কোন খাবারের প্রতি তাঁর রুচি নেই। হুকুমচাঁদকে বললেন উৎকৃষ্ট দই, চিঁড়ে, গুড়, বাতাস আর কলা কিনে আনতে। আপাতত তাই দিয়েই এখনকার মতো রাজভোগটি উদরস্থ করতে হবে। কৃষ্ণচন্দ্র মানুষটি খাদ্যরসিক ও ঔদরিক। রাজবাড়িতে এই সময় তাঁর একটি হুকুমে অতিপ্রিয় গাওয়া ঘিএর লুচি, মোহনভোগ, সরভাজা আর হিং দেওয়া চাপ চাপ ছোলার ডাল সামনে এসে  হাজির হতে পারতো।তার বদলে অবস্থার ফেরে পড়ে ফলারে বামুনদের মতো দইচিঁড়ে গিলতে বসতে হবে। কৃষ্ণনগরের মহারাজার বজরা ঘাটে লাগার খবরে পুরো এলাকাটিতে হুলুস্থুলু পড়ে গেল।
⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜

রতনের উচ্চারণে একটু সামান্য গ্রাম্য টান  এখনো রয়ে গেছে তবে সে গানের গলার জোরে সেটুকু খামতি যে ঢেকে দেবে তা বলাই বাহুল্য। আরোহণের উঁচু পর্দাতেও তার স্বরভঙ্গ হয়না। আর অভিনয় কুশলতায়  আদুরী কিন্তু এই কদিনের অনেকটাই সপ্রতিভ হয়ে উঠেছে।  গোলকনাথ সবাইকে পাখি পড়ানোর মত করে পার্ট করা শেখাচ্ছে। গোলক খুব করিৎকর্মা লোক। তার সূত্রেই ক্ষ্যান্তমণি নামে একটি মেয়েকে গরাণহাটার বেশ্যাপাড়া থেকে জোগাড় করে আনা হয়েছে। গোলকের ওপাড়ায় যাতায়াত অাছে গান শেখাবার সুবাদে। এই মেয়েটিই 'হীরামালিনী'র চরিত্রটি করবে। যাত্রা বা খেমটা নাচের ব্যাপারটা ক্ষ্যান্তমণি মোটামুটি জানলেও 'থ্যাটার পালা' বিষয়টা ওর কাছে একদম নতুন। ঠিকমত পোশাকী বাংলা সংলাপ উচ্চারণ করাটাও  তার কাছে ততোধিক কঠিন। লাভের মধ্যে একটাই যে তার চেহারাটা চটকদার আর গলায় একটু হলেও সুর আছে। মুজরোর আদিরসাত্মক গান তার গলায় বেশ ভালই খোলে বলে লেবেদফ তেমন একটি গান - 'রসের নাগর ধরলে যে দোর / ভেতরে এলে না ' এই গানটিও নাটকের একটি অঙ্কে রেখেছেন। কিন্তু ভুজঙ্গধরের ক্ল্যারিওনেটের বাজনার সাথে গান করে মালিনীর একটা সংলাপ আছে -

" আমারে যেমন /মারিলি তেমন/পাইবি তাহার কিয়া/নষ্টের এ বড় গুণ, পিঠেতে মাখয়ে চুন/কি দোষ পাইয়া ওরে কোটালিয়া /মারিয়া করিলি খুন ।।"

সেটা কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও ক্ষ্যান্তমণি পুরো বাক্যটা একবারও ঠিকমত  বলে উঠতে পারছেনা। 'নষ্টের এ বড় গুণ পিঠেতে মাখয়ে চুন'  খালি  তার মুখে 'নষ্ট গেল চুন ! '  হয়ে যাচ্ছে বারবার।

শেষমেশ গোলক বেশ অধৈর্য গলায় রেগে ওঠে - 'মাগীর এমনিতে কত্ত কলকলানি! অথচ মালিনীর এট্টু গানটা গাইতে গিয়ে কোঁৎ পারচে কেমন দেকো!'

লেবেদফ খুব আশাবাদী এই 'বিদ্যা সুন্দর' নিয়ে। তার খুব ইচ্ছা প্রথম রজনীর আসরেই ক্যালকাটা সোসাইটির গণ্যমান্য সাহেবদের সঙ্গে গভর্ণর জেনারেল স্যার জন স্টোর'কেও অভিনয় দেখতে আমন্ত্রণ জানানোর। বিলেতী অপেরার ধাঁচে দেশী পালা এদেশে প্রথম অভিনীত হতে চলেছে, তাও অাবার একদম নবিশ নেটিভ অভিনেতা- নেত্রীদের দিয়ে, এ যেন একটা অকল্পনীয় ব্যাপার।

জন্মাষ্টমীর বদলে নভেম্বরের সাতাশ তারিখ আসরের দিনটি ঠিক হল। কলকাতার ইওরোপীয় সমাজের সাথে সাথে অনেক দেশীয় মানুষও সেই আসরে এসে ভীড় জমালো। ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দর' এর অসামান্য নাট্যপ্রয়োগ আর তার সঙ্গে ইওরোপীয় অর্কেষ্ট্রার অনুপম বাদ্যসহযোগে ১৭৯৫ এর সেই রজনীটি কলকাতার বুকে এক নতুনরকম কান্ড হয়ে রইল। গভর্ণর নিজে লেবেদফ কে আলিঙ্গন করলেন আসরের শেষে। আর কার্টেন কলের সময় বেশীরভাগ দর্শক রতন, আদুরী আর ক্ষ্যান্তমণির দিকে মুঠো মুঠো পয়সা বখশিস্ ছুঁড়তে লাগল। সফল হল লেবেদফের স্বপ্ন।সবমিলিয়ে সেই সন্ধেটি হয়ে উঠলো এক জমজমাট ব্যাপার। রুশী পন্ডিতের ভোল্গা আর ভারতচন্দ্রের গঙ্গা এসে মিশলো এক নতুন স্রোতে। 
⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜

গৃহদেবতা লক্ষ্মী জনার্দনকে প্রণাম করে ভারত গৃহিণীর সামনে এসে দাঁড়ায়। গত দুটি দিনের নিগূঢ় প্রেমের বন্ধনের পর আজ স্বামীকে অনির্দিষ্টদিনের জীবিকাসন্ধানের যাত্রায় বিদায় দিতে তার মন চাইছে না। ভারত নিজেও কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুত বোধ করে এই গম্ভীর পরিবেশে। ভারতের শ্যালীপতির নবাবী নিজামতে মশলা আর কাপড়ের ব্যবসার সুবাদে দু একজন বড় মানুষজনের সাথে আজকাল খাতির হয়েছে। তাই সে ফরাসডাঙায় ফরাসী সরকারের দেওয়ান ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর কাছে সে সুপারিশ করেছে ভারতের চাকরীর জন্য।এজন্য তাকে একবারটি সেখানে  যেতে হচ্ছে চৌধুরী মশায়ের সাথে দেখা করে কোন চাকরীর ব্যবস্থা করতে। ভাগ্যের অনেক বিপর্যয়ের পর এই পর্যায়ে আর যে কি বাকী আছে কে জানে? রাধাকে বুকে টেনে শিরোশ্চুম্বন করে ভারত। একটি ছোট পুঁটুলিতে সে পথের জন্য চিঁড়ে, নাড়ু আর নারকেলের তক্তি বেঁধে দিয়েছে। ভারত রাধাকে জীবিকা সংস্থানের আশ্বাস দিয়ে অবশেষে প্রস্থান করে। এখনো আর একজনের কাছ থেকে বিদায় নেওয়া তার বাকী। 

খেয়াঘাটের শঙ্করীও ভারতের বিদায়কালীন প্রতীক্ষায় ছিল। সে অবশ্য ভারতের কাব্যের অত গভীর গূঢ় তত্ত্ব- চিন্তা বোঝেনা। ভারতের সাথে তার দীর্ঘ অদর্শনটিতেই বেশ আপত্তি। সারাদিনে একটিবার তো খেয়াঘাটে মানুষটাকে কাছে পাওয়া যায় তাও তো অনেক। প্রকাশ্যে সে ভারতের অঙ্গ স্পর্শ করেনা বটে তবে নৌকাটি লতাগুল্মের আড়ালে রেখে ভারতের বক্ষে সে মাথা রেখে তীব্র কান্নায় ভেঙে পড়ে। শঙ্করীর এই আত্মসমর্পণে কোনও জড়তা নেই। আদিম প্রকৃতিবালার মতোই সে অকপট। ভারত তার জীবনে এই দুটি ভিন্নরীতির রমণীর প্রেম ঋণ আজন্ম ভুলতে পারবে না।একটি   তার আসঙ্গ অন্যটিতে আসক্তি। দুটিতেই তার মনমধুপ বড় লোভী। এর ব্যাখ্যা করতে গেলে এই পদটি বরং বেশ জুতসই ভাবে মিলে যায়,

"যৌবন মরম জানে না যে বা/পন্ডিত তাহারে বলয়ে কেবা II
যৌবনে তিনঅক্ষর লেখ/যে জন পরম উত্তম দেখ II
যৌবন মরম যে জানে নাই। প্রথম ছাড়িয়া তাহার ঠাঁই II
যদ্যপি যৌবনে উদ্যম করে। প্রথমের মত গলিয়া মরে।I
ভারতচন্দ্রের ভারতী যোগ।
যৌবনেতে কর যৌবন ভোগ II "

************
 
পর্ব (৪)

ভারত ফরাসডাঙার ঘাটে পৌঁছে একদম হতবাক হয়ে এদিকওদিক দেখতে থাকে। ফরাসীরা বেশ কায়দা করে নগরটি সাজিয়েছে তো! গঙ্গার দু ধারে কত ফোয়ারা আর তার সংলগ্ন অনেকগুলো বিচিত্র ভঙ্গীর শ্বেতপাথরের বিবসনা নারীমূর্তিগুলোই সবার আগে তার চোখ টেনেছে। কি জীবন্ত ! যেন এক্ষুণি কথা বলে উঠবে ! ফরাসীদের মেয়ে বউরা গায়ে কাপড় দেয়না বুঝি?  খানিকটা এগিয়ে এসে একটা মূর্তির সামনে ভারতচন্দ্র দাঁড়িয়ে পড়ে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে।  একটি যুবতী নগ্নিকা মাতৃমূর্তি কোলে তার সদ্যজাত শিশুটি, সেও  অবশ্য নিরাভরণ। নারীটি তার বিম্বফলের মতো পুষ্ট একটি স্তন শিশুটিকে সস্নেহে পান করাচ্ছে অন্য স্তনটি চাদরের উপর থেকে উদ্ভাসিত। এর পুরোটাই আসলে একটা মর্মর ভাস্কর্য্য। দেখে মন ভরে গেল ভারতের। পৃথিবীর পবিত্রতম জাগতিক দৃশ্যকল্পটি  আপ্লূত করল তাকে।  মনে মনে এর অজ্ঞাত শিল্পীটিকে কূর্ণিশ করে সে কাছারি দপ্তরের খোঁজ করতে ধীরে ধীরে  এগিয়ে যায়। 

সামনের বটতলায় দেখতে পায় একটা জটলা বেঁধেছে। একজন টুপি আর সাদা আলখাল্লা পড়া সাহেবের  সামনে কিছু কাচ্চাবাচ্চা আর মেয়েপুরুষ হাঁ করে তার কথা শুনছে। লোকটি সুর করে ভারী অদ্ভূত বাংলা ভাষায় কিসব কথা বলছে। এমন ধারা বাংলা ভাষা ভারত এর আগে কারো মুখেই শোনেনি। প্রভু যীশু বলে কোন একজন লোকের মহিমার কথা তার বক্তিমেতে বারবার ঘুরে ফিরে আসছে। আর থেকে থেকে  পিচকিরির মত কিছু একটা জিনিস থেকে আতরজল ছেটাচ্ছে। এরপর সব্বাইকে লোকটা একটা গোল রুটির মত কি যেন একটা খাবার খেতে দিতে চাইছে কিন্তু অনেকেই তার হাত থেকে নিতে ইতঃস্ততঃ  বোধ করছে। বাচ্চাগুলোর কেউ কেউ তা লোভের বশে অবশ্য সেগুলো  মুখে পুরে দিয়েছে ইতিমধ্যে। ভীড়ের মধ্যেই একজন লোক চাষাভুষো শ্রেণীরই হবে  খুবই  বিরক্ত কন্ঠে ভারতকে বলল - 
" এই এক নতুন রঙ্গ হয়েচে ! কেরেস্তান করার জন্য এরা একন উঠে পড়ে নেগেচে! দিন রাত যীশু আর যীশু! চৌপর বটতলায় সায়েব নিজে  ধরে ধরে কেরেস্তান করার জন্য ফাঁদ পেতে বসচে! একোনো  কেবল ধরে বেঁধে কয়েকঘর বাগদী, মালো, চামার  রুটি আর পয়সা পাওয়ার লোভে জাত খুইয়েচে! কিন্তু ভদ্দরলোকদের  শুদু কব্জা কর্তে পারচেনি ! "

ভারত এর আগে অবশ্য ' যীশু' নামের লোকটির ব্যাপারে  কোনও কথাই শোনেনি। 'যীশু'র নাম বলে সাহেবটা  কেনই বা সবাইকে পয়সা আর রুটি বিলোচ্ছে  তাও তার খুব একটা বোধগম্য হল না। যাইহোক সময় নষ্ট না করে এখন কাছারিবাড়িটা খুঁজে বের করে সেখানে এখন জলদি পৌঁছতে হবে। 

⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜

বন্ধুবর মদনমোহনের বাড়ি থেকে আজ বেশ আশ্বস্ত হয়েই পথে নেমে কলুটোলার দিকে সোজা হাঁটা লাগালেন ঈশ্বরচন্দ্র। কলকাতার সারস্বত সমাজে এই তেজস্বী বিদ্যাদৃপ্ত ব্রাহ্মণ সন্তানটি এক জ্যোতিষ্ক বিশেষ। আপাতত মদনমোহন ছ'শো টাকার জোগাড় করে দিতে পারবে বলে তাঁকে নিশ্চিন্ত করেছে। ঈশ্বরচন্দ্রের এখন একটি নিজস্ব ছাপাখানার  আশু প্রয়োজন।  বিলেতী সিভিলিয়ানদের জন্য ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে যে বাংলা পাঠ্যপুস্তকগুলি আসে তা মূলত বর্ণশুদ্ধিতে ভরা। আর তার কাগজের মানও ভাল নয়। বাংলাভাষাকে আস্তে আস্তে তার পয়ারী কাব্যময়তার স্বরূপ থেকে গদ্যের অবয়বেই মূর্ত করতে হবে। আধুনিক যুগের এটাই চাহিদা। কথ্য বাংলা আর ব্যবহারিক বাংলার সাথে রসপূর্ণ বাংলাকে না মেলাতে পারলে একদিন ব্রজবুলির মত এটিও বাতিল হয়ে যাবে। সামনের দিনে যে ইংরেজী ভাষাটির প্রাবল্য যে ক্রমবর্ধমান তা আর আজকে অস্বীকার করার নয়। কলেজের অধ্যাপনার সাথেই একদিকে বাংলা গদ্যরীতির প্রবাহের ধারা নির্মাণের স্বেচ্ছানির্মাণের কঠিন সাধনার সঙ্গে আরো দুটি যুগন্ধর কাজে তিনি আজকাল খুব ব্যস্ত। একটি হল স্ত্রী শিক্ষার প্রসার  অন্যটি বিধবাবিবাহের স্বপক্ষে শাস্ত্রমন্থন। তিনি নিশ্চিত এ কাজের  যে খুব কম স্বদেশবাসীরই সাহায্য ও আনুকূল্য তিনি লাভ করবেন এই দুটি কাজে। তিনি অবশ্য নিজেও বেপরোয়া ও একরোখা। বরং বীটন ও হেয়ার এই দুই ইংরেজসন্তান বাংলাদেশে বিদ্যাচর্চা বিশেষ করে মেয়েদের লেখাপড়া শেখানোয় খুব আগ্রহী। সতীদাহ প্রথা বন্ধ করিয়ে  রামমোহন রায় তো মেয়েদের তো প্রাণে বাঁচালেন কিন্তু এই জীবন্মৃত বিধবাদের ভবিষ্যতটি ভাবার অবকাশ তিনি আর পেলেন না। এইসময় আরেক জন রামমোহন থাকলে তাঁর কাজটা একটু সহজ হত এই যা। তবে সার্বিক শিক্ষার প্রসারেই যে একদিন নতুন চিন্তাধারার ভোরটি উদিত হবে সেই বিশ্বাসে ভর দিয়ে তিনি সমস্ত প্রতিকূলতা জয় করতে এখন ব্রতী হয়েছেন।

 মদনমোহনের বক্তব্যটি মনে ধরেছে তাঁর। যদি কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি থেকে ভারতচন্দ্রকৃত 'অন্নদামঙ্গল' এর মূল পুঁথিটি জোগাড় করে তার যদি একটা উত্তম সংস্করণ কলকাতায় প্রস্তুত করা যায় তবে তার একশোটি কপি কলেজেই বিক্রী করে প্রেসের দেনাটিও  শোধ হয়ে যায়, উপরন্তু বাকী বই গুলির বিক্রয় থেকে বেশ ভালো আয়ের সম্ভাবনাটিকেও উড়িয়ে দেওয়া যায়না। গত শতাব্দীতে ভারতচন্দ্রের মত কবিকীর্তির সমতূল্য আর কেউই নেই বললে চলে।ঈশ্বরচন্দ্র ছাত্রদের সামনে বিদ্যাসুন্দর পড়ানোর সময় এইষকদিন আগেও রতিরঙ্গগুলির দৃশ্য বর্ণনার সময়  একটু আড়ষ্টই থাকতেন। আসলে অনেক ছাত্রই তাঁর চেয়ে বয়সে বড় আবার কিছু সমবয়স্কও আছে। তাই মদনমোহন একদিন একরকম তিরস্কার করেই বললেন - " ঈশ্বর তুমি তো কুমারসম্ভবম্ , রঘুবংশম্ ইত্যাদি সবই পাঠ করিয়াছ ! কালিদাসের রতি কি ভারতচন্দ্র হইতে পৃথক? বাঙ্গালাভাষায় লিখিত বলিয়াই কি আমাদিগকে এই শৃঙ্গার রসের প্রতি ঘোর অবিচারটি দেখাইতে হইবে? যাহা সংস্কৃতে শোভন তাহা বাঙ্গালায় হইলেই অশ্লীল?  তুমি একাধারে পন্ডিত ও রসজ্ঞ হইয়া এইরূপ ছুঁৎমার্গিতাটিকে কেন প্রশ্রয় দাও?"

হেদুয়ার রেলিং এর ধারে সদ্য কেনা ঝাল নুন মাখানো ছোলাসেদ্ধর পাতাটি বন্ধুবরের দিকে সস্নেহে এগিয়ে ' হা হা ' করে সশব্দে হেসে ওঠেন ঈশ্বরচন্দ্র। খানিক সামলে মদনমোহনকে বলেন - 
" ভায়া ! তবে একটি গুপ্ত সত্য উদ্ঘাটন করি তোমার কাছে। ভ্রাতার বিবাহোপলক্ষে মাতৃআজ্ঞার নিমিত্তে যে ভরা বর্ষার দামোদর নদ সন্তরণের ঘটনা আমাকে প্রায় পবনন্দনের সাগর উল্লম্ফনের তূল্য গৌরবে বাধিত করিয়াছে, তাহার প্রেক্ষিতে আসল সত্যটি তবে শুন ! তখন ছিল জ্যৈষ্ঠমাস। আমার গমনপথের অংশের দামোদরটি ছিল আদপে ক্ষীণকায়াই। নদীটি তৎস্হানে কিঞ্চিৎ চরায় পর্যবসিত বলিয়াই সে রাত্রে উহা পদব্রজেই পার হইয়াছিলাম। সুতরাং বাল্যের সন্তরণবিদ্যার প্রয়োগটি আদপেই প্রযুক্ত হয় নাই! আর মধ্যরাত্রির আগন্তুক হইয়া গৃহাভিমুখী হইবার  প্রকৃত কারণটিও পূজনীয়া মাতৃদেবী কেবল নহে! পুত্র নারায়ণ তদবধি মাতৃগর্ভে নীত হয় নাই। তোমার বৌঠানের সাথে দীর্ঘ অদর্শনহেতু কিঞ্চিৎ রসাভ্যাসে ছেদ পড়িয়া ছিল বলিয়া, বধূ মিলনের জন্য স্বয়ং আমিও উন্মুখ হইয়া পড়িয়াছিলাম ! ইহা এতদিন শুধুই আমি জানিতাম! আজ তুমিও জ্ঞাত হইলে। এর পরেও কি আমাকে রসিক বলিতে তোমার বাধিবে?"

অন্তরঙ্গ হাস্যরসিকতার আবহটি পথের দুপাশে বসন্তের বিকালটিতে দুই বন্ধু ছড়িয়ে দিতে দিতে যে যার নিজের বাড়ির পথ ধরলেন। 
⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜

দেওয়ানীর কাছারিটি বেশ অনেকটা জায়গা জুড়েই । তার সামনে আজকে অনেক সেপাই সান্ত্রী গিসগিস করছে। ফরাসী চন্দননগরের সর্বময় কর্তা ডুপ্লে সাহেব আজ কাছারী পরিদর্শনে আসছেন।তাই চারিদিকে এত সাজোসাজো রব।  এত লোক চোখের সামনে হঠাৎ দেখে ভারত প্রথমটা হকচকিয়ে গেল। একটা মস্ত থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে অপেক্ষা করতে লাগল। একটু পরে একটা ঝালর দেওয়া হাতির দাঁতের কাজ করা তাঞ্জাম এসে দরজায় দাঁড়াল। একজন নাদুসনুদুস লাল মুখো সাহেব খুব ভারিক্কী চালে একজন দেশীয় চাপরাশীর কাঁধে বাঁ পা'টি রেখে তারপর তাঞ্জাম থেকে নামলো। এই সাহেবই তা হলে 'ডুপ্লে সাহেব' ! সকলে তটস্থ হয়ে সেলাম ঠুকে অভিবাদন জানানোর পর সাহেবটি দুলকি চালে কাছারির ভিতরে ঢুকে গেল। ভারত ভাবতে লাগল তা হলে কি আজ আর কর্তার সঙ্গে দেখা হবেনা ! অর্থের যা সংকুলান তাতে বারবার আসা যাওয়ার খরচ রোজ জোগানো মুশকিল। অগত্যা আজকে অপেক্ষা করা ছাড়া আর অন্য  কোনও গতিই নেই। প্রায় দুপুর গড়িয়ে যাওয়ার পর ভীড়টা পাতলা হল। সাহেব বেড়িয়ে চলে যাবার পরই কাছারিটি যেন অন্যদিনের স্বাভাবিক ঢিলেঢালা মেজাজটিতে ফিরে এল।

ভারত একজন আমীন গোছের লোককে চৌহদ্দিতে দেখতে পেয়ে  ইন্দ্রনারায়ণের কথা কুন্ঠিত স্বরে জিজ্ঞাসা করল যে এখন তাঁর সাথে একবার দেখা করা যাবে কিনা?

 বিনাবাক্যব্যয়ে আমীনটি তার বাঁ হাতটি ভারতের দিকে বাড়িয়ে দিল। লোকটির মুদ্রাদোষটি আপাতত একটি তামার আধুলি দিয়ে নিবৃত্ত করে সে অবশেষে ভেতরে ঢোকার ছাড়পত্র পেল।

বিশাল বপুর দেওয়ানজী  ইন্দ্রনারায়ণ মানুষটি কিন্তু বেশ আন্তরিক। ভারতের সমস্ত বৃত্তান্ত শুনে, খানিক ভেবে নিজের প্রকাণ্ড ঝোলা গোঁফটিতে একবার হাত বুলিয়ে নিয়ে বললেন - " শোনো বাপু ! এদিককার হাওয়া সুবিধার নয়!ইংরেজরা তলে তলে নবাবকে গদী থেকে সরাতে চাইচে! আর নবাবটিও হয়েছেন তেমন, ফরাসীকুঠির প্রতি প্রথম থেকেই যেন একটু বেশী সদয়। ইংরেজ কোম্পানির তা সইবে কেন? ওরা নিজেদের পচন্দ করা এমন লোককেই গদীতে বসাতে চায় যে দেওয়ানী নিজামত সব মুখ বুজে ওদের পায়ে সঁপে দেবে ! বুঝলে কিচু ! এর চেয়ে বেশী কতা এখেনে বসে বলাটা ঠিক নয় ! আজ রাত্তিরটা না হয় আমার অতিথিশালায় থাকো ! আর কাল ভোরে কেষ্টনগর বেড়িয়ে পড়। রাজা কেষ্টচন্দর আমার বন্ধুমানুষ, আর গুণীর কদরও করে বলে শুনিচি। আমি না হয় দস্তখৎ করে চিঠি লিকে দেবখন ! বামুনের ছেলে হয়ে বিদ্যাচর্চা কর্বে সে তো ভাল কতা ! "

অতিথিশালায় এসে ব্রজদাস বলে একজন কন্ঠীধারী লোকের সাথে আলাপ হল। লোকটি বৈষ্ণব ও শান্তিপুরে তার নিবাস। ফরাসডাঙায় সে  ডাকহরকরার কাজ করে, কাল ভোরে সে ফরাসীকুঠির ডাক নিয়ে বেরিয়ে পড়বে মূর্শিদাবাদের পথে। ভারতকে সে কৃষ্ণনগর অবধি সঙ্গ দেবে বলে কথা দিয়েছে। সারাদিনের পথপরিশ্রমে আর ক্লান্তিতে ভারতের দুচোখে ঘুম নেমে আসে। অতিথিসেবায় লুচি, কুমড়োর ছক্কা আর গুড় খেয়ে পেটটা ভরে গেছে একেবারে।  খাওয়ার সময় রাধার কথা তখন খুব মনে হচ্ছিল। কতদিন এসব ব্যঞ্জন তাদের গরীবের পাকশালায় প্রবেশ করেনি ! ভারত সকলের অগোচরে গোটাকয়েক লুচি কোঁচড়ে লুকিয়ে নিয়েছে। কাল কেষ্টনগর যাবার কালে পথে জলযোগটা এগুলো দিয়েই হয়ে যাবে না হয়।

খুব ভোরে উঠে ভারত সবেমাত্র দাঁতনটি মুখে দিয়েছে এমন সময় অতিথিশালার দরজায় একজন পাইকের দর্শন মিলল। তার হাতে একটি পাকানো বালির কাগজ। ভারত কাগজটি হাতে নিয়ে প্রথমে মাথায় ঠেকালো। সামনের নিমগাছটির ফাঁক দিয়ে লাল টকটকে সূর্যটা ততোক্ষণে উঠে পড়েছে। ভারত সেই স্বর্গীয় ভোরবেলাটি সর্বাঙ্গে গায়ে মাখতে মাখতে ভাবে যে পুরাকালের ঋষিরা আদতে আগে শিল্পীই। নইলে জবাকুসুমের বর্ণসাদৃশ্যটি এভাবে আরাধ্য দেবতার রূপকল্পে ব্যবহার করতে পারতেন না। মনটা অনির্বচনীয় আনন্দে ভরে ওঠে ভারতচন্দ্রের। মন বলছে, সময় বদলাচ্ছে এতদিনে, খুব দ্রুতই বদলাতে চলেছে। 
⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜
ব্রজদাসের গানের গলাটি বেশ। কীর্তনের আখর গাইতে গাইতে সে ভারতের সাথে সাথে চলল। তার পায়ের ঘুঙুর ঝুমঝুম করে তাতে তাল মেলাচ্ছিল। ভারত এই যাত্রাপথটিতে আজ খুব আনন্দ পাচ্ছে। এরকমের সহজ সিধে মানুষই সে বরাবর পছন্দ করে। চাতরা পৌঁছেই তল্পিতে বাঁধা লুচিগুলোর সদ্ব্যবহার হল ভালোরকম। ভাতজঙ্গলার মাঠ অবধি ব্রজদাস ভারতের সাথে সাথেই রইল। এরপর সে উত্তরদিশায় চলবে। যাবার কালে ভারত তার হাত দুটি ধরে একবার বললো - 'বন্ধু! দেখা হবে আবার!'

কৃষ্ণচন্দ্রের 'শিব নিবাসে'র দেউড়ীতে ভোজপুরী দারোয়ান  সুখলাল চৌবে তার হাতের  পিতলবাঁধানো মোটা রায়বেঁশে লাঠি দিয়ে ভারতকে পথ আটকালো। ভারতের বেশবাস পরিচ্ছন্ন যদিও তবু তাকে সচ্ছল ভদ্রলোক বলা যায় কি? 

মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র নিজে যথেষ্ট দয়াবান ও দানশীল। তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কাঙালীদের প্রতি রবিবার কাপড় আর টাকা দান করেন। তার সঙ্গে রাজরাজেশ্বরী মন্দিরে থাকে ঢালাও ভোগের ব্যবস্থাও। কিন্তু তাই বলে আজ তো আর রবিবার নয় ! বজ্রগম্ভীর হুঙ্কারে সে বলে - 'কেয়া মাংতা ! আজ কুছু হোবে টোবে না! পরশু কি রোজ আও! যাও ভাগো আভি! '

ক'দিন ধরে তার এক এক করে সব পথের কাঁটা দূর হচ্ছে দেখে ভারত তাই নিজের মনের জোরটি এবারে আর হারালো না।   দারোয়ানজীকে ঝোলা থেকে ওই চিঠিটি যেই বের করে দেখাতে যাবে ঠিক এমন সময় সেখানে একজন  উদাসী অবিন্যস্ত পোশাকের অথচ দিব্যকান্তি, মধ্যবয়সী পুরুষ কোত্থেকে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে  হঠাৎ  আবির্ভূত হল ।  কুঞ্চিত ঘন কালো  দাড়িগোঁফের আড়ালে তার মুখে এক স্মিত অপার্থিব আলোকিত আনন্দের উদ্ভাস। সুখলাল লোকটিকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে করজোড়ে নমষ্কার করে সুর বদলে বলে উঠলো  - " আরে বাপ্ রে !  আইয়ে আইয়ে! আপ্  জলদি জলদি আইয়ে ! আপকা বাড়ির খোবোর টোবোর সোব সহী  আছে তো হাঁ !  মহারাজ সোকাল সোকাল দু'তিন বার খবর কিয়েছেন! উনি মহালে আপনার জন্য কোখোন থেকে ইন্তেজার কার্ছেন!" 

লোকটি চকিতে ভারতের দিকে ফিরে বলে! সেই ভালো! চল ভায়া !আমরা বরং ভেতরে গিয়ে জল টল খাইগে! কাল থেকে অনেকটা পথ হাঁটা হয়েচে! " সুখলালও আর কোনও কথা না বাড়িয়ে করজোড়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ভারত বিস্মিত হয়ে লোকটিকে জিজ্ঞাসা করে -" মানে ! আমায় কি করে.. আপনি.. ? হা..হা.. হা করে একটা সজোরে অট্টহাসি হেসে সে বলে - " ভায়া ! আমি যে মানবজমিনের জায়গীরদার  ! আমি তোমার চোক দুটো দেখেই বুঝেচি যে অনেক অনাবাদী জমি আছে তোমার বুকে !  তাতে অনেক অনেক সোনার ফসল এবার ফলাতে হবে যে! চল ! চল! এই দেকো দিকি নামটাই জিজ্ঞাসা করিনিকো ভায়া'র এতক্ষণে - আমি হলুম গিয়ে কালীর ব্যাটা রামপেসাদ ! কুমারহট্টে থাকি! পরশু মা'র মন্দিরে উৎসব ! তাই মহারাজ মা'কে গান শোনাতে আমায় ডেকেছে। আমি আবার আসলে টাসলে রাজার অতিথিশালায় উঠিনা! ওই মন্দিরে চাতালেই একটা কোণ বেছে নিয়ে এসে শুই।"  ভারত এই মানুষটিকে বিস্ময়ভরে চেয়ে দেখে কিছুক্ষণ। এতটা সহজ- সরল অকপট আজকের দিনে কোনও মানুষ সত্যি কি হতে পারে ! মন্দিরের চাতালে পাশাপাশি বসে ভারত কুন্ঠিত ভাবে দেওয়ানজীর চিঠিটি রামপ্রসাদকে বের করে দেখায়ে আর নিজের সব কথা একে একে উজাড় করে দেয়। প্রসাদও ধৈর্য্য ধরে তার সব বৃত্তান্তই মনযোগ দিয়ে শোনে। সাধারণতঃ সদালাপের মাতৃনাম ছাড়া এইসব জাগতিক অভাব, অনটন, জঠরচিন্তা এসব প্রসঙ্গের আলোচনায় রামপ্রসাদের যদিও বেশীক্ষণ রুচি থাকেনা, কিন্তু ভারতের চোখে সে সব তুচ্ছ জিনিস  ছাড়াও আগামীদিনের এক মহান সৃষ্টির বীজটিকে সে ঠিক চিনতে পেরেছে , তাই সেও আর  ভারতকে কথার মাঝখানে নিবৃত্ত করলনা। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজনের মধ্যে একটা বেশ গাঢ় বন্ধুত্ব হয়ে গেল । দেখে কে বলবে তাদের পরস্পরের মধ্যে পরিচয়টি সবেমাত্র আজ সকালেরই।

⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜
পর্ব (৫)
রামপ্রসাদের সঙ্গেই ভারত মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গে দেখা করতে  ভিতরমহলের দিকে গেল। সেদিনের মতো দরবার তখন শেষ, অলস অপরাহ্ণটি অলিন্দে বসে থাকা পায়রাগুলির মতই গুজগুজ করছে। মহারাজ বিরামকুঠীতে তখন একাই ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই দুটি মানুষের লম্বাছায়া তাঁর নজরে এল আর তার পরক্ষণেই নায়েব হুকুমচাঁদ এসে খবর দিল প্রসাদ  এসেছে  তার সঙ্গে আবার একটি নতুন লোক। 

প্রসাদ ভিতরে এসে করজোড়ে প্রণাম সারলো। দেখাদেখি ভারতও। মহারাজ জানেন প্রসাদ তার আরাধ্যা ব্রহ্মময়ী ছাড়া কাউকেই সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করেনা, তাই বলে অন্য ছোকরাটিও কেন তাই করলো...?বেশ শ্লেষের সঙ্গেই প্রসাদকে বললেন -
 " কি হে একেবারে ডুমুরের ফুল হয়ে উঠেছ দেকচি হে ! মাঝেমধ্যে কেষ্টনগর এলে কি তোমার জাত যাবে? তা এবারে এত দেরী করলে কেন? সকালটা  পুরো মাটি হল ! তা সঙ্গের ভিরিঙ্গীটিকে আবার কোথায় জোটালে?"

প্রসাদ ছদ্মবিস্ময় প্রকাশ করে বলে,
 " সে কি মহারাজ ! উৎসব তো সেই পরশু, আর আজকেই তো আমি রাজবাড়িতে এসে গেচি! তাতেও যে আসতে দেরী হল' বলে তা অবশ্য আমিও বুঝিনি ! আসলে ওই বেটীকে একা  ফেলে রেখে আসতে মন চায়নে! তা যদিও এখানে তো সেও আছে জানি, তাইতো আসা ! নইলে কি আর আমি কোথাও নড়ি? আর আমার এই সঙ্গীটি হল ভারতচন্দর, সম্পক্কে আমার মিতে,ও আপনাকে কিছু আর্জি জানাতে চায়! " 

মহারাজ বললেন - " তা বটে ! তবে কি জানো প্রসাদ, তোমার গানগুলো শুনলে বুকটা মনটা হাল্কা হয়ে যায়! চৌদিকে যা চলচে! মাঝে মাঝে সব ছেড়েছুড়ে অনেক দূরে চলে যেতে ইচ্ছে হয়! ও বেলায় আরতির পর দালানে আসবখন। "  তারপর ভারতকে আপাদমস্তক দেখে জিজ্ঞাসা করলেন - "তা, বামুন না কি জাত হে ?  দুম্ করে হঠাৎ কেষ্টনগর? সাকিন কোথায়?"

ভারত তার পিতৃপরিচয়, ভাগ্যবিপর্যয় সবকিছু বলার পর অন্তিম আর্জিটি অবশেষে পেশ করে। কৃষ্ণচন্দ্র দেখেন এই যুবকটির চোখে এক স্বপ্নিল কল্পলোকের ভাবুক দৃষ্টি আছে তবে তা প্রসাদের মত ভোগহীন নির্মোহ  নয় বরং শিল্পীর সদারঙ্গটি এত বিপর্যয়ের মধ্যেও তার জৌলুস হারায়নি। গড়গড়ার নলটি মুখ থেকে সরিয়ে তিনি চাপা গলায় বললেন -

" শোন বাছা যা বুজলাম, এতদিন তো শুধু খুচরো কবিতাই লিখলে ! ওসব পাঁচালি টাঁচালি লেখার লোকের অভাব নদে- শান্তিপুরে কোথাও নেই, আর তারও একন দরকার নেই ! একালে একটু  অন্যরকম জিনিস চাই বুজচ? এই ধর বসন্তবর্ণনা বা নবরস বা  কখনো বা ফার্সী হিন্দী বাংলা সংস্কৃত এসব মিশিয়ে  টিশিয়ে আদিরসটাকেই যদি জমাতে পারো তো দেখ? ওই সব মুকুন্দরাম- টাম অনেক শুনিচি, ওসব হল গরীব মূখ্যু সুখ্যূ লোকেদের জন্য ! পুরনো চন্ডীকাব্য নয় একেবারে এক নতুন মেজাজের মঙ্গলকাব্য লেকো দিকি যদি পার! 
অবশ্য এসব তোমার পারারই কতা! তুমি স্বভাবকবি তায় অলঙ্কারশাস্ত্রাদিও জান যখন ! তবে লেগে পড়ো পরশু থেকে! দশদিন সময় দিলাম ! আর হ্যাঁ, কাল দেশে গিয়ে তোমার পরিবারটিকেও এখেনে নিয়ে এস ! সৃষ্টির সময় পুরুষটিকে প্রয়োজনে সদা 'প্রকৃতি'স্থ  হয়ে থাকতে হয়! হা ! হা! হা! যাও এখন এবেলা অতিথিশালায় গিয়ে খাও দাও বিশ্রাম নাও গে !একসঙ্গে সবাই প্রসাদের গান শুনবো সন্ধে আরতির সময়...হুউউউকুউউমচাঁআআআদ এ্যাই হারামজাদা কোথায় গেলি রে ব্যাটা..."।

ভারতের মাথার ভিতরে ভাবনার ঘোর লাগে। তবে কি সত্যিই তার ভাগ্যটা এবারে বদলাবে? পরক্ষণেই মনে সংশয় এসে উপস্থিত হয় যে সে কি আদৌ এই কাব্যটি রচনা করতে পারবে!এদিকে, কোত্থেকে যে শুরু করা যায় !  মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র নিজেও যথেষ্টই শাস্ত্রজ্ঞানী; তাঁকে খুশী করতে পারাটাও নেহাত মুখের কথা তো নয়। সে যাই হোক, সুযোগ এসেছে যখন  তখন না হয় নিজেকে উজাড় করে দেবে এবার।  প্রসাদ ওর ভাবনাক্লান্ত মুখটি দেখে মিটিমিটি হাসে। হাঁটুতে তাল ঠুকে সে চোখ বুজে আখর ধরে মিঠে গলায়,

" প্রভাতে দাও অর্থচিন্তা,
মধ্যাহ্নে দাও জঠর চিন্তা,
সায়াহ্নে দাও ফল চিন্তা,
বল্ মা তোমায় কখন ডাকি!" 

গান গাওয়া শেষ হলে ভারত জিজ্ঞাসা করে - 'এ পদ কি তোমার রচনা মিতে? ' প্রসাদ বলে 'আমি কি ছাই লিখি! আমি গাই, লেখে তো আরেক জনায় ! সে কে জান?'  বলেই সে আবার গলা ছেড়ে গেয়ে ওঠে -

 " শ্যামা মা ওড়াচ্ছে ঘুড়ি ভব সংসার বাজারের মাঝেএএএ"

ভারত বুঝতে পারে প্রসাদের এই গান একদিন দেশের লোকের মুখেমুখে ফিরবে। ধনী-নির্ধন সবাইকে প্রসাদীসুরে ভাসতেই হবে। এ যে চিরকালের গান
যেন চিরজন্মজন্মান্তরের সাধনতত্ত্ব !
⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜

সাতটা দিন কিন্তু দেখতে দেখতে পার হয়ে গেল।  রাধাকে এখনো ভারত কৃষ্ণনগরে সঙ্গে করে আনেনি। বরং সে নিজে একদিন এরমধ্যে বাড়ি থেকে এক রাত্তির ঘুরে এসেছে। এখন সারাটা দিনের বেশীর ভাগটাই সে লেখায় নিয়োজিত। কৃষ্ণনগরে রাতে প্রদীপ জ্বালতে বাধা নেই। তাই বেশীর ভাগ দিনই সে রাত্রি জেগেই দ্রুত কাব্য রচনায় ব্রতী। 

আর দু দিনের মধ্যেই তার লেখা সম্ভবতঃ শেষ হয়ে যাবে, তারপরে পরীক্ষা হবে তার প্রতিভার। অনেক ভেবে চিন্তে সে কাশীর অন্নপূর্ণাকে নিয়ে একটা মঙ্গলকাব্য রচনা করতে বসেছে। বাচস্পতি মশায়ের কাছে শোনা যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্য, কতলু খাঁ আর ভবানন্দ মজুমদারের ইতিহাসটিকেও কায়দা করে এরই মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে। এই ভবানন্দ মজুমদারই আবার কৃষ্ণনগর রাজবংশের আদিপুরুষ। দেবী অন্নপূর্ণার মর্ত্যধামে দেবীমহিমাটি এই ভবানন্দের হাত ধরেই প্রচারিত হয়েছে এরকম ভাবেই ভারত লিখেছে। স্বয়ং অন্নদাই স্হিরা হতে আকাঙ্খা করেছেন ভবানন্দের ভদ্রাসনে। এটা অবশ্য মঙ্গলকাব্যেরই রীতি। রচনাকারের স্বনামে ভণিতা আর দেবীমহিমা প্রসারে রাজশক্তির অনুগ্রহ এই চেনা ছকটিই যুগ যুগ ধরে মঙ্গলকাব্যের আঙ্গিক। ভারত নিজেও অবশ্য এই ধারাটিকেই মেনে চলেছে। 

⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜

ঈশ্বরচন্দ্র এখন ভারতচন্দ্রের রচনা পড়াতে বেশ আপ্লূত বোধ করেন। নিজেদের মুদ্রণযন্ত্রে অন্নদামঙ্গলটি বড় যত্ন করে প্রকাশ করেছেন। সাথে বাড়তি সংযোজন হয়েছে সাদা কালোয় উড্ কাট প্রিন্টের অলংকরণগুলি। বটতলা সংস্করণের মত সে বইটি কেবলমাত্র স্খলিতবসনা রমণীদের চিত্র বহুল নয়, বরং আর্টের বিষয়টাকে যোগ্য প্রাধান্য দিয়েই ছাপা হয়েছে।একদিন  ক্লাসের মধ্যে তো তিনি স্বীকারই করলেন সংস্কৃতে কালিদাসের বাংলাভাষায় যোগ্য পরিপূরক হলেন ভারতচন্দ্রই। 

এরমধ্যে একটি পত্র পেলেন বিদ্যাসাগর। সুদৃূর ফরাসীদেশের ভার্সেই থেকে পত্রটি লিখেছেন অার এক আশ্চর্য বঙ্গদেশীয় প্রতিভা। তার নাম মাইকেল মধুসূদন দত্ত। যথারীতি সর্বদাই উচ্ছৃঙ্খলতার চূড়ায় তার বসবাস। সঙ্গে প্রচন্ড মদ্যপানের মাত্রাটিও ক্রমবর্ধমান। এখন সবে ডিসেম্বর মাস পড়েছে তাই বিদ্যাসাগরের কাছে কিছু অর্থসাহায্য যাচনা করে চিঠি লিখেছেন এই যুবক কবি। পত্রের শেষাংশটি পাঠ করে বিদ্যাসাগর নিজেকে আর  সংযত করতে পারেন না। বাংলাদেশের এই অনন্য প্রতিভাটি ওখানকার প্রবল শীতে গায়ে দেবার কোটটিকে বিক্রী করে কদিনের খাদ্যসংস্থান করতে বাধ্য হয়েছ। অথচ এই দূর্দিনের  মধ্যেও  মধুসূদন তার কবি মনের সরসতা ও সৌজন্যবোধটির কোনও হানি ঘটায়নি। 
" It is about six times colder than the coldest day in our coldest month. Do you remember the line in Bharatchandra -বাঘের বিক্রম সম মাঘের হিমানী? What would he have said if he had been here?"

 বঙ্গদেশীয় জননীর মতন কোমলপ্রাণ বিদ্যাসাগরের বিগলিত হৃদয়টি এই চিঠিটি পাঠের পর একটু যেন ভারী হয়ে আসে। যদি একটিবারের জন্যও মধুসূদন নিজের প্রতিভার মূল্যটি বুঝত! সেদিনের মত লেখাপড়ার কাজ সেরে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বিদ্যাসাগর স্বগোতক্তি করেন -
" হা হতোস্মি!"
⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜

অবশেষে এল রাজসভায় 'অন্নদামঙ্গল' পাঠের দিনটি। সিংহাসনে মখমলের পাদপীঠে পা রেখে উন্মুখ স্বয়ং কৃষ্ণচন্দ্র। সভায় অনেক পরিজন, অমাত্যজন আর পন্ডিতবর্গ। এছাড়া বিশেষ ভাবে সদাদন্তবিকশিত রাজবিদূষক গোপালচন্দ্রও উপবিষ্ট ঠিক কৃষ্ণচন্দ্রের পাশটিতেই। ভারত আজকের সভায় তার 'মিতে' প্রসাদের অনুপস্থিতিতে কাতর বোধ করে। উৎসবের পরদিনই সে কুমারহট্ট  ফিরে গেছে। অবশ্য মিত্রতার শর্তে ফিরে যাওয়ার আগে  সে  ভারতকে দিয়ে গেছে তার স্বরচিত একটি প্রসাদীসুধা - 

" কালী কালী বল্ রসনা/ কর পদধ্যান নামামৃতপান /যদি হতে ত্রাণ থাকে বাসনা !" 

ভারতচন্দ্র মনে মনে স্মরণ করে ইষ্টনাম
' ব্রহ্মস্বরূপা  পরমা জ্যোতিরূপা সনাতনী'

বন্দনা শেষ হল, সভাবর্ণনাও। তারপর দক্ষযজ্ঞ -দশমহাবিদ্যা - সতীর আখ্যান ইত্যাদির পর হরগৌরীর মিলিত রূপবর্ণনা

'আধ বাঘছাল ভাল বিরাজে
আধ পটাম্বর সুন্দর সাজে,
আধ মণিময় কিঙ্কিণী বাজে
আধ ফণী ফণা ধরি রে !
আধই হৃদয়ে হাড়ের মালা,
আধমণিময় হার উজালা
আধ গলে শোভে গরল কালা,
আধই সুধা মাধুরী রে !' 

সতীর দেহত্যাগ, মদনভস্ম, এইসবের পরেই শুরু মূলপর্বের বিস্তার। কাশীধাম থেকে বঙ্গদেশে অন্নপূর্ণার আগমন  ও ভবানন্দের সৌভাগ্যউদয়পর্বের কাহিনীর সময় স্বয়ং কৃষ্ণচন্দ্রও যেন নড়ে চড়ে বসলেন একবার। অন্নপূর্ণার মর্ত্যে অবতরণের দৃশ্যে সে ইচ্ছে করে 'ঈশ্বরী' নামে এক পাটনী চরিত্রকে এঁকেছে। কাব্যের আবহে তার সেই খেয়াঘাটের পাটনীকেই অমরত্ব দেওয়ার এইতো যোগ্য স্থান।  ভারতের জীবনে প্রতিষ্ঠালাভের এই পর্যায়ে উপনীত হওয়ার পিছনে রাধার অবিচল স্থৈর্যের সাথে সাথে  তার নিত্যদিনের শর্তহীন সমর্পণও যে সমানভাবেই  মূল্যবান। 

সভায় সকলে এই অপরূপ ভাষার চাতুর্যে, শব্দালঙ্কারের অনন্য প্রয়োগে  স্তব্ধবাক হয়ে চেয়ে থাকে ভারতের দিকে। পুস্তিকা বন্ধ করে পাঠসমাপ্তি ঘোষণা করে ভারত, এবারে সংস্কৃতে!

" যদক্ষরং পরিভ্রষ্টং মাত্রাহীনঞ্চ যদ্ভবেৎ।
পূর্ণং ভবতু তৎ সর্বং ত্বৎ প্রসাদাৎ সুরেশ্বরী"

সমাপনের পরে সকলের আগে আসন ছেড়ে উঠে স্বস্তিবাচন করলেন 'গদাধর তর্কালঙ্কার'। রাজকবি 'বাণেশ্বর সংস্কৃতকেই কাব্য রচনার একমাত্র ভাষা হিসাবে স্বীকার করতেন এতদিন। তিনিও এসে আলিঙ্গন করলেন ভারতকে। 'কালিদাস সিদ্ধান্ত' উচ্চকিত হয়ে বলেন -' মহারাজের শতরত্ন সভায় ভারতচন্দ্রই শ্রেষ্ঠ রত্ন। '
 গোপালও সহাস্য বদনে বলে - "বেড়ে লিকেছ দাদা! শিবকে আর এট্টু ক্ষেপিয়ে বোষ্টমগুলোকে নিকেশ কর্তেই পার্তে!"
'সাধু! সাধু!" রবে সভায় ভারতচন্দ্রের  জয়জয়কার ধ্বনিত হতে লাগলো।

কিন্তু স্বয়ং মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র ভ্রূকুঞ্চিত ও থমথমে মুখে নিশ্চুপপ্রায়। সকলে তাঁর আগেই ভাববিহ্বলতা প্রকাশ করে ফেলে যেন একটু অপরাধবোধে ভুগছে। 

কিছুক্ষণ পরে গম্ভীর কন্ঠে তিনি বলে উঠলেন- "এ তো আমি চাইনি! আমার মনোমত হয়নি এই কাব্য। নাঃ হে, এ জমেনি! "

রাজসভায় যেন বজ্রপাত হয়। 
ভারতের পা'এর নীচ থেকে মাটি সরে যাওয়ার উপক্রম হয়।  দিনরাত এক করে সাধনার এই পরিণতি! দুচোখে বাষ্প জমে ওঠে তার। কৃষ্ণচন্দ্র বলেন -
 ' তবে আজকের মতো সভাভঙ্গ হউক! ভারত, তুমি বরং সন্ধ্যায় বিরামকুঠীতে একবার এসে দেখা কর! '

মশালচি এসে বিকেলের পর বাতি জ্বালিয়ে দেওয়ার খানিক পরে বিরাম কুঠীতে ভারত একবুক নিরাশা নিয়েই প্রবেশ করে। মহারাজ গড়গড়া টানতে টানতে আড়চোখে চেয়ে বললেন -  
" অভিমান হয়েছে বুঝি! কি হে?"

ভারত নতকন্ঠে উত্তর দেয় -

 "এ আমার দূর্ভাগ্য আপনাকে খুশী করতে পারি নি ! এ আমার অক্ষমতা মহারাজ !" 

বিপুল শব্দে অট্টহাস্যে ফেটে পড়ে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র  বলে ওঠেন - 

" বটে ! কবির বেশ অভিমান হয়েচে দেখচি! তবে শোন তোমার 'অন্নদামঙ্গল'টি শেষ অবধি একটি শুষ্ক পাঁচালীতেই এসে দাঁড়িয়েছে। জেনে রাখ ভবিষ্যতের বুকে আঁচড় কাটতে গেলে চাই বিশুদ্ধ আদিরসে জিরনো কাব্যই । এমনকি তা কুমারসম্ভবের মত ঠাকুর দেবতা নিয়ে হলেও। নবরসের ঐটিই আসল যা তুমিই পার একমাত্র শ্রীমন্ডিত করে বাংলায় লিখতে। দেখ, আমি তোমায় কেবল এক সফল পাঁচালীকার হিসেবে নয়; নতুন ধারার কবি হিসাবেই দেখতে চাই। আজ যারা সভায় বসে  তোমায় ধন্য ধন্য করল, তাদের মনও আসলে ওই আদিরসের দিকেই। " 

ভারত আভূমি নত হয়ে দন্ডবৎ করে মহারাজকে। সে প্রতিশ্রুতি দেয় তিনটি রাত্রির শেষে সে মহারাজকে তাঁর মনোমত সৃষ্টিটি নিবেদন করতে সক্ষম হবে।
⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜

তিনটি রাত্রি অতিক্রান্ত হল। রক্তিম চোখে ভারত সভায় এসে দাঁড়ায়। 

" মহারাজ! আমার রচনা সমাপ্ত!"

কৃষ্ণচন্দ্র সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করেন -

" আদিরস?"

"আজ্ঞে হাঁ মহারাজ! বিশুদ্ধ প্রেমআখ্যান!"

ভারত নির্ভীক দৃঢ়তার সাথে  উচ্চারণ করে।

কৃষ্ণচন্দ্র উল্লসিত হয়ে বললেন -  

'হে প্রিয়ে ! চন্দ্রাননে! বসন্তমলয়ে শোভে যত পুষ্পরাজি টাজি - এসব ঢাকাঢুকি নেই তো এবার?'

ভারত গাঢ় স্বরে বলে - "না মহারাজ! এ রসে কোনও আবরণ আমি রাখি নি!"

" সাধু ! সাধু! তবে সন্ধেবেলায় বিরামকুঠীতেই শোনা যাক! কি হে গোপাল থাকবে তো নাকি!" একটি চোখটিপে রসরাজ গোপালচন্দ্রকে মহারাজ মুচকি হেসে  ইশারা করেন।

⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜

"অন্নদামঙ্গলে"র সংযোজন হিসাবেই এই "বিদ্যা সুন্দর" অংশটি ভারত লিখেছে। ভারত বিদ্যার দেহবর্ণনায় কাব্যের ঘনঘটা রেখেও অকারণ ইন্দ্রিয়ের উত্তেজনা প্রদর্শন করে তার রচনাটিকে অকারণে কেবল 'কামমোহিতম্' করতে চায়নি। সে যে আদতে শিল্পী। তার এতদিনের চর্চিত ভাষা প্রখরতা ও অনুশীলনে সে আজ সেই সাক্ষ্যই দেবে।

" কুচ হইতে কত উচ্চে মেরুচূড়া ধরে
শিহরে কদম্বফুল দাড়িম্ব বিদরে।
কে বলে অনঙ্গ অঙ্গ দেখা নাহি যায়
দেখুক সে আঁখি ধরে বিদ্যার মাজায়।
মেদিনী হইল মাটী নিতম্ব দেখিয়া
অদ্যাপি কাঁপিয়া ওঠে থাকিয়া থাকিয়া।।"

গোপাল শুনতে শুনতে উল্লসিত হয়ে বলে ওঠে - ' কাত করে বইটা ধরোনা খুড়ো! রস  যে গড়িয়ে পড়বে এবার!'

পাঠ শেষ করে ভারতচন্দ্র যখন থামল, মহারাজ নিজে আসন ছেড়ে উঠে এসে ভারতকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
" অপূর্ব, অদ্ভূত! কৌতুকে,বাগাড়ম্বরে, কবিত্বে, কামকলাপ্রদর্শনে তুমি বিলহণ,অমরু,রাজশেখর সবাইকে হারিয়ে দিয়েছ হে! এতো মহাকাব্য ! আমি জানতাম তুমিই পারবে।  তাই তোমার প্রতিভাটিকে কৌশলে উস্কে দিয়েছিলুম। অন্নদামঙ্গল ও বিদ্যা সুন্দর উভয় অংশই বাংলাদেশে চিরঅমর হয়ে থাকবে ! আর হ্যাঁ, তার সাথে কবিটিও! হাঃ হাঃ হাঃ আজ থেকে তুমি " রায়গুণাকর ! হাঁ  রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র !" 

⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜

মহারাজের সেদিনের প্রশস্তিবাচন যেন আজও কান পাতলে গঙ্গার গা জুড়নো ঠান্ডা বাতাসে শোনা যায়। দিনকাল কি দ্রুত বদলে গেল। মূর্শিদাবাদে কত নবাব এল আর গেল, এখন গোটা বাংলাদেশে শুধু ফিরিঙ্গীদেরই রাজত্ব। নদীয়ারাজ মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রও সদ্যপ্রয়াত, ভারতের  নিজেরও বয়স বেড়েছে। মূলাজোড়ে নিষ্কর ভূমিটি তার পারিতোষিক; স্বয়ং কৃষ্ণচন্দ্রের কাছ থেকে, আজকের ভদ্রাসনটি তো সেখানেই। তার নিকটেই তো সেই 'কুমারহট্ট' ,যার এখন নাম 'হালিশহর', সবাই তার মিতে 'রামপ্রসাদে'র নামে সে জায়গাকে এখন এক ডাকে চেনে। সেই মিতেও আর নেই,  কিন্তু কালাকালের জলতরঙ্গে প্রসাদী গান রয়ে গেছে আজও আর আগামীদিনেও থাকবে ।

 ভারত উঠে দাঁড়ায়। সামনে তার অতিপ্রিয় সেই  'কলক্কল তরঙ্গা ' গঙ্গা। একটি খেয়া কতদূর থেকে ভেসে আসছে। ভারত দেখতে পায় এক সুদর্শন তরুণ আর এক কৃষ্ণবর্ণ মেঘরঙা আকর্ষক দেহবল্লরীর সুন্দরী খেয়াপারাপারকারিণীকে। জীবনের উজানভাঁটায় তারা আজও খেয়া ভাসিয়ে ভেসে চলেছে....


পুনশ্চ : 
⚜⚜⚜⚜
জোড়াসাঁকোর দক্ষিণের বারান্দায় আজ জোর তর্কটি জমে উঠেছে। এ বাড়ির জামাতাটি 'সবুজপত্র' নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করে। সে পেশায় বিলেতফেরৎ ব্যারিস্টার হলেও সাহিত্যসেবী। তার নাম প্রমথ চৌধুরী। কতিপয় বন্ধু ও আত্মীয়বর্গের সাথে ধূমায়িত কফি ও কেক সহযোগে মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য নিয়ে জোর ব্যবচ্ছেদ চলছে।  এই নবীন সাহিত্যপ্রেমীদের  মতে 'ভারতচন্দ্র' রাজকবি হলেও মূলতঃ অশ্লীলতাকেই প্রশ্রয় দিয়েছেন। কাব্যের গুণমানটি আদপে মামুলি। প্রমথ মাথা নেড়ে  বলেন - " ইংরেজিতে যেহেতু অ্যাঙ্গলো স্যাক্সন ও নর্মান ফ্রেঞ্চ এদুটি ভাষা মিশ্রিত হয়েছে কিন্তু বাংলা তা নয়। বাংলায় অন্ততঃ ভারতচন্দ্রের সময় সংস্কৃত আরবী -ফার্সী কিছু শব্দই দেশী বাংলায় এসে মিশেছে। কিন্তু মূল ভাষাটি অক্ষূণ্ণ রয়েছে। " মন্মথ নামের একজন ছাত্র সঙ্গে সঙ্গে টিপ্পনী কেটে বলে " আমাদের মধুসূদন কিন্তু ভারতচন্দ্রকে বেশ  সমালোচনা করেছেন.." 

হীরেন্দ্র দত্ত বললেন, " ভায়া,  এ হল অশ্লীলতার চারুশিল্প!"  

এইসব গরম গরম আলোচনার মধ্যে এক দীর্ঘদেহী প্রবীণ ঋষিকল্প মানুষ সেখানে এসে যোগ দিলেন। আজকের কাব্যসাহিত্যের অঙ্গনে নববাল্মিকী ইনিই। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ পুত্র ও বিশ্বকবিও বটে। বিশ্বসংসারে সবাই ওনাকে মিস্টার টেগোর,গুরুদেব এইসব ভারী ভারী সম্বোধনে ডাকলেও এ বাড়িতে তিনি 'বাবামশায়', 'রবিকা' বা 'রবিমামা' নামেই পরিচিত। ওনাকে দেখে সকলে একটু গলার স্বর নামিয়ে আনে। তাঁর সঙ্গে আর একজন সঙ্গী। ওনার প্রিয়তম ভ্রাতুষ্পুত্র অবন এখন দেশীয় শিল্পকলার নিদর্শন নিয়ে মেতে উঠেছে। প্রবীণ সস্নেহে অবনকে একটি বই তাঁর জোব্বার ভিতর থেকে বার করে বলেন - "দেখ অবন! দেশীয় শিল্পকে আবিষ্কার করতে হলে বটতলার উডকাট্ কে বাদ দিলে অন্যায় হবে!এটি অবশ্য বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সম্পাদিত!" অবন উল্লসিত হয়ে বইটি হাতে নিয়ে বলে উঠলেন - "রবিকা ! এতো দেখছি অন্নদামঙ্গল ! রায়গুণাকর প্রণীত না? এতো প্রথম যুগের বাংলায় ছাপা বইগুলির একটি? এতো আস্ত একটি স্বর্ণখনি !"

 কাঁচা পাকা শ্মশ্রুগুম্ফের ভিতর থেকে স্মিত হেসে রবীন্দ্রনাথ বললেন -

"  ঠিকই বলেছ ! আসলে রাজকবি হওয়ার অনেক জ্বালা, সবাই বড্ড ফরমায়েশ করে ! নিভৃতচারণ করার অবকাশ কই? তবে এই অগ্রজ কবিকে মধুকবিও অসম্মান করেননি জানো তো?

 ভারতচন্দ্রের ঈশ্বরী পাটনীর জগদম্বাকে পার করার উপলক্ষে বলেছিলেন যদি তিনি ওই রকম করে কাব্য বর্ণনা করতে পারতেন তবে স্বচ্ছতোয়া ভাগীরথীর সংস্পর্শযুক্ত রাঙা অবিশ্বসুলভ  চরণদুখানির কতই মহিমাকীর্তন করে ভক্তমনোহারী করে আঁকতাম। ভারতচন্দ্রকে উদ্দেশ্য করে একখানি চতুর্দশপদীও তিনি রচনা করেছিলেন।

 মধ্যযুগ আর আধুনিক যুগের সন্ধিক্ষণে ইতিহাস ভারতচন্দ্রকে অস্বীকার করতে পারবে না কখনো। রাজসভাকবি রায়গুণাকরের অন্নদামঙ্গলগান রাজকন্ঠের মণিমালার মতো, যেমন তার উজ্জ্বলতা তেমনি তার কারুকার্য।" 

⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜ সমাপ্ত ⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜

লেখকের কথা  :
⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜⚜

ভারতচন্দ্রকে নিয়ে লেখার ইচ্ছেটা আসলে অনেকদিনের। ভাবতে অবাক লাগে যে রতিরঙ্গ ধ্রুপদী ভারতীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল প্রাক ইসলাম পর্বেও,  মধ্যযুগে এসে তা যেন একটি বদ্ধ নীতিবাগীশ শাসনে শুধু  মুখ লুকিয়েই থেকে গেল।  বৈষ্ণবপদাবলীতে রাধা-কৃষ্ণের  প্রেম মুক্তি পেলেও তা দেহাতীত নিকষিত হেম হয়ে সীমারেখা টেনে সামলে নিল। মানুষ মানুষীর মিলন মান্যতা পেল না।  যৌনতার বিষয়ে মঙ্গলকাব্যেও সেই সাবধানী গা বাঁচানো রীতিটিই অকারণে বহাল রইলো।

 অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে ভারতচন্দ্র যেন 'প্রমিথিয়ূস' হয়ে এসে  সেই নিষিদ্ধ রতিমঞ্জরীটিকে রসিকজনের সামনে নতুন অলঙ্কারে সাজিয়ে আনলেন। বাংলাভাষা সমৃদ্ধ হল ফার্সী আর হিন্দীর শব্দপ্রয়োগে।এভাবেই নিশ্চুপ হয়ে ভারত কৃষ্ণনগরে বসে বসে  ধীরে ধীরে প্রাক উনিশশতকের  আধুনিক ভাষা প্রবাহের প্রথম ইঁটটি গাঁথলেন। একদিন সেই পথ দিয়েই স্বচ্ছসলিলা ভাষার গঙ্গাটিকে বয়ে আনবেন ভগীরথসদৃশ স্বয়ং বিদ্যাসাগর। তারও আগে রুশ নাট্যকার লেবেদফ মজেছেন ভারতচন্দ্রে। রুশ ভাষায় অনুবাদ করেছেন 'বিদ্যা সুন্দর'। পরবর্তী কালে ভারতে  মজবেন মাইকেল সহ একঝাঁক তরুণ প্রতিভা। তারা সমালোচনাও করবেন পূর্বজ কবিটিকে দেহবর্ণনার বাহুল্যে। তবুও অস্বীকার করে এড়িয়ে যেতে পারবেন না ভাগ্যবিড়ম্বিত এই কবিপ্রতিভাটিকে যাঁর লেখাকে তার  প্রায় দেড়শো বছর পরে আর এক মহাজন রবীন্দ্রনাথ উচ্ছ্বসিত হয়ে বলবেন 
'এ যেন রাজকন্ঠের কন্ঠের মণিমালা '। 

'ভারতমঙ্গল' আদতে একটি উপন্যাস ই।  ইতিহাস বর্ণনা নয়, বরং ইতিহাস যাপন। কল্পনা ও সত্যের মিশেলে  সেই দিনগুলিতে একটু স্বপ্নিল পদচারণের প্রচেষ্টা মাত্র। 

আপনাদের উৎসাহ ও প্রশ্রয়ে শুধু লিখতে বসে আমিও আবিষ্কার করেছি এক অন্য ভারতচন্দ্রকে ।  মাননীয়া বিনীতা চ্যাটার্জীর আনুকূল্য না পেলে এই লেখার উপাদান সংগ্রহই হত না। তাই তাঁর উদ্দেশ্যেই এই আখ্যান উৎসর্গীকৃত  হল।


Comments

Popular posts from this blog

পিয়ালি দাসের লেখা

পারমিতা রাহা হালদারের লেখা

বীরেন্দ্র নাথ মহাপাত্রের ধারাবাহিক উপন্যাস