দেবশ্রী ভট্টাচার্যের লেখা ধারাবাহিক উপন্যাসের তৃতীয় পর্ব
৩)
- তোমার প্ল্যানটা কী? কতদিনের ছুটি ছিল!
- এই তো সাতদিনের ছুটি নিয়ে এসেছিলাম , তার মধ্যে একটা দিন প্রায় শেষের পথে ।
- ও ।
আবার চুপ করে গেল প্রিয়া। মেয়েটার কথা বলার ধরনটাই এমন। বড্ড আস্তে আস্তে কথা বলে
, যেন কত কী ভাবে । অনেক ভেবে চিন্তে তারপর প্রশ্ন করে , উত্তর দেয়ও সেইভাবে। যেন
মেপে মেপে শব্দগুলোকে খরচ করে।
- কালকে কী করছ?
- কিছু না , একবার স্কুলে যাবো, স্যারেদের সাথে দেখা করব ! তারপর ফ্রি !
এরপর প্রিয়া কী ব্লতে পারে ! অর সাথে জেতে বলবে কোথাও ! সিনেমা দেখা কিংবা শপিং
নিদেন পক্ষে বাড়িতে ইনভাইট করবে !
প্রিয়া কিছুই বলল না, অদ্ভুত তো ! কথা হারিয়ে গেল নাকি ! নাকি সঞ্জীবেরই ব্লা উচিত !
সত্যি তো এসব কথা মেয়েরা কেউ বলে নাকি! সঞ্জীবেরই তো জিজ্ঞাসা করা উচিত !
- কাল যাবে কোথাও!
- কোথায় যাবো!
- যেখানে বলবে , সিনেমা দেখাতে পারি , শপিঙ-এ যেতে পারি কিংবা অন্য কোথাও
- ধ্যুস ওসব ভালো লাগে না, লাইব্রেরি যাওয়ার আছে! যাবে আমার সঙ্গে!
বোঝো কাণ্ড ! এমন একটা জায়গার নাম করল, যেখানে ঢোকার মুখেই বড় বড় কালো অক্ষরে
লেখা থাকবে SILENCE
- অ্যাঁ লাইব্রেরি !
- কেন লাইব্রেরি পছন্দ নয় বুঝি! এতক্ষনে প্রিয়ার নরম ঠোঁটের মাঝখানে দুটো সাদা দাঁতের
একাগ্র দেখা গেল।
- না, পছন্দ হবে না কেন, আসলে ওখানে তো কথা টথা বেশি বলা যাবে না! তাই আর কী !
- তাহলে কোথায় যাবে বল!
- চল স্কুলে যাবে ! আমার স্কুলে !
- তাতে কী ! ঘুরবে এদিক ওদিক কোথাও যখন যাওয়ার নেই তখন না হয় এমনিই ঘুরে
বেড়াবো !
স্নধ্যেবেলায় নিজেদের আপেলের বাগানেই কথা হচ্ছিল প্রিয়ার সঙ্গে। স্কালে সঞ্জীবের ফোন পেয়েই
এসছে প্রিয়া। প্রথমটা বেশ চমকে উঠেছিল। কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাইছিল না, যে সঞ্জীব এখন
এখানে। তবে বেশ উত্তেজিত লাগছিল ওর কণ্ঠস্বর
- ও! রিয়ালি ! সত্যিই তুমি এখানে ! এতটুকু উত্তেজনাও যে প্রিয়ার চোখে পাওয়া যায় না
বিশেষ । সব সময় যেন একটা শান্ত ন্দী !কোনো আলোড়ন নেই,তবে অনেক গভীর ! সঞ্জীব
যতটা প্রাণবন্ত , উচ্ছল , প্রিয়া ততটাই শান্ত, যাকে বলে ইন্ট্রোভার্ট। তাই বুঝি সঞ্জীব আজও
সাহস করে কথাটা বলতে পারল না, শুধু মনে হয় যদি উত্তর নঞর্থক হয়, তাহলে কি সে সহ্য
করতে পারবে !
- আচ্ছা একটা কথা বলব?
সঞ্জীবের মুখ দিয়ে কে যেন কথাটা বলিয়ে নিল! কথাটা বলেই আবার মনে হল নিজেই নিজের
মুখে হাত দিয়ে কথাটা বন্ধ করে দিতে ! কী মুশকিল, এইভাবে বলা যায় নাকি কথাটা!
- কী কথা!
প্রিয়াও বোধহয় চমকে উঠল !
- না বলছিলাম তোমার কলেজ শুরু হয়েছে?
প্রিয়া মনে হয় হাঁফ ছাড়ল, কিংবা হয়ত হতাশ হল, ঠিকমত বোঝা গেল না। আসলে অন্ধকার
হয়ে আসছে । আপেল আর পাইন গাছগুলো বড় বড় ছায়া ফেলেছে দুজনের মুখে।
- না এখনও শুরু হয়নি। সেশন ব্রেক চলছে , সামনের মাসে শুরু হবে।
- কলেজ শেষ হলে কী করবে ভেবেছ?
- লেকচারশিপ পেয়ে যাবো, তারপরে প্রফেসরি করার ইচ্ছা আছে।
অন্ধকারে আবছা হয়ে এসছে প্রিয়ার মুখ। তবু সেই আবছা আলোয়ও সঞ্জীব ভালো করে
বোঝার চেষ্টা করল । ওর মুখে কি কোনো ইঙ্গিত নেই, ওর মুখে কি কোনো ইঙ্গিত নেই, একটু
হাল্কা আলোর ছোঁয়াও কি নেই!
- কীরে! তোরা কি আজ শুধু গল্প করেই পেট ভরাবি!
যা ভালো করে প্রিয়ার মুখের রেখাগুলো বোঝার আগেই যে মা এসে গেল।
- না তা কেন , তোমার হেঁশেলে যে সাতদিনে সাতশো রকম পদ হবে, আর ডিউটিতে জয়েন
করার আগে আমার অন্তত সাত কেজি ওজন বাড়বে সেটা আমি খুব ভালো করে জানি।
- তবে রে!
মা ছেলের হাসি ঠাট্টার মাঝে পড়ে প্রিয়াও এবার খিলখিল করে হেসে উঠল। সত্যি কী আশ্চর্য
সুন্দর লাগছে প্রিয়াকে । আসলে যারা কম হাসে তাড়া হাসলে বোধহয় খুব সুন্দর লাগে!
সঞ্জীবের স্কুলে এক অঙ্ক স্যার আছেন, লকেতাকে রামগরুড়ের ছানা বলে! বছরে একবার
বোধহয় নিয়ম করে হাসেন, কিন্তু যেদিন হাসেন, সেদিন ওই টাক মাথা , তোবড়ানো গালের
মাঝখানে যেন ফুল ফুটে যায়। বড় অদ্ভুত সুন্দর লাগে তখন!
প্রিয়া অবশ্য অতটাও বেরসিক নয়। তবে সঞ্জীবের মত প্রাণ খুলে যেন হাসতে পারে না।
সবকিছুই যেন ভীষণ মাপা মাপা।
- আন্টি আজকের মেনু কী ?
- ডিনারে দম বিরিয়ানি আছে, আর এখন শুধু আলু টিকিয়া হয়েছে।
- আবার দম বিরিয়ানি ! মা তুমি তো আমার দম ছুটিয়ে দেবে। লাঞ্চটাই তো এখনো হজম
হয়নি!
- আরে এক্ষুনি কি আর ডিনার করবি নাকি এখন তো সবে সন্ধ্যে !
- হ্যাঁ আর ওই আলু টিকিয়াগুলোর কী হবে, ওগুলো কি শুধু বসে বসে আমার মুখ দেখবে !
মুখের ভেতর দিয়ে ঢুকবে না!
- ধ্যুস ওটা আবার খাবার নাকি!
- অ্যাঁ বলে কী মহিলা!
আবার হেসে উঠল প্রিয়া ! এবার যেন আরো খিলখিল করে।
- তুমি আজ ডিনার করে যাও না প্রিয়া !
- আমি!
মা একদম মনের কথাটা বলেছে! কিন্তু প্রিয়া কি সত্যিই থাকবে!
- না মানে অনেকটা রাত হয়ে যাবে তো!
- আমি পৌঁছে দিয়ে আসবো ! সঞ্জীব একটু আগ বাড়িয়ে বলল কথাটা ! না মানে অনেকটা রাত
হয়ে যাবে, বাড়িতেও কিছু বলে আসা হয়নি।
- তাতে কী , আমি ফোন করে দিচ্ছি ।
মা ইউ আর টু সুইট । মা কে জড়িয়ে ধরে ছোটবেলার মত আদর করতে ইচ্ছে করল। কিন্তু
এখন মুখে কোনো রকম উত্তেজনা দেখালে পরিস্থিতির অনুকূলে যাবে না । ক্যাপ্টেন সঞ্জীব ঝাউ
, নিজের ইমোশনকে কন্ট্রোল কর । নিজেকেই মনে মনে কম্যান্ড দিল সঞ্জীব!
- আচ্ছা ঠিক আছে, থাকবো, আপনাকে ফোন করতে হবে না, আমিই জানিয়ে দিচ্ছি, তবে আন্টি
প্লিজ , আলু টিকিয়া আর দম বিরিয়ানি দুটো একসাথে কিন্তু হজম করতে পারব না।
- না , না , চিন্তা কোরো না, মা এইসব স্পেশাল গোলাগুলি তাঁর সৈনিক ছেলের জন্য বানিয়েছে।
আবার কবে পেট পুরে খাওয়াতে পারবে, তার ঠিক নেই তো, তাই আর কী! আর ছাউনিতে
গেলে শুকনো রুটি আর মুরগির ত্যালত্যালে ঝোল ছাড়া কিছু জুটবে না। তাই আমিও এই ফাঁকে
ব্যাটারি ফুল চার্জ করে তবে ফিরব ।
- একটা থাপ্পড় খাবি ! ভর সন্ধ্যেবেলা অলুক্ষুনে কথাগুলো না বললেই চলছিল না! মায়ের মুখটা
আবার থমথমে হয়ে গেল নিমেষে !
- সত্যি সঞ্জীব! এরকম কথা কেন বল!
প্রিয়ার গলাটা কীরকম যেন শোনাল! সত্যিই কি তবে কষ্ট পেল প্রিয়া! তাহলে কি সত্যি প্রিয়াও
ভালোবেসে সঞ্জীবকে! তা কেন চেনা মানুষের মৃত্যুতে তো সকলেই কষ্ট পায়! তার সাথে
ভালোবাসার কী সম্পর্ক ।
পাহাড়ের রাস্তা আরো নিকষ কালো অন্ধকারে ঢেকে গেল। টিমটিমে হলুদ আলোয় যেন পাইন
গাছগুলোকে আরব্য রজনীর দৈত্যর মত লাগছে। যেন দাঁত মুখ খিচিয়ে তাড়া পাহাড়া দিতে
বসেছে এই নিশুতি রাতের প্রকৃতিকে । রাতের পাহাড়কে দু চোখের ক্যামেরায় বন্দি করার
সৌভাগ্য খুব কম লোকেরই হয়।
- কীরে! কথা হল প্রিয়ার সাথে!
- না!
কথা তো অনেক হয়েছে, অনেক না হলেও হয়েছে তো বেশ কিছু কথা! কিন্তু যে কথার কথা
দাদা শুনতে চায় সে সব কথা কিছুই হয়নি!
- সেকিরে! সেই বিকেল থেকে দুজনে একসঙ্গে সময় কাটালি, মা ডিনারের জন্য রাজি করিয়ে
নিল। তারপরও এতটা রাস্তা দুজনে একসঙ্গে সময় কাটালি, মা ডিনারের জন্য রাজি করিয়ে
নিল, তারপর এতটা রাস্তা ওকে বাইরে ছাড়তে গেলি ! তবু কোনো কথা হল না!
- কী করব! ওর সামনে গেলেই যে সব কথা হারিয়ে যায়!
- তোর দ্বারা কিছু হবে না, বুঝতে পারছি ,মা-বাবাকেই পাঠাতে হবে ওদের বাড়ি সগুণ নিয়ে।
- এই না, প্লিজ এরকম কোরো না।
- কেন? আপত্তি কোথায়!
- ইস ব্যাপারটা ভীষণ ব্যাক ডেটেড!
- কী!
দুই ভাই হেসে কুটোপাটি খেল কিছুক্ষন নিশুতি পাহাড়ি রাতে ওদের হাসির আওয়াজ বোধহয়
বন্ধ জানলার শার্সি ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ল পাহাড়ের কোলে!
- তাহলে কীরকম প্ল্যান করেছ ব্রাদার একটু শুনি!
প্ল্যান তো সঞ্জীব অনেক কিছুই করেছিল। শেষ পর্যন্ত কিছুই হবে না, সেটাও সে ভালো করে
জানে।
- আরে এসব বাদ দাও, আজ সারাদিন শুধু এসব নিয়ে ভেবেছি , কীভাবে প্রপোজ করব! হ্যান
ত্যান- শেষ পর্যন্ত কিছুই বলে উঠতে পারিনি । এখন চল অন্য কথা বলি !
- অন্য কথা কী বলব!
- যা বাবা ! এক বছর বাদে বাড়ি ফিরলাম। ছ দিন বাদে চলে যাবো, আদৌ আর ফিরব কিনা
তার ঠিক নেই, অথচ আমার প্রিয় দাদার মুখে আমার বিয়ে ছাড়া আর কোনো কথা নেই!
- এসব কী কথা ! আবার এসব অলুক্ষুনে কথা !
সত্যি তো কথার মাঝে বারবার এমন মৃত্যুর কথা কেন যে ফিরে ফিরে আসে ভগবান ই
জানে ।
- তোমার প্ল্যানটা কী? কতদিনের ছুটি ছিল!
- এই তো সাতদিনের ছুটি নিয়ে এসেছিলাম , তার মধ্যে একটা দিন প্রায় শেষের পথে ।
- ও ।
আবার চুপ করে গেল প্রিয়া। মেয়েটার কথা বলার ধরনটাই এমন। বড্ড আস্তে আস্তে কথা বলে
, যেন কত কী ভাবে । অনেক ভেবে চিন্তে তারপর প্রশ্ন করে , উত্তর দেয়ও সেইভাবে। যেন
মেপে মেপে শব্দগুলোকে খরচ করে।
- কালকে কী করছ?
- কিছু না , একবার স্কুলে যাবো, স্যারেদের সাথে দেখা করব ! তারপর ফ্রি !
এরপর প্রিয়া কী ব্লতে পারে ! অর সাথে জেতে বলবে কোথাও ! সিনেমা দেখা কিংবা শপিং
নিদেন পক্ষে বাড়িতে ইনভাইট করবে !
প্রিয়া কিছুই বলল না, অদ্ভুত তো ! কথা হারিয়ে গেল নাকি ! নাকি সঞ্জীবেরই ব্লা উচিত !
সত্যি তো এসব কথা মেয়েরা কেউ বলে নাকি! সঞ্জীবেরই তো জিজ্ঞাসা করা উচিত !
- কাল যাবে কোথাও!
- কোথায় যাবো!
- যেখানে বলবে , সিনেমা দেখাতে পারি , শপিঙ-এ যেতে পারি কিংবা অন্য কোথাও
- ধ্যুস ওসব ভালো লাগে না, লাইব্রেরি যাওয়ার আছে! যাবে আমার সঙ্গে!
বোঝো কাণ্ড ! এমন একটা জায়গার নাম করল, যেখানে ঢোকার মুখেই বড় বড় কালো অক্ষরে
লেখা থাকবে SILENCE
- অ্যাঁ লাইব্রেরি !
- কেন লাইব্রেরি পছন্দ নয় বুঝি! এতক্ষনে প্রিয়ার নরম ঠোঁটের মাঝখানে দুটো সাদা দাঁতের
একাগ্র দেখা গেল।
- না, পছন্দ হবে না কেন, আসলে ওখানে তো কথা টথা বেশি বলা যাবে না! তাই আর কী !
- তাহলে কোথায় যাবে বল!
- চল স্কুলে যাবে ! আমার স্কুলে !
- তাতে কী ! ঘুরবে এদিক ওদিক কোথাও যখন যাওয়ার নেই তখন না হয় এমনিই ঘুরে
বেড়াবো !
স্নধ্যেবেলায় নিজেদের আপেলের বাগানেই কথা হচ্ছিল প্রিয়ার সঙ্গে। স্কালে সঞ্জীবের ফোন পেয়েই
এসছে প্রিয়া। প্রথমটা বেশ চমকে উঠেছিল। কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাইছিল না, যে সঞ্জীব এখন
এখানে। তবে বেশ উত্তেজিত লাগছিল ওর কণ্ঠস্বর
- ও! রিয়ালি ! সত্যিই তুমি এখানে ! এতটুকু উত্তেজনাও যে প্রিয়ার চোখে পাওয়া যায় না
বিশেষ । সব সময় যেন একটা শান্ত ন্দী !কোনো আলোড়ন নেই,তবে অনেক গভীর ! সঞ্জীব
যতটা প্রাণবন্ত , উচ্ছল , প্রিয়া ততটাই শান্ত, যাকে বলে ইন্ট্রোভার্ট। তাই বুঝি সঞ্জীব আজও
সাহস করে কথাটা বলতে পারল না, শুধু মনে হয় যদি উত্তর নঞর্থক হয়, তাহলে কি সে সহ্য
করতে পারবে !
- আচ্ছা একটা কথা বলব?
সঞ্জীবের মুখ দিয়ে কে যেন কথাটা বলিয়ে নিল! কথাটা বলেই আবার মনে হল নিজেই নিজের
মুখে হাত দিয়ে কথাটা বন্ধ করে দিতে ! কী মুশকিল, এইভাবে বলা যায় নাকি কথাটা!
- কী কথা!
প্রিয়াও বোধহয় চমকে উঠল !
- না বলছিলাম তোমার কলেজ শুরু হয়েছে?
প্রিয়া মনে হয় হাঁফ ছাড়ল, কিংবা হয়ত হতাশ হল, ঠিকমত বোঝা গেল না। আসলে অন্ধকার
হয়ে আসছে । আপেল আর পাইন গাছগুলো বড় বড় ছায়া ফেলেছে দুজনের মুখে।
- না এখনও শুরু হয়নি। সেশন ব্রেক চলছে , সামনের মাসে শুরু হবে।
- কলেজ শেষ হলে কী করবে ভেবেছ?
- লেকচারশিপ পেয়ে যাবো, তারপরে প্রফেসরি করার ইচ্ছা আছে।
অন্ধকারে আবছা হয়ে এসছে প্রিয়ার মুখ। তবু সেই আবছা আলোয়ও সঞ্জীব ভালো করে
বোঝার চেষ্টা করল । ওর মুখে কি কোনো ইঙ্গিত নেই, ওর মুখে কি কোনো ইঙ্গিত নেই, একটু
হাল্কা আলোর ছোঁয়াও কি নেই!
- কীরে! তোরা কি আজ শুধু গল্প করেই পেট ভরাবি!
যা ভালো করে প্রিয়ার মুখের রেখাগুলো বোঝার আগেই যে মা এসে গেল।
- না তা কেন , তোমার হেঁশেলে যে সাতদিনে সাতশো রকম পদ হবে, আর ডিউটিতে জয়েন
করার আগে আমার অন্তত সাত কেজি ওজন বাড়বে সেটা আমি খুব ভালো করে জানি।
- তবে রে!
মা ছেলের হাসি ঠাট্টার মাঝে পড়ে প্রিয়াও এবার খিলখিল করে হেসে উঠল। সত্যি কী আশ্চর্য
সুন্দর লাগছে প্রিয়াকে । আসলে যারা কম হাসে তাড়া হাসলে বোধহয় খুব সুন্দর লাগে!
সঞ্জীবের স্কুলে এক অঙ্ক স্যার আছেন, লকেতাকে রামগরুড়ের ছানা বলে! বছরে একবার
বোধহয় নিয়ম করে হাসেন, কিন্তু যেদিন হাসেন, সেদিন ওই টাক মাথা , তোবড়ানো গালের
মাঝখানে যেন ফুল ফুটে যায়। বড় অদ্ভুত সুন্দর লাগে তখন!
প্রিয়া অবশ্য অতটাও বেরসিক নয়। তবে সঞ্জীবের মত প্রাণ খুলে যেন হাসতে পারে না।
সবকিছুই যেন ভীষণ মাপা মাপা।
- আন্টি আজকের মেনু কী ?
- ডিনারে দম বিরিয়ানি আছে, আর এখন শুধু আলু টিকিয়া হয়েছে।
- আবার দম বিরিয়ানি ! মা তুমি তো আমার দম ছুটিয়ে দেবে। লাঞ্চটাই তো এখনো হজম
হয়নি!
- আরে এক্ষুনি কি আর ডিনার করবি নাকি এখন তো সবে সন্ধ্যে !
- হ্যাঁ আর ওই আলু টিকিয়াগুলোর কী হবে, ওগুলো কি শুধু বসে বসে আমার মুখ দেখবে !
মুখের ভেতর দিয়ে ঢুকবে না!
- ধ্যুস ওটা আবার খাবার নাকি!
- অ্যাঁ বলে কী মহিলা!
আবার হেসে উঠল প্রিয়া ! এবার যেন আরো খিলখিল করে।
- তুমি আজ ডিনার করে যাও না প্রিয়া !
- আমি!
মা একদম মনের কথাটা বলেছে! কিন্তু প্রিয়া কি সত্যিই থাকবে!
- না মানে অনেকটা রাত হয়ে যাবে তো!
- আমি পৌঁছে দিয়ে আসবো ! সঞ্জীব একটু আগ বাড়িয়ে বলল কথাটা ! না মানে অনেকটা রাত
হয়ে যাবে, বাড়িতেও কিছু বলে আসা হয়নি।
- তাতে কী , আমি ফোন করে দিচ্ছি ।
মা ইউ আর টু সুইট । মা কে জড়িয়ে ধরে ছোটবেলার মত আদর করতে ইচ্ছে করল। কিন্তু
এখন মুখে কোনো রকম উত্তেজনা দেখালে পরিস্থিতির অনুকূলে যাবে না । ক্যাপ্টেন সঞ্জীব ঝাউ
, নিজের ইমোশনকে কন্ট্রোল কর । নিজেকেই মনে মনে কম্যান্ড দিল সঞ্জীব!
- আচ্ছা ঠিক আছে, থাকবো, আপনাকে ফোন করতে হবে না, আমিই জানিয়ে দিচ্ছি, তবে আন্টি
প্লিজ , আলু টিকিয়া আর দম বিরিয়ানি দুটো একসাথে কিন্তু হজম করতে পারব না।
- না , না , চিন্তা কোরো না, মা এইসব স্পেশাল গোলাগুলি তাঁর সৈনিক ছেলের জন্য বানিয়েছে।
আবার কবে পেট পুরে খাওয়াতে পারবে, তার ঠিক নেই তো, তাই আর কী! আর ছাউনিতে
গেলে শুকনো রুটি আর মুরগির ত্যালত্যালে ঝোল ছাড়া কিছু জুটবে না। তাই আমিও এই ফাঁকে
ব্যাটারি ফুল চার্জ করে তবে ফিরব ।
- একটা থাপ্পড় খাবি ! ভর সন্ধ্যেবেলা অলুক্ষুনে কথাগুলো না বললেই চলছিল না! মায়ের মুখটা
আবার থমথমে হয়ে গেল নিমেষে !
- সত্যি সঞ্জীব! এরকম কথা কেন বল!
প্রিয়ার গলাটা কীরকম যেন শোনাল! সত্যিই কি তবে কষ্ট পেল প্রিয়া! তাহলে কি সত্যি প্রিয়াও
ভালোবেসে সঞ্জীবকে! তা কেন চেনা মানুষের মৃত্যুতে তো সকলেই কষ্ট পায়! তার সাথে
ভালোবাসার কী সম্পর্ক ।
পাহাড়ের রাস্তা আরো নিকষ কালো অন্ধকারে ঢেকে গেল। টিমটিমে হলুদ আলোয় যেন পাইন
গাছগুলোকে আরব্য রজনীর দৈত্যর মত লাগছে। যেন দাঁত মুখ খিচিয়ে তাড়া পাহাড়া দিতে
বসেছে এই নিশুতি রাতের প্রকৃতিকে । রাতের পাহাড়কে দু চোখের ক্যামেরায় বন্দি করার
সৌভাগ্য খুব কম লোকেরই হয়।
- কীরে! কথা হল প্রিয়ার সাথে!
- না!
কথা তো অনেক হয়েছে, অনেক না হলেও হয়েছে তো বেশ কিছু কথা! কিন্তু যে কথার কথা
দাদা শুনতে চায় সে সব কথা কিছুই হয়নি!
- সেকিরে! সেই বিকেল থেকে দুজনে একসঙ্গে সময় কাটালি, মা ডিনারের জন্য রাজি করিয়ে
নিল। তারপরও এতটা রাস্তা দুজনে একসঙ্গে সময় কাটালি, মা ডিনারের জন্য রাজি করিয়ে
নিল, তারপর এতটা রাস্তা ওকে বাইরে ছাড়তে গেলি ! তবু কোনো কথা হল না!
- কী করব! ওর সামনে গেলেই যে সব কথা হারিয়ে যায়!
- তোর দ্বারা কিছু হবে না, বুঝতে পারছি ,মা-বাবাকেই পাঠাতে হবে ওদের বাড়ি সগুণ নিয়ে।
- এই না, প্লিজ এরকম কোরো না।
- কেন? আপত্তি কোথায়!
- ইস ব্যাপারটা ভীষণ ব্যাক ডেটেড!
- কী!
দুই ভাই হেসে কুটোপাটি খেল কিছুক্ষন নিশুতি পাহাড়ি রাতে ওদের হাসির আওয়াজ বোধহয়
বন্ধ জানলার শার্সি ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ল পাহাড়ের কোলে!
- তাহলে কীরকম প্ল্যান করেছ ব্রাদার একটু শুনি!
প্ল্যান তো সঞ্জীব অনেক কিছুই করেছিল। শেষ পর্যন্ত কিছুই হবে না, সেটাও সে ভালো করে
জানে।
- আরে এসব বাদ দাও, আজ সারাদিন শুধু এসব নিয়ে ভেবেছি , কীভাবে প্রপোজ করব! হ্যান
ত্যান- শেষ পর্যন্ত কিছুই বলে উঠতে পারিনি । এখন চল অন্য কথা বলি !
- অন্য কথা কী বলব!
- যা বাবা ! এক বছর বাদে বাড়ি ফিরলাম। ছ দিন বাদে চলে যাবো, আদৌ আর ফিরব কিনা
তার ঠিক নেই, অথচ আমার প্রিয় দাদার মুখে আমার বিয়ে ছাড়া আর কোনো কথা নেই!
- এসব কী কথা ! আবার এসব অলুক্ষুনে কথা !
সত্যি তো কথার মাঝে বারবার এমন মৃত্যুর কথা কেন যে ফিরে ফিরে আসে ভগবান ই
জানে ।

Comments
Post a Comment